চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার মোহাম্মদ হোসেন (৩২) গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর কাতারে মারা যান। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় মৃত্যুর প্রায় আট মাস আগে কাতারে পাড়ি জমান তিনি। কিন্তু ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে পারলেন না। তিনি ফিরলেন লাশ হয়ে। তার মৃত্যুর কারণ পরিবারের কাছে অজানা। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, তার মতো আরও ৪ হাজার ৮১৩ প্রবাসীর লাশ গেলো বছর দেশে এসেছে। তাতে দেখা গেছে, প্রতি মাসে গড়ে ৪০০ এবং দিনে গড়ে ১৩ জনের লাশ দেশ আসে। আর এ বছরের প্রথম মাসেই লাশ এসেছে ৪৪৭ জনের।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য বলছে, ১৯৯৩ সাল থেকে গত ৩২ বছরে ৫৭ হাজার ২১৬ প্রবাসীর লাশ দেশে এসেছে। এই ৩২ বছরের তথ্যই বোর্ডের কাছে আছে। তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতিবছরই লাশের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।
কল্যাণ বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, এর বাইরে অনেক লাশ বিদেশের মাটিতেই দাফন করা হয়। অনেক পরিবার লাশ দেশে আনতে চান না। যার ফলে পরিবারের অনুমতি সাপেক্ষে বিদেশেই লাশ দাফনের ব্যবস্থা করে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস।
প্রসঙ্গত, লাশ দেশে এলে বিমানবন্দরে অবস্থিত প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে দাফন ও লাশ পরিবহনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা দেওয়া হয় বোর্ডের পক্ষ থেকে। এছাড়া বিদেশ থেকে লাশ নিয়ে আসতেও সহায়তা করে বোর্ড।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৫ সালের পর থেকে দেশে প্রবাসীদের লাশ আসার সংখ্যা বাড়ছে। ২০০৫ সালে লাশ এসেছে ১ হাজার ২৪৮ জনের, ২০০৬ সালে ১ হাজার ৪০২, ২০০৭ সালে ১ হাজার ৬৭৩, ২০০৮ সালে ২ হাজার ৯৮, ২০০৯ সালে ২ হাজার ৩১৫, ২০১০ সালে ২ হাজার ৫৬০, ২০১১ সালে ২ হাজার ৫৮৫, ২০১২ সালে ২ হাজার ৮৭৮, ২০১৩ সালে ৩ হাজার ৭৬, ২০১৪ সালে ৩ হাজার ৩৩৫, ২০১৫ সালে ৩ হাজার ৩০৭, ২০১৬ সালে ৩ হাজার ৪৮১, ২০১৭ সালে ৩ হাজার ৩৮৭, ২০১৮ সালে ৩ হাজার ৭৯৩, ২০১৯ সালে ৩ হাজার ৬৫১ জন, ২০২০ সালে ৩ হাজার ১৪০, ২০২১ সালে ৩ হাজার ৮১৮ জন, ২০২২ সালে ৩ হাজার ৯০৪, ২০২৩ সালে ৪ হাজার ৫৫২ জন এবং ২০২৪ সালে ৪ হাজার ৮১৩ জনের লাশ এসেছে দেশে। সবচেয়ে বেশি লাশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে।
চার বছর আগে নোয়াখালীর রবিউল আউয়াল জীবিকার তাগিদে আবুধাবির আজমান শহরে যান। সেখানে তিনি কনস্ট্রাকশনের কাজ করতেন। গত ২৩ মার্চ রাতে ঘুমের মধ্যেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। চিকিৎসকরা জানান, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা গেছেন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, কোনও রোগে মারা গেলে সেটিকে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে ধরা হয়। এর বাইরে প্রবাসীদের বেশিরভাগ মৃত্যুর কারণ হচ্ছে দুর্ঘটনা। প্রবাসী কর্মীদের মৃত্যুর কারণ জানতে সরকারিভাবে কোনও গবেষণা করা হয়নি।
তবে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা যায়, প্রবাসীকর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারা যান মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত বা ব্রেইন স্ট্রোকের কারণে। আবার মৃতদের একটা বড় অংশই মধ্যবয়সী কিংবা তরুণ। এছাড়াও হৃদরোগসহ বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, কিংবা প্রতিপক্ষের হাতেও খুন হন বাংলাদেশিরা। এসব মৃত্যু পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বেশিরভাগই মারা গেছেন ৩৮ থেকে ৪২ বছরের মধ্যে এবং কাজে যোগদান করার অল্প সময়ের মধ্যে।
Manual3 Ad Code
বিদেশে কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রবাসীকর্মীদের মৃত্যুর হার এত বেশি কেন তা কখনও খতিয়ে দেখা হয়নি। আবার এত বেশি কর্মী স্ট্রোক অথবা হার্ট অ্যাটাকে কেন মারা যাচ্ছেন তার সঠিক কারণ জানতেও অনুসন্ধান করা হয়নি। তাদের মৃত্যুর কারণে যা লেখা হয় তাও পুনরায় খতিয়ে দেখার নজির নেই। প্রবাসী কর্মীদের অভিযোগ, কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ এড়াতেও স্ট্রোকে কিংবা হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর কথা ডেথ সার্টিফিকেটে লেখা হয় অনেক সময়।
Manual2 Ad Code
মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, প্রবাসীদের লাশ সবচেয়ে বেশি আসে সৌদিআরব থেকে। এছাড়াও জর্ডান, কুয়েত, লিবিয়া, মালয়েশিয়া, ওমান থেকেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লাশ দেশে আসে।
প্রবাসীকর্মীদের এই ধরনের অকাল মৃত্যুতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার পুরো পরিবার। বেসরকারি সংস্থা অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ) ২০২০ সালে একটি জরিপ চালিয়ে দেখেছে, ৯৫ শতাংশ অভিবাসী কর্মীর মৃত্যুর পর আর্থিক সংকটে পড়ে যায় তার পুরো পরিবার। তার মধ্যে ৫১ শতাংশ পরিবারের ৮০ ভাগ আয় কমে যায়। পাশাপাশি ৮১ শতাংশ পরিবার স্বাস্থ্যসেবা পেতে সংকটে পড়ে, ৬১ শতাংশ পরিবারের সন্তানেরা স্কুলে যাওয়ার সক্ষমতা হারায়, আর ৯০ শতাংশ পরিবারই দৈনিক খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেয়।
প্রবাসীকর্মীর মৃত্যুর পর ৪৮ শতাংশ পরিবারই বিষণ্নতায় ভোগে, ৪০ শতাংশ পরিবারের ঘুমের জটিলতা তৈরি হয়। তাছাড়া কিছু কিছু পরিবারের এক ধরনের দায় চাপাচাপির মতো পরিবেশ তৈরি হয়।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য মূলত মরু আবহাওয়ার দেশ। প্রচণ্ড গরমে প্রতিকূল পরিবেশে অদক্ষ এই বাংলাদেশিরা ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন কাজে যুক্ত থাকেন। একদিকে প্রতিকূল পরিবেশ, আরেকদিকে অমানুষিক পরিশ্রম, ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকা, দীর্ঘদিন স্বজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং সব মিলিয়ে মানসিক চাপের কারণেই সাধারণত স্ট্রোক বা হৃদরোগের মতো ঘটনা ঘটে।
Manual1 Ad Code
অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠার রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু) ২০২৩ সালে ‘প্রাণঘাতী তাপ: উপসাগরীয় অঞ্চলে অভিবাসী কর্মীদের ওপর চরম তাপমাত্রা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকদের একটি বড় অংশ অবকাঠামো নির্মাণ খাতে কাজ করে। এই শ্রমিকদের দিনের বেলায় প্রচণ্ড তাপের মধ্যে কাজ করতে হয়। ফলে তাপজনিত নানা রোগে কিডনি, মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে শরীরের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব দেশে তাপ আরও বাড়ছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসীদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়াচ্ছে অতিরিক্ত তাপ।
চরম তাপ ও সূর্যালোকে দীর্ঘ সময় কাজ দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যার দিকে ঠেলে দেয়, যার জন্য আজীবন চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। এতে প্রবাসী কর্মীরা অকালমৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায় এবং কাজ করার ক্ষমতা হারায়। দিন ও রাতের তাপমাত্রা বৃদ্ধি শরীরে ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করে এবং শ্বাসতন্ত্র ও হৃদরোগ, বহুমূত্র রোগ, কিডনি রোগের প্রভাবকে বাড়িয়ে তুলতে পারে।
এছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলের (মধ্যপ্রাচ্য) ছয়টি দেশে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রতি দুই জনের মধ্যে একজনের মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যায় না। এমন মৃত্যুকে প্রাকৃতিক কারণ বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হিসেবে সনদ দেওয়া হয়। বিপজ্জনক ঝুঁকি থাকলেও কর্মীদের ওপর তাপের প্রভাব সম্পর্কে কোনও তথ্য নেই। তাপসংক্রান্ত কারণে প্রাণহানি বা কোনও মৃত্যুর ক্ষেত্রে প্রাপ্ত তথ্যের কোনও নিবন্ধন নেই।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, আমরা সবসময় বলি প্রবাসীদের এসব মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করতে। কারণ, আমরা যদি কিছু লাশ স্যাম্পল ধরে গবেষণা করি, তাতে বোঝা যায় যে কী কারণে মারা গেলো। আমরা দেখেছি যে মধ্যপ্রাচ্যে যেসব কর্মী মারা যান, তার বড় কারণ হচ্ছে— আমাদের কর্মীরা স্বাস্থ্যগত বিষয়গুলো জানেন না। ১৮-২০ ঘণ্টা পরিশ্রম করেন। আর অবৈধভাবে যাওয়ার ফলে চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন না। আবার সস্তায় মাংস ও সিগারেট খেতে পান, গাদাগাদি করে থাকেন। অনেক বিষয়ে কর্মীদের কিন্তু যাওয়ার আগেই সচেতন করা যায়।
তিনি আরও বলেন, বিদেশে গিয়ে জীবনটা কেমন হবে, চিকিৎসকের কাছে পরামর্শ কীভাবে নেবে, কীভাবে থাকবে– এসব বিষয়ে যদি সচেতনতা তৈরি করা যায়, তাতেও এই অস্বাভাবিক মৃত্যু অনেকখানি কমিয়ে আনা যায়। রাষ্ট্রীয়ভাবে আমরা এত মৃত্যুর যে কারণ খুঁজবো, সেরকম কিছু এখনও পর্যন্ত হয়নি। অনুসন্ধান করলে কিছু পরামর্শ তৈরি করা যেতো।
Manual7 Ad Code
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রবাসী কর্মীদের অকাল মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিদেশ যাওয়ার আগে একটি তিনদিনের প্রি-ডিপারচার অরিয়েন্টেশন করানো হয় কর্মীদের। সেখানে গন্তব্য দেশের আবহাওয়া সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, মৃত্যুর কারণ নিয়ে কাজ করাটা বেশ কঠিন। কারণ যেসব লাশ আসে, সেগুলোর ময়নাতদন্ত হয় ওই দেশেই। ওই সবদেশের নীতির কারণেই এটা হয়। আর দেশে আসার পর পরিবার আর ময়নাতদন্ত করাতে চায় না। ফলে অজানাই থেকে যাচ্ছে এসব মৃত্যুর সঠিক কারণ।