নির্বাচনের রোপম্যাপ (পথনকশা) ঘোষণা করায় বিএনপি ও তার শরিকরা খুশি হলেও নাখোশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তারা বলছে, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু জুলাই সনদের ফয়সালা না করেই নির্বাচন কমিশন জাতীয় নির্বাচনের রোডম্যাপ দিয়েছে। এ জন্য তারা এটিকে স্বাগত জানতে পারছেন না। সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে জুলাই সনদ কীভাবে বাস্তবায়ন হবে। সেই সঙ্গে নির্বাচন কোন প্রক্রিয়ায় হবে তারও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি ঠিক করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের তরফ থেকে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না এলে পরবর্তী রাজনৈতিক করণীয় ঠিক করবে জামায়াত ও এনসিপি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া এসেছে অন্য রাজনৈতিক দলের তরফ থেকে। এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও।
রাজনৈতিক দলগুলোর মতভেদের কারণে বহুল আলোচিত জুলাই সনদ জুলাই মাসে চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। আগস্টের শেষদিকে এসেও রাজনৈতিক দলগুলো সনদের বিষয়ে একমত হতে পারছে না। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার নির্বাচনি কাজের সময়সূচিভিত্তিক রোডম্যাপ (পথনকশা) গত বৃহস্পতিবার ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে রোজা শুরুর আগে সংসদ নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে এ রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়।
Manual7 Ad Code
জুলাই সনদ চূড়ান্ত হওয়ার আগে নির্বাচনি রোডম্যাপ ঘোষণা সরকারের প্রতিশ্রুতি ভঙের শামিল বলে উল্লেখ করেছে এনসিপি। দলটি বলছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত না করে নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ ভবিষ্যতে সংকট তৈরি করতে পারে এবং এর দায় সরকারকেই নিতে হবে। রোডম্যাপ নিয়ে গতকাল এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আরিফ সোহেল বলেন, আমরা প্রথমত জানতে চাই নির্বাচন কোন প্রক্রিয়ায় হবে? সেটি স্পষ্ট না করে রোডম্যান কেন? আমরা জুলাই সনদের বাস্তবায়ন চাই। সেটা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে সেই আলোচনা চলমান। আমরা চাচ্ছি গণপরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে। বিএনপি সেটি চাচ্ছে না। কেউ কেউ গণভোট চায়। এমন আলোচনার মধ্যেই নির্বাচন কমিশন রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। এটা তো তা হলে আলোচনার নামে প্রহসন। তিনি বলেন, বিএনপির পক্ষে রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে ইসি। সরকারের কাছে স্পষ্ট হতে চাই জুলাই সনদের আলোচনা শেষ না করে রোডম্যাপ কেন? সরকার যদি এ পথেই হাঁটে তা হলে এনসিপি নির্বাচন নিয়ে পরবর্তী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেবে।
এয়োদশ সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা হওয়ায় বেজায় খুশি বিএনপি। রোডম্যাপ ঘোষণার পরপর সবার আগে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেয় দলটি। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, রোডম্যাপ ঘোষণা হয়েছে। আমরা এতে আশাবাদী হয়েছি। এ রোডম্যাপ থেকে বোঝা যায়, নির্বাচন কমিশন ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন করার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। মূল কথা হচ্ছে, আমরা খুশি, উই আর হ্যাপি।
তবে ৫ আগস্টের পর বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠা জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনি রোডম্যাপ ঘোষণায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এ রোডম্যাপ গতানুগতিক এবং কিছুটা বিভ্রান্তিমূলক। কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে তা এখনও ঠিক হয়নি। এমনকি জুলাই জাতীয় সনদের আইনি ভিত্তি প্রদান এবং এর বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত হয়নি। এই অবস্থায় রোডম্যাপ ঘোষণা অপরিপক্ব ও আংশিক।
জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি জোট গঠন প্রক্রিয়ায় থাকা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও অভিন্ন সুরে কথা বলছে। নির্বাচনি রোডম্যাপ জুলাইকে অস্বীকার করার নামান্তর হিসেবে উল্লেখ করেছে দলটি। নির্বাচনি রোডমাপ নিয়ে দলের যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, নির্বাচন তো আমরাও চাই। কিন্তু গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতা উপলব্ধি করতে হবে। আজকের বাংলাদেশ একটি রক্তস্নাত বিশেষ পরিস্থিতিতে বিরাজ করছে। গত চব্বিশের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতা রক্ত ও জীবন উৎসর্গ করেছে ৫৪ বছরের জঞ্জাল দূর করার জন্য। দেশকে স্বৈরতন্ত্র থেকে চিরস্থায়ী মুক্তির জন্য। সে বিষয়ে কোনো রোডম্যাপ না দিয়ে পুরোনো বন্দোবস্তের নির্বাচনি রোডম্যাপ জুলাইকে অস্বীকার করার নামান্তর।
ইসির নির্বাচনি রোডম্যাপ ঘোষণার মধ্য দিয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হয়েছে। এ রোডম্যাপ একটি সুষ্ঠু নির্বাচনকে ভণ্ডুল করার জন্য নীলনকশা বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের। দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার, পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন ও নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতের দাবির বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে ঘোষণা আসতে হবে। এসব দাবি আদায় না হলে আমরা পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মসূচি নির্ধারণ করব। এ ছাড়া জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দিতে হবে। প্রয়োজনে গণভোটের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
Manual2 Ad Code
অবশ্য ইসির রোডম্যাপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি। দলটির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এক বিবৃতিতে বলেন, তারা আশা করেছিলেন নির্বাচনি রোডম্যাপ ঘোষণার আগে ইসি রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে মতবিনিময় করবে। সরকার ও ইসি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থান প্রকাশ করলেও জনমনে নির্বাচন নিয়ে একটা সংশয় লক্ষ করা যাচ্ছে; এর প্রধান কারণ জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপারে আস্থাশীল পরিবেশ সৃষ্টি করতে না পারলে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা কঠিন হতে পারে।
Manual7 Ad Code
যদিও বিএনপির শরিক দলগুলো দলটির বক্তব্যের সঙ্গে একমত। রোডম্যাপ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন জোট ও দল। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, আমরা নির্বাচনি রোড়ম্যাপকে স্বাগত জানিয়েছি। রোড়ম্যাপের কার্যকর বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই নির্বাচন কমিশন ও সরকারকে আগামী ফেব্রুয়ারির অবাধ জাতীয় নির্বাচনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলসমূহ ও জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। কেবল কথায় বা ঘোষণায় নয়, বাস্তব কাজের মধ্য দিয়ে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে তাদের দৃঢ় সদিচ্ছার প্রমাণ রাখতে হবে। তা হলে বিভিন্ন মহলের নির্বাচনকেন্দ্রিক কৌশলগত রাজনৈতিক বিরোধিতাও কমে আসবে। জামায়াত পিআর পদ্ধতিসহ ভিন্ন কথা বলে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ।
Manual4 Ad Code
তিনি বলেন, এভাবে বিভ্রান্তি তৈরি করে কোনো লাভ নেই। নির্বাচনি রোডম্যাপের পক্ষে ৯০ শতাংশ মানুষ মাঠে নেমে যাবে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য মো. আবদুল আলীম বলেন, এ রোডম্যাপ জনমন ও রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফেরাবে। রোডম্যাপ ঘোষণা নির্বাচনি প্রক্রিয়ার একটি আনুষ্ঠানিক সূচনা হলেও এটি অনিষ্পন্ন মূল প্রশ্নগুলোর সমাধান করে না বলে অভিমত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মো. সাহাবুল হকের। তিনি বলেন, নির্বাচনের তারিখ এখনও চূড়ান্ত হয়নি, যা একটি মৌলিক অনিশ্চয়তা। সবচেয়ে বড় দ্বিধা নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে। তিনি বলেন, যদি নির্বাচনের প্রতি আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়, তবে দেশ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার দিকে যাবে এবং অর্থনীতি ও উন্নয়নের গতি বাধাগ্রস্ত হবে। তাই সব রাজনৈতিক শক্তির উচিত নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং জনগণের ভোটাধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। এ মুহূর্তে জাতীয় ঐক্য এবং গণতন্ত্রের স্বচ্ছ চর্চাই দেশের ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন।