ঢাকায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে এবং হাসপাতালগুলো সেই রোগী সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। চলতি বছর জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যে একশ ছাড়িয়েছে। বাড়ছে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও।
Manual2 Ad Code
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ১ হাজার ৫৫৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। যা চলতি বছরে এক দিনে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর হিসাবে সর্বোচ্চ। এ সময় ডেঙ্গুতে আরও মারা গেছেন চারজন। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে সারা দেশে ১১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৬৪ জন নারী ও ৫২ জন পুরুষ। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় সর্বোচ্চ ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধির সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় সামনে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরজুড়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা করছে। অর্থাৎ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আগামী দুই মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি হয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, নতুন রোগীদের নিয়ে চলতি বছরে দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ৫৯০ জনে। চলতি বছর জুন মাসে সারা দেশে ২ হাজার ৯০৭ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। জুলাই মাসে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ২০৬ জনে। গত মাসে অর্থাৎ আগস্টে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগী ২০ হাজার ৫৩৬ জন। চলতি মাসে এ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৬ হাজার ৭৪৪ জন।
সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ পুরো বিভাগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১০ হাজারের কাছাকাছি। এরপরেই বরিশাল, সংখ্যাটি প্রায় ছয় হাজার। চট্টগ্রামে এটি সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি। ডেঙ্গুতে মৃত্যুতেও ঢাকা এগিয়ে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, ঢাকার বাইরের জেলাগুলোর মাঝে গাজীপুর জেলা ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে, এরপরেই নারায়ণগঞ্জ। এই দুই জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা হাজারের বেশি।
এর বাইরে ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর জেলাগুলোতে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। জেলাগুলোর কোথাও কোথাও আক্রান্তের সংখ্যা হাজারের কাছাকাছি, কোথাও আবার প্রায় দেড় বা দুই হাজার।
দেশে সাধারণত বর্ষা পরবর্তী সময়কে অর্থাৎ আগস্ট থেকে অক্টোবরকে ডেঙ্গুর ‘পিক সিজন’ বা ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ মৌসুম বলা হয়। অন্যান্য বছরের মতো এ বছরও এই সময়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করছেন, সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও বেশি খারাপ হবে। প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডেঙ্গুর নতুন ভয় গ্রামে।
গত শতাব্দীর ষাটের দশকে এ দেশে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। এরপর ২০০০ সালে প্রথম বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ডেঙ্গু ছিল মূলত ঢাকা শহরকেন্দ্রিক। এরপর প্রতি বছর কম-বেশি ডেঙ্গুর সংক্রমণ দেখা দিতে থাকে। ২০১৯ সালে বড় বড় শহরের পাশাপাশি কয়েকটি গ্রামেও ডেঙ্গু শনাক্ত হয়।
গত কয়েক বছর ধরে ৬৪ জেলাতেই ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে, বহু গ্রামের মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। এর অর্থ, সারা দেশে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা আছে। মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মকাণ্ড সাধারণত বড় বড় শহরে চোখে পড়ে। গ্রামে সেই কর্মকাণ্ড নেই। উপকূলের জেলাগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ নতুন ঝুঁকি বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। গ্রামের মানুষের করণীয় সম্পর্কে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো বার্তা নেই। গ্রামে তাই ডেঙ্গুর ঝুঁকি থেকেই যাবে।
এদিকে ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে জনগণকে সম্পৃক্ত করে দেশজুড়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সচিবালয়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও করণীয় নিয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় প্রধানমন্ত্রী ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারি সংস্থার ওপর নির্ভর না করে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেন। বাড়িঘর ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ, ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার এবং মশার প্রজননস্থল তৈরি হতে না দেওয়ার বিষয়ে মানুষকে আরও সচেতন করার কথাও বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি বিএনসিসি, রোভার স্কাউট ও রেড ক্রিসেন্ট কর্মীদের সম্পৃক্ত করার নির্দেশও দেন। তিনি বলেন, তাদের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণকে যুক্ত করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে।
Manual7 Ad Code
চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিতে পারে এমনটাই বলছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এ এম এ মুহিত বলেন, তথ্য ও ডাটার ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে। তাই অক্টোবরের আগেই সবাইকে সতর্ক হতে হবে। তা না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তিনি বলেন, আগের বছরের তুলনায় এ বছর এখনও ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা কম।
তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগামীকাল থেকে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মাঠ পর্যায়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যক্রম জোরদার করা হবে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে গণমাধ্যমকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে হাসপাতালসহ সব জায়গা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
Manual6 Ad Code
বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাকে মশার প্রজননস্থলমুক্ত রাখতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। জনগণকে সম্পৃক্ত করেই মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরজুড়ে সবাইকে সচেতন ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সাড়ে ৪২ হাজারের বেশি রোগীর ৬২ শতাংশই পুরুষ, নারী ৩৮ শতাংশ। মৃত্যুর ক্ষেত্রে আবার পুরুষের তুলনায় নারীদের হার বেশি। এখন পর্যন্ত যারা মারা গেছেন তাদের প্রায় ৫৬ শতাংশ নারী, পুরুষের মৃত্যুর হার ৪৪ শতাংশের মতো। এর আগেও দেখা গেছে যে, ডেঙ্গুতে আক্রান্তের দিক থেকে পুরুষরা এগিয়ে ছিল। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশের নারীদের চেয়ে পুরুষদের শরীরে অনাবৃত অংশ বেশি থাকায় মশা দংশন করার সুযোগ বেশি পায়।
এর বাইরে আরেকটি কারণ হলো, এখনও বাংলাদেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা পুরুষদের চেয়ে কম। সে ক্ষেত্রে যেহেতু ঘরের কাজে পুরুষের তুলনায় নারীর অংশগ্রহণ বেশি, তাই নারীদের ঘরের বাইরে বের হতে হয় কম। কিন্তু ঘরে বেশি থাকলেও নারীরাও একইভাবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। তবে তা হিসেবে আসছে না।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, কর্মস্থলের কারণে পুরুষরা ঢাকায় আসছে বা শহরে যাচ্ছে এবং টেস্ট করিয়ে দেখছে। কিন্তু নারীরা সেই সুযোগ পাচ্ছেই না। যদি সব ডেঙ্গু রোগী চিহ্নিত করা যেত, তা হলে সংখ্যাটা কাছাকাছিই হতো।
Manual1 Ad Code
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. আবদুল আলীম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে এডিস মশা বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। নগরকেন্দ্রিক এডিস মশার প্রজননকাল জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর। কিন্তু এডিশ মশা এখন সারা দেশে, সারা বছর প্রার্দুভাব দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশক নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষকে সচেতন করার কাজটি আর সেভাবে হচ্ছে না। কিন্তু চেষ্টাটা ধরে রাখতে হবে। এডিস ও কিউলেক্স মশা নিধনের জন্য আলাদা আলাদা কর্মসূচি রাখতে হবে। স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, শিক্ষাসহ সব বিভাগের মধ্যে সমন্বিত একটি উদ্যোগ দরকার, যা এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।