ঢাকার একটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি ৬৫ বছর বয়সী আবদুল করিম। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁর প্রয়োজন পুষ্টিকর খাবার।
কিন্তু দুপুরে তাঁর থালায় আসে অল্প ভাত, পাতলা ডাল আর সামান্য সবজি। পাশে বসা মেয়ের আক্ষেপ, ‘বাবার জন্য বাইরে থেকে খাবার কিনে আনতে হচ্ছে। হাসপাতালের খাবার খেয়ে সুস্থ হওয়ার চেয়ে অসুস্থ হওয়ার ভয় বেশি।’
এমন ঘটনা একটিমাত্র নয়; দেশের বেশির ভাগ সরকারি হাসপাতালেরই প্রায় একই চিত্র।
চিকিৎসা বিনামূল্যে বা স্বল্প খরচে মিললেও রোগীদের খাবারের মান ও পরিমাণ নিয়ে অভিযোগ বহু বছরের। সেই অভিযোগ, অসন্তোষ এবং ক্রমবর্ধমান খাদ্যমূল্যের চাপে এবার সরকারি হাসপাতালে রোগীদের দৈনিক পথ্য ভাতা ১৭৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫৫ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ১ সেপ্টেম্বরের এক চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্তমান বরাদ্দ ‘অপ্রতুল’ এবং বর্তমান বাজারদরে রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিমানসম্পন্ন খাবার সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
১৭৫ টাকায় তিন বেলার খাবার
বর্তমানে সরকারি হাসপাতালের সাধারণ রোগীদের জন্য দৈনিক পথ্য বরাদ্দ ১৭৫ টাকা। অর্থাৎ সকাল, দুপুর ও রাত—তিন বেলার খাবারের জন্য গড়ে মাত্র ৫৮ টাকা। এই অর্থে একজন রোগীকে ভাত, ডাল, মাছ বা মাংস, ডিম, সবজি ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব, সে প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে।
Manual7 Ad Code
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী দৈনিক বরাদ্দ বাড়িয়ে ২৫৫ টাকা করা হবে। এতে রোগীপ্রতি বরাদ্দ বাড়বে ৮০ টাকা বা প্রায় ৪৬ শতাংশ।
বিশেষ ডায়েট প্রয়োজন এমন রোগীর ক্ষেত্রে বরাদ্দ ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩১২ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা ৫৬ শতাংশ বেশি।
এক যুগে খাদ্যের দাম বেড়েছে কয়েক গুণ, বরাদ্দ বেড়েছে ধীরে : সরকারি নথি অনুযায়ী, একসময় রোগীপ্রতি দৈনিক পথ্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ৭৫ টাকা। ২০১৩ সালে তা বেড়ে ১২৫ টাকা হয়। এরপর প্রায় ৯ বছর পর ২০২২ সালে নির্ধারণ করা হয় ১৭৫ টাকা।
অর্থাৎ ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র ৫০ টাকা। অথচ একই সময়ে চাল, ডাল, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও সবজির দাম কয়েক দফায় বেড়েছে।
এখন নতুন প্রস্তাব অনুমোদিত হলে ২০১৩ সালের তুলনায় বরাদ্দ বাড়বে ১৩০ টাকা এবং পুরনো ৭৫ টাকার কাঠামোর তুলনায় বৃদ্ধি হবে ১৮০ টাকা। তবে স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশ্ন—এই বৃদ্ধি কি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে যথেষ্ট?
শুধু খাবার নয়, চিকিৎসারও অংশ
চিকিৎসকরা বলছেন, হাসপাতালে রোগীর খাবারকে শুধু ‘পথ্য’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অপারেশনের পর রোগী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি কিংবা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষের দ্রুত সুস্থ হওয়ার জন্য সুষম খাদ্য অপরিহার্য। একজন রোগী যদি প্রয়োজনীয় ক্যালরি, প্রোটিন ও ভিটামিন না পান, তাহলে তার সুস্থ হতে সময় বেশি লাগে। ফলে হাসপাতালের বেডও দীর্ঘ সময় দখল হয়ে থাকে এবং চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ে।
জনরোষের কারণ হয়ে উঠছে খাবার : স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি হাসপাতালে খাবারের নিম্নমান নিয়ে অভিযোগ প্রায় নিয়মিত। বিভিন্ন সময় রোগী ও স্বজনরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খাবারের ছবি প্রকাশ করেছে। কোথাও পাতলা ডাল, কোথাও অপর্যাপ্ত খাবার, আবার কোথাও নিম্নমানের রান্না নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
Manual2 Ad Code
মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নেও দেখা গেছে, বর্তমান বরাদ্দে রোগীদের জন্য গ্রহণযোগ্য মানের খাবার সরবরাহ করা কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে এটি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
শুধু টাকা বাড়ালেই হবে না : স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বরাদ্দ বৃদ্ধি অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই রোগীর প্লেটে ভালো খাবার পৌঁছবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। খাবার ক্রয়, রান্না, সরবরাহ ও বিতরণের পুরো প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। হাসপাতালভিত্তিক মেন্যু প্রকাশ, রোগীদের মতামত গ্রহণ এবং নিয়মিত তদারকি ছাড়া বাড়তি বরাদ্দের সুফল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
Manual8 Ad Code
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, সরকারি হাসপাতালের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘বর্তমান বাজারদরে ১৭৫ টাকা দিয়ে একজন রোগীকে দিনে তিন বেলা মানসম্মত ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। রোগীদের জন্য নির্ধারিত পথ্য শুধু পেট ভরানোর বিষয় নয়; চিকিৎসার অংশ হিসেবে তাদের প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ক্যালরি ও অন্যান্য পুষ্টি নিশ্চিত করাও জরুরি। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ, বয়স্ক ও অস্ত্রোপচারের পর রোগীদের জন্য পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব আরো বেশি। ১৭৫ থেকে ২৫৫ টাকা করার প্রস্তাবটি সেই প্রয়োজন থেকেই এসেছে। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, খাবারের মান, পরিমাণ ও সঠিকভাবে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। অপচয় ও অনিয়ম বন্ধ করে বরাদ্দের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি।’
Manual8 Ad Code
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘রোগীদের খাবারের বরাদ্দ কমপক্ষে দ্বিগুণ হওয়া উচিত ছিল। ২০২৬-২৭ জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে যে হারে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রোগীর পথ্যের বরাদ্দও বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। অন্তত ৩৫০ টাকা করা হলো না কেন—এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কারণ এটি কোনো বিলাসী ব্যয় নয়; অসুস্থ ও দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার অংশ হিসেবেই পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তবে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সেই অর্থ রোগীর কাছে বাস্তব সুফল হিসেবে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং স্বাধীন ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে বাড়তি বরাদ্দের একটি বড় অংশ অপচয়, অনিয়ম কিংবা প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী মহলের পকেটে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।’