প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২৫শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৯ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৪ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

তিন ভাইরাস জ্বরের দাপট

editor
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬, ১১:৫০ পূর্বাহ্ণ
তিন ভাইরাস জ্বরের দাপট

Manual7 Ad Code

 

Manual4 Ad Code

প্রজন্ম ডেস্ক:

এক শিশুর জ্বর সাত দিনেও কমছে না। একের পর এক পরীক্ষা করেও মিলছে না জ্বরের কারণ।
আরেক শিশুর জ্বর সেরেছে, কিন্তু শরীরে উঠেছে র‌্যাশ। কারো আবার জ্বরের সঙ্গে তীব্র শরীর ব্যথা, ডায়রিয়া, চোখের পেছনে ব্যথা; কেউ ভুগছে হাঁচি-কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া কিংবা শ্বাসকষ্টে।

শনিবার রাজধানীর শ্যামলীর ঢাকা শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগে আসা রোগীদের এমন লক্ষণের বিষয়টি জানা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ধরনের ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
দেশজুড়ে এখন একই সঙ্গে ডেঙ্গু, হাম ও ইনফ্লুয়েঞ্জা সংক্রমণ।

তাঁরা বলছেন, সেপ্টেম্বরের পর সাধারণত ইনফ্লুয়েঞ্জার সংক্রমণ কমতে শুরু করে। তবে ডেঙ্গু, হাম ও অন্যান্য ভাইরাসের সংক্রমণ একসঙ্গে চলায় সামগ্রিক জ্বরের চাপ দ্রুত কমবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই জ্বরকে আর ‘সাধারণ জ্বর’ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
একই জ্বরের আড়ালে থাকতে পারে তিন ভাইরাস, এমনকি আরো একাধিক সংক্রমণ।

গতকাল সকাল ৯টায় শিশু হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগের সামনে দীর্ঘ লাইন। সাতটি কাউন্টারে চিকিৎসকরা রোগী দেখছেন। কোথাও মায়ের কোলে জ্বরে কাতর শিশু, কোথাও শিশুর কান্না, আবার কোথাও শ্বাসকষ্ট কিংবা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগী নিয়ে ছুটছেন অভিভাবকরা।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, এক মাসের ব্যবধানে বহির্বিভাগে রোগীর চাপ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
আগস্টের প্রথম সপ্তাহে মেডিসিন বিভাগের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ২৫০ থেকে ২৭০ জন রোগী আসত। চলতি সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫০ থেকে ৪৬০।

সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত বহির্বিভাগের কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর রোগী দেখা হয় জরুরি বিভাগে। দুই বিভাগ মিলিয়ে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক শিশু চিকিৎসা নিতে আসছে। তাদের ৬ থেকে ৮ শতাংশকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে। ভর্তি রোগীদের বড় অংশের বয়স অনূর্ধ্ব পাঁচ বছর।

Manual8 Ad Code

টঙ্গী থেকে ১৮ মাস বয়সী সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন হুমায়রা ইসলাম। শিশুটির এক সপ্তাহ ধরে জ্বর। বিভিন্ন পরীক্ষা করিয়েও জ্বরের কারণ জানতে পারেননি তিনি। ঢাকা শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক শিশুটিকে ভর্তি করার পরামর্শ দেন। কিন্তু শয্যা না থাকায় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল অথবা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

আগারগাঁও থেকে দুই সন্তানকে নিয়ে এসেছেন নাহিদা আক্তার। তাঁর ছোট মেয়ে মাহিরার জ্বর সেরেছে মাত্র তিন দিন আগে। এর মধ্যেই বড় মেয়ে নামিরার জ্বর। ডেঙ্গু কিংবা হাম হতে পারে—এই আশঙ্কায় হাসপাতালে ছুটে এসেছেন তিনি। ঢাকা শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগের চিকিৎসক ডা. এ বি এম মাহফুজ হাসান আল মামুন বলেন, ‘বেশির ভাগ শিশু জ্বর, শরীরে র‌্যাশ ও ডায়রিয়া নিয়ে আসছে। অনেকের পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে না, কিন্তু ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। আবার সাধারণ জ্বর থাকলেও অনেককে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে।’ তিনি জানান, প্রায় ৫ শতাংশ রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল এক দিনেই দেশে ৯৮৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে দুজনের। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৪১ হাজার ৩২ এবং মৃত্যু ১১৩ জনে পৌঁছেছে।

Manual8 Ad Code

ভাইরাস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, ডেঙ্গু সব বয়সী মানুষের হতে পারে। এর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য তীব্র শরীরব্যথা। মেরুদণ্ড ও চোখের পেছনেও ব্যথা হতে পারে। ডেঙ্গুতে জ্বর থাকা অবস্থাতেই শরীরে র‌্যাশ দেখা দিতে পারে। তবে শুধু র‌্যাশ দেখেই ডেঙ্গু নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই। রোগীর শারীরিক অবস্থা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ভিত্তিতেই রোগ নির্ণয় করতে হবে। ডেঙ্গুর সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো রক্তক্ষরণ ও শকের ঝুঁকি। তীব্র পেটব্যথা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, বারবার বমি, রক্তপাত কিংবা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। ডেঙ্গুর সঙ্গে হামের পার্থক্য বোঝার গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা হলো র‌্যাশের সময়। অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, ডেঙ্গুতে জ্বর চলাকালে র‌্যাশ দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে হামের ক্ষেত্রে সাধারণত জ্বরের পর র‌্যাশ শুরু হয় এবং শরীরের কেন্দ্র থেকে ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। হাম মূলত শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও এটি কোনোভাবেই হালকা রোগ নয়। নিউমোনিয়া এর অন্যতম গুরুতর জটিলতা হতে পারে। জিহ্বায় কপলিক স্পট এবং শরীরে লালচে র‌্যাশ দেখা দিলে বিশেষভাবে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তৃতীয় বড় শত্রু ইনফ্লুয়েঞ্জা। ডেঙ্গু বা হামের তুলনায় এর উপসর্গ আলাদা হলেও জ্বর থাকায় রোগীরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। ইনফ্লুয়েঞ্জায় হাঁচি, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া ও নাক বন্ধ হয়ে থাকা বেশি দেখা যায়। সাধারণত ডেঙ্গুর মতো তীব্র শরীরব্যথা বা হামের মতো র‌্যাশ থাকে না। কিন্তু শিশু, বয়স্ক এবং আগে থেকেই হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ফ্লু নিউমোনিয়াসহ গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে।

Manual8 Ad Code

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়াতে পারে। কিন্তু দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জাজনিত মৃত্যুর নির্ভরযোগ্য নিয়মিত হিসাব বা রেকর্ড নেই।

আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, দেশের গ্রামাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা ও দক্ষিণাঞ্চলে ডেঙ্গুর ডেন-২ ভাইরাসের প্রকোপ রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় ডেন-৩ এবং মিশ্র ডেঙ্গু সংক্রমণও দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে এ বছর আরএসভির প্রকোপও অস্বাভাবিক বেশি দেখা যাচ্ছে। দেশের ১২টি সাইট থেকে সংগৃহীত নমুনার ভিত্তিতে এই বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন ৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশের কথা রয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ভাইরাসজনিত জ্বরগুলোর উপসর্গে মিল থাকায় নিজের মতো করে ওষুধ খাওয়া বিপজ্জনক। রোগীর উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষার ভিত্তিতে চিকিৎসককে রোগের কারণ নির্ধারণ করতে হবে।

তিনি বলেন, জ্বর হলে ঘরে বসে নিজের মতো করে কিংবা গুগলের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা শুরু না করার আহবান জানিয়েছেন ডা. লেলিন চৌধুরী। তিনি বলেন, রোগীর অবস্থা খারাপ হওয়ার পর শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে এলে ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে কমে যায়।

জ্বর হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, তরল খাবার এবং বয়স ও ওজন অনুযায়ী ওআরএস দিতে হবে। তীব্র পেটব্যথা, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, বারবার বমি, পানি বা খাবার গ্রহণে অক্ষমতা, র‌্যাশ কিংবা শিশুর আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৭৮৯১০১১
১১৩৪১৫১৬১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৯৩০৩১  

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code