প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৩ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৭ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

ডলারের মতোই সময়ও যেন এক আরাধ্য মুদ্রা

editor
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ০৯:৩৬ পূর্বাহ্ণ
ডলারের মতোই সময়ও যেন এক আরাধ্য মুদ্রা

Manual1 Ad Code

প্রজন্ম ডেস্ক:

স্বপ্নের দেশ যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের বসতি গড়ে ওঠার ইতিহাস কয়েক দশকের। প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে বসবাস থাকলেও বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বড় ঘনবসতি নিউইয়র্কে। কুইন্সের জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা, ব্রঙ্কসের বিভিন্ন এলাকা কিংবা লং আইল্যান্ডের নানা শহরতলিÑ কোথাও বাংলা সাইনবোর্ড, কোথাও বাংলাদেশি গ্রোসারি, আবার কোথাও রেস্টুরেন্টের মেনুতে ভাত, ইলিশ, খিচুড়ি ও বিরিয়ানি। দোকানে ঢুকলে পাওয়া যায় দেশের মসলা, চাল, ডাল, শুঁটকি ও আচার। পরিচিত পণ্যের গন্ধ যেন দূরদেশে থেকেও বাড়ির উঠোনের কথা মনে করিয়ে দেয়।

নিউইয়র্কের পাশাপাশি নিউ জার্সি, ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস, মিশিগান ও ফ্লোরিডাতেও বাংলাদেশিদের উল্লেখযোগ্য বসতি তৈরি হয়েছে। তবে একই শহরে বসবাস করলেও সবার জীবন এক নয়। কেউ বহু বছর ধরে ব্যবসা করছেন, কেউ পেশাজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, কেউ সদ্য এসেছেন। কারও সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে জন্মেছে, কারও সন্তান এখনও বাংলাদেশে। ফলে ‘প্রবাসী বাংলাদেশি’ পরিচয়ের ভেতরেও রয়েছে নানা শ্রেণি ও অভিজ্ঞতা।

 

বাংলাদেশে প্রবাসজীবনকে অনেক সময় শুধু আয়ের হিসাব দিয়ে দেখা হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জীবনযাত্রার ব্যয় সেই হিসাবকে অনেক বেশি জটিল করে তুলেছে। বাড়িভাড়া, স্বাস্থ্যবীমা, গাড়ি, গাড়ির বীমা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ফোন, সন্তানের শিক্ষা ও দৈনন্দিন বাজারÑ সব মিলিয়ে মাসিক ব্যয়ের তালিকা দীর্ঘ। তাই টিকে থাকতে অনেক সময়ই পরিবারের একাধিক সদস্যের আয় প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে বৈশ্বিক অস্থিরতাও নতুন চাপ তৈরি করে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও জ্বালানি-নির্ভর পণ্যের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও এসে পড়ে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে; তার প্রভাব পড়ে খাদ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও বিভিন্ন সেবার দামেও। ফলে একজন অভিবাসীর জন্য বেশি আয় মানেই বেশি সঞ্চয়Ñ এই সমীকরণ আগের মতো সরল নেই।

 

Manual8 Ad Code

নিউইয়র্কে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসী রাকিব হাসান (ছদ্মনাম) বলেন, কয়েক বছর আগে যে আয় দিয়ে পরিবারের মাসিক খরচ মিটিয়ে কিছু টাকা দেশে পাঠানো সম্ভব হতো, এখন একই আয়ে সেই হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাড়িভাড়া, বাজার, গাড়ির খরচ, বীমা-সবকিছুর ব্যয় বেড়েছে। তার ওপর দেশে পরিবারের জন্য টাকা পাঠানোর দায়িত্ব তো রয়েছেই।

রাকিবের মতো অনেক প্রবাসীর কাছে তাই ডলার আয় শুধু ব্যক্তিগত সচ্ছলতার বিষয় নয়। সেই আয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই দেশের দুটি সংসার। কেউ দেশে বাড়ি করছেন। কেউ বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচ পাঠাচ্ছেন। কেউ ভাইবোনের পড়াশোনায় সহায়তা করছেন। আবার কেউ সন্তানদের কলেজের খরচের জন্য সঞ্চয় করছেন। অর্থাৎ প্রবাসীর আয় অনেক সময় একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত একটি পারিবারিক অর্থচক্র তৈরি করে।

 

ডলারের পেছনে ছুটছে সময়

অনেক বাংলাদেশি দিনের একটি বড় সময় কর্মস্থলে কাটান। সপ্তাহের পাঁচ দিন কাজের পাশাপাশি কেউ কেউ ছুটির দিনেও অতিরিক্ত কাজ করেন। কেউ রাইডশেয়ার চালান, কেউ ডেলিভারি করেন, কেউ দোকানে অতিরিক্ত শিফট নেন। এই পরিশ্রমের পেছনে শুধু নিজের জীবন নয়Ñ থাকে পরিবারের ভবিষ্যৎ। কিন্তু এর একটি অদৃশ্য মূল্যও আছেÑ সময়। সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানো কমে যায়। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ কমে। দেশে থাকা মা-বাবার সঙ্গে কথা বলার সময়ও অনেক সময় কাজের ফাঁকে বের করতে হয়। প্রবাসজীবনের এই হিসাব তাই শুধু ডলারে মাপা যায় না। এখানে সময়ও এক ধরনের ‘মুদ্রা’Ñ যা খরচ হয়, কিন্তু ফেরত পাওয়া যায় না।

 

ঘরের ভেতর বাংলাদেশ, বাইরে আমেরিকা

বাংলাদেশি পরিবারগুলোর একটি বড় বাস্তবতা হলো দ্বৈত সাংস্কৃতিক পরিচয়। বাড়িতে বাংলা ভাষা, ঈদ, রমজান, বাংলা খাবার, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগÑ সবই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখে। কিন্তু স্কুল, কলেজ, কর্মক্ষেত্র ও বন্ধুদের জগতে সন্তানরা মূলত আমেরিকান পরিবেশে বড় হয়। এখান থেকে কখনও কখনও পরিবারে প্রজন্মগত দূরত্ব তৈরি হয়।

Manual8 Ad Code

বাবা-মা চান সন্তান বাংলা বলুক, বাংলাদেশের ইতিহাস জানুক, আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক রাখুক। সন্তান চায় নিজের স্কুল, বন্ধু, ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত পছন্দের জগৎ নিয়ে এগোতে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই অনেক পরিবারের প্রতিদিনের চ্যালেঞ্জ। তবে প্রবাসী বাংলাদেশিরা এই দূরত্ব কমাতে নানা উদ্যোগও নিয়েছেন। বাংলা স্কুল, সাংস্কৃতিক সংগঠন, মসজিদ, কমিউনিটি সেন্টার, সামাজিক সংগঠন ও বিভিন্ন উৎসবের আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে বাংলাদেশের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত রাখার চেষ্টা চলছে।

Manual1 Ad Code

 

নিঃসঙ্গতাও আছে এই জীবনে

প্রবাসজীবনের সবচেয়ে কম আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো একাকিত্ব। একই শহরে হাজার হাজার বাংলাদেশি থাকলেও প্রত্যেকের ব্যক্তিগত জীবন আলাদা। কাজের ব্যস্ততা, দূরত্ব, পারিবারিক সমস্যা কিংবা দেশে থাকা স্বজনদের নিয়ে উদ্বেগÑ সব মিলিয়ে অনেকের জীবন বাইরে থেকে যতটা সচ্ছল দেখায়, ভেতরে ততটা সহজ নয়।

বাবা-মায়ের অসুস্থতার খবর আসে ফোনে। সন্তানের বড় হয়ে ওঠা দেখা হয় ভিডিও কলে। কারও জানাজায় অংশ নেওয়া সম্ভব হয় না। আবার দেশে কোনো আনন্দের অনুষ্ঠান হলেও কর্মস্থলের ছুটি না মেলায় সেখানে থাকা যায় না। প্রবাসজীবনের এই দূরত্বের সবচেয়ে বড় মূল্য সম্ভবত সময়। টাকা পাঠানো যায়, উপহার পাঠানো যায়; কিন্তু সময় পাঠানো যায় না।

 

শেকড় কি সত্যিই দূরে যায়?

বাংলাদেশি প্রবাসীদের জীবন তাই এক অদ্ভুত সমীকরণ। একদিকে আমেরিকান স্বপ্ন-নিরাপদ ভবিষ্যৎ, ভালো শিক্ষা, পেশাগত উন্নতি, সন্তানের জন্য সুযোগ। অন্যদিকে বাংলাদেশের টান-পরিবার, আত্মীয়তা, ভাষা, খাবার, স্মৃতি ও মাটির সম্পর্ক। অনেকেই শেষ পর্যন্ত দুই দেশকে নিজের জীবনের দুই অংশ হিসেবে দেখেন।

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করলেও দেশের খবর নিয়মিত পড়েন তারা। বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, গ্রামের বাড়ির অবস্থা কিংবা আত্মীয়ের খবর জানতে চান। কেউ দেশে জমি কিনছেন, কেউ বাড়ি করছেন, কেউ অবসর নিয়ে দেশে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন।

আবার নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছে ‘ফিরে যাওয়া’ ধারণাটি আগের প্রজন্মের মতো সরল নয়। তাদের জন্ম, শিক্ষা ও পেশাগত ভবিষ্যৎ যুক্তরাষ্ট্রেই গড়ে উঠছে। তাই প্রবাসজীবনের গল্প আসলে শুধু অভিবাসনের গল্প নয়। এটি পরিচয় বদলের গল্প, প্রজন্ম বদলের গল্প, একই সঙ্গে দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার গল্প।

নিউইয়র্কের ব্যস্ত রাস্তায়, নিউ জার্সির শহরতলিতে কিংবা টেক্সাসের কোনো নতুন বসতিতে বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জীবন প্রতিদিন নতুন করে সেই গল্প লিখছে। সকালে তারা আমেরিকার কর্মজীবনে বেরিয়ে পড়েন। রাতে ঘরে ফিরে হয়তো বাংলায় কথা বলেন। সপ্তাহান্তে সন্তানের সঙ্গে সময় কাটান। ফোনে দেশে থাকা মা-বাবার খোঁজ নেন। তারপর আবার নতুন সপ্তাহ। নতুন কাজ। নতুন হিসাব। বাড়তি খরচের সঙ্গে নতুন করে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। আর বুকের ভেতর একই সঙ্গে দুই দেশের ঠিকানা।

 

Manual2 Ad Code

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪৫
৭৮৯১০১১১১৩
৪১৫১৬১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৯৩০  

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code