জামালপুরের ইসলামপুর রেলস্টেশন। যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের আনাগোনা, ট্রেনের হুইসেল আর ব্যস্ততা। এরই মাঝে এক কোণে বসে থাকে এক কিশোর, নাম তার শ্রাবণ। তার জীবনের গল্পটা একটু আলাদা, একটু ব্যতিক্রমী। মানুষের ভিড়ে থেকেও সে যেন মানুষহীন, তবে একেবারে একা নয় সে। তার জীবনের সবচেয়ে কাছের সঙ্গী দুটি কুকুর। তার আশপাশেই ঘোরে এই কুকুর দুটি। এ দুই সঙ্গীকে ঘিরেই এখন তার দিন-রাত।
Manual5 Ad Code
গত সাত মাস ধরে ইসলামপুর রেলস্টেশনই তার আশ্রয়। এখানেই খাওয়া, ঘুম আর দিনাতিপাত। কুকুর দুটিও যেন তার পরিবারের অংশ হয়ে উঠেছে। শ্রাবণের বাড়ি শেরপুর সদর উপজেলার কুসুমহাটি এলাকায়। ছোটবেলায় মা হারানোর পর পারিবারিক কলহে ঘর ছাড়তে হয় তাকে। এরপর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে এখন তার ঠিকানা এই স্টেশন।
Manual7 Ad Code
পাঁচ বছর বয়সে শ্রাবণ মাকে হারিয়ে এতিম হয়ে পড়েন। বাবা রবিউল ইসলাম আবার বিয়ে করেন। সৎ মায়ের অত্যাচারে ঘর ছেড়ে চলে আসেন শ্রাবণ। যেখানে স্বজনরূপে সঙ্গী হওয়ার কথা কোনো মানুষের, সেখানে তার সখ্য এখন দুটি কুকুরের সঙ্গে।
Manual2 Ad Code
স্থানীয়রা জানান, কয়েক বছর আগে পারিবারিক টানাপোড়েনের কারণে ঘর ছাড়তে বাধ্য হয় শ্রাবণ। নিজের খাবারের অংশ ভাগ করে দেয় কুকুর দুটিকে। রাস্তা ঘাটে প্লাস্টিক ও ভাঙারি কুড়িয়ে তা বিক্রি করেই শ্রাবণ ও কুকুরের খাবারের ব্যবস্থা হয়। মাঝে মাঝে মানুষের কাছে হাত পেতে কিছু পেলে তার বেশির ভাগ অংশই চলে যায় কুকুরের পেটে। কুকুর খেতে পারলেই শ্রাবণ তৃপ্তি পায়। অভাবের মাঝেও ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। রাতে যখন স্টেশন জনমানবহীন হয়ে যায়, তখন শ্রাবণ আর তার দুই সঙ্গী জড়িয়ে থাকে একে অপরের উষ্ণতায়।
রেলস্টেশনে এমন দিনাতিপাত দেখে স্থানীয় কয়েকজন যুবক শ্রাবণের পাশে এসে দাঁড়ায়। তারা নিজস্ব উদ্যোগে শ্রাবণকে তার পরিবারের সন্ধান করে তাদের কাছে পৌঁছে দেন। কুকুরদ্বয়ের টানে ও সৎ মায়ের অত্যাচারে দুদিন পরেই আবার চলে আসে শ্রাবণ।
Manual1 Ad Code
তার কাছে এই স্টেশনই এখন ঘর। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কেটে যায় প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে কিংবা কোনো এক কোণে। জীবন তাকে দিয়েছে একাকিত্ব, কিন্তু সেই শূন্যতা পূরণ করেছে তার দুই নীরব বন্ধু।
মানুষের ভিড়ে থেকেও কখনো কখনো মানুষই হয়ে ওঠে একা। তবে ভালোবাসা থেমে থাকে না, তা খুঁজে নেয় নিজের পথ। ইসলামপুর রেলস্টেশন শ্রাবণের জীবনে সেই ভালোবাসার জায়গা। অভাব, অনটন আর অনিশ্চয়তার মাঝেও স্টেশনের দুটি বোবা প্রাণীর সঙ্গেই এগিয়ে চলেছে তার জীবন।