ফের আলোচনায় এসেছে বিভিন্ন দেশে সিঙ্গেল নারীদের নিয়মিত যাতায়াতের ঘটনা। অভিযোগ উঠেছে মালায়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও নেপালে যাওয়া-আসা করা মেয়েদের একটি অংশ সেসব দেশের নাইট ক্লাবে ড্যান্সসহ নানা ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ছে। বিদেশে তাদের নিয়ে যাচ্ছে এ দেশেরই কিছু অসাধু ব্যক্তি। ব্যবসায়ী পরিচয়ে বিদেশে চলাফেরা বা অবস্থান করলেও এই ব্যক্তিরা মূলত ওইসব দেশের ক্লাবগুলোর এজেন্টের কাজ করে থাকেন। দেশের বিভিন্ন ড্যান্স ক্লাব থেকে তারা নারীদের বাছাই করে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার বেশ কয়েকজন নারীর পাসপোর্ট ব্লক করা হয়েছে এসবির ইমিগ্রেশন শাখা থেকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি মো. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। আমরা বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছি। পাশাপাশি দেশের ড্যান্সক্লাব, নাইটক্লাব ও বারে এ ধরনের কাজে যুক্তদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তবে বিদেশ থেকে কোনো ধরনের মামলা বা অপকর্মের তথ্য পাওয়া যায়নি।’
সূত্র জানাচ্ছে, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও নেপাল ঘিরে প্লেজার ট্যুরের জন্য গড়ে ওঠা শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বেশিরভাগই বাংলাদেশি। রাজধানী ঢাকার ড্যান্স ক্লাব ও অভিজাত বার নাইটক্লাব থেকে নারীদের পছন্দ করে ট্যুরিস্ট ভিসায় তাদের ওইসব দেশে নিয়ে যায় এই এজেন্টরা। সেখানে এই নারীরা বিভিন্ন ক্লাবে নামমাত্র বেতনে নির্দিষ্ট কয়েক দিন নৃত্য পরিবেশন করে। এ সময় তারা মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে নানা অসামাজিক কার্যকলাপও করে থাকে। উপার্জিত টাকার বড় অংশ লেনদেন হয় দেশে হুন্ডির মাধ্যমে। মূলত কাজটি বিদেশে হলেও পেমেন্ট করা হয় দেশে। আসা-যাওয়া ও ভিসা প্রাপ্তির খরচ বহন করে থাকে বিদেশি ক্লাবের মালিক পক্ষ। অবশ্য তাদের পেমেন্ট করা হয় এসব খরচ বাদে। সব মিলিয়ে এক সপ্তাহে একজন নারী অন্তত ৮০ থেকে এক লাখ টাকা উপার্জন করে থাকে। মৌখিক চুক্তিতে কাজ হয় বলে অনেক সময় পেমেন্টের টাকা নিয়েও প্রতারণার ঘটনাও ঘটে। অস্বাভাবিকভাবে যাতায়াত করা এ রকম একাধিক নারীর তথ্য পাওয়ার পর নড়েচড়ে বসে গোয়েন্দারা। এ সম্পর্কে জানানো হয় পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবির) ইমিগ্রেশনকে। এরপর বেশ কয়েকজন নারীর পাসপোর্ট ব্লক করা হয়।
Manual2 Ad Code
এভাবে বিদেশে যাতায়াত করা এক নারী জানান, রাজধানীর সবুজবাগ মাঠ লাগোয়া একটি ড্যান্স ক্লাবে তিনি প্র্যাকটিস করতেন। সেখানে মালয়েশিয়া থেকে আসা এক ব্যক্তির পক্ষ থেকে একদিন তাদের মালয়েশিয়া ড্যান্স ক্লাবে নাচের আমন্ত্রণ জানানো হয়। এর সম্মানীও বেশ লোভনীয় হওয়ায় তিনিসহ সাত জনের একটি দল ট্যুরিস্ট ভিসায় সে দেশে যান। তাদের একটি হোটেলে রাখা হয়। সন্ধ্যার পর তাদের ক্লাবটির অফিস কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ভারত ও বাংলাদেশের আরও দুজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। এ দুজনের মধ্যে একজন মালয়েশিয়ান ধাতু কার্ডধারী অর্থাৎ তার সে দেশে কর দিয়ে ক্লাব চালানোর অনুমতিপত্র রয়েছে। ক্লাবটিতে তাদের সারা রাত নাচতে হতো। হোটেলে ফিরতেন ভোররাতে। বিনিময়ে দেওয়া হতো জনপ্রতি ১০০ রিঙ্গিত। উপরি হিসেবে নাচানাচির সময় বকশিশও পেতেন তারা।
মালয়েশিয়াফেরত এই নারী জানান, ‘ক্লাবটিতে ভারত, নেপাল ও ইন্দোনেশিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশের নারীও নৃত্য করে। তবে চাহিদা বেশি বাংলাদেশি নারীদের। দুদিন যাওয়ার পর একজনের সঙ্গে রাত কাটানোর অফার আসে। জানানো হয়, পেমেন্টের দুইভাগ পাবেন ধাতু কার্ডধারী ব্যক্তি। দেশে আসার পর আমাকে বিকাশে আমার ভাগ পেমেন্ট করা হবে। সব মিলিয়ে প্রথমবারই প্রায় এক লাখ টাকা আয় হয়। এভাবে ৩ মাসে ৫ বার যাওয়ার পর আমাকে ইমিগ্রেশন আটকে দেয়। তবে সিন্ডিকেটের সদস্যরাই বিষয়টির সমাধান করে আমাকে মালয়েশিয়ায় নিয়ে যায়। কিন্তু ৫ আগস্টের পর পাসপোর্ট ব্লক করে দেওয়ায় এখন আর দেশের বাইরে যেতে পারছি না।’
Manual3 Ad Code
অপর এক নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রাজধানীর টঙ্গী এলাকার জাভান হোটেল থেকে নির্বাচিত করে মালয়েশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। পাশাপাশি তিনি থাইল্যান্ড আর নেপালেও গিয়েছেন। কাজ শেষে দেশে ফিরে এলে তার পেমেন্ট নিয়ে ঝামেলা করা হয়। একপর্যায়ে তিনি সামাজিক মাধ্যমে ওই ব্যক্তি সম্পর্কে স্ট্যাটাস দিতে শুরু করেন। তখন তাকে আংশিক পেমেন্ট দিয়ে পোস্টগুলো মুছে দিতে বাধ্য করা হয়।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নেপালে অবস্থানকালে কার্যক্রম নিষিদ্ধ মহিলা আওয়ামী লীগের গাজীপুর মহানগরের সাধারণ সম্পাদক ফাহিমা আকতার হোসনা সেখানে এ রকম একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। বাংলাদেশ থেকে নারীদের নিয়ে গিয়ে যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করানোর অভিযোগ রয়েছে তার নামে। এই অভিযোগে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তাকেসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে নেপাল পুলিশ। তবে দুই সপ্তাহ পর জামিনে বেরিয়ে শ্রীলঙ্কা পালিয়ে গেছেন নিষিদ্ধ মহিলা আওয়ামী লীগের এই নেতা।
এ বিষয়ে কাঠমান্ডুতে অবস্থানরত এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী জানান, ‘এখানে একটা সিন্ডিকেট আছে। গাজীপুরের যে হোসনা, তিনি মূলত এখানকার ‘সর্দারনি’ টাইপের একজন। বাংলাদেশের কেউ কেউ এখানে যৌনব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। আবার কেউ কেউ আছে, যারা এখান থেকে চীনে চলে গেছে।’
এমন প্রেক্ষাপটে নেপালে নারীদের যাতায়াতের বিষয়ে কড়াকড়ি চলছে। সম্প্রতি বিমানবন্দর থেকে তিন নারীকে দেশের বাইরে যেতে না দেওয়াও সেই কড়াকড়ির অংশ বলে দাবি করেছেন ইমিগ্রেশন পুলিশ কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মালায়েশিয়ায় অবস্থানরত এক দালাল নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা কাউকে জোর করে আনি না। তারা সব জেনেশুনেই আসে। এরপর বেশি টাকা দাবি করে। তাদের চাহিদামতো টাকা না পেলেই নানা ধরনের অভিযোগ করে, যার অধিকাংশই সত্য নয়।’