আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী তৎপরতা শুরু না হলেও দলের অভ্যন্তরে চলছে নিবিড় প্রস্তুতি, যার কেন্দ্রে রয়েছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। লন্ডন থেকে তিনি সরাসরি তত্ত্বাবধান করছেন সম্ভাব্য প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রক্রিয়া।
Manual2 Ad Code
তারেক রহমানের একটি ফোনকলই নির্ধারণ করছে কারা হচ্ছেন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী। এই ফোনকলের মাধ্যমেই স্পষ্ট হচ্ছে কে পাচ্ছেন ‘গ্রিন সিগন্যাল’ আর কে বাদ পড়ছেন নির্বাচনী দৌড় থেকে। দলের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি বর্তমানে মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রতিটি আসনে প্রার্থীর জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা খতিয়ে দেখছেন। শুধু পর্যবেক্ষণ নয়, তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রতিটি আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছেন। এখন তিনি চূড়ান্ত প্রার্থীদের ফোন করে নির্বাচনী প্রচারণায় পূর্ণোদ্যমে নামার নির্দেশনা দিচ্ছেন, যা তাদের মনোনয়ন নিশ্চিত করছে।
Manual6 Ad Code
বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আগের মতো এবার শুধু সিনিয়রিটি বা কেন্দ্রীয় সম্পর্ক নয়, মাঠের বাস্তবতা ও জনগণের পছন্দই সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। তারেক রহমানের কাছে এখন প্রতিটি আসনের বিস্তারিত রিপোর্ট রয়েছে। যাদের সম্পর্কে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া এসেছে এবং যারা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য বলে প্রমাণিত হয়েছেন, তারাই এই কাঙ্ক্ষিত ফোনকল পাচ্ছেন।’
প্রার্থী চূড়ান্ত করার প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এই মাসের মধ্যেই দলের পক্ষ থেকে দুই শতাধিক আসনে একক প্রার্থীকে গ্রিন সিগন্যাল দেওয়া হবে। আমরা প্রক্রিয়ার একদম শেষ পর্যায়ে আছি। শিগগিরই সবাইকে জানানো হবে।’
ইতোমধ্যে রাজধানী ঢাকার বেশ কয়েকটি আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা তারেক রহমানের ফোন পেয়েছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। তাদের কেউ কেউ প্রচারণার প্রস্তুতিও শুরু করেছেন। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে তরুণ, পেশাজীবী এবং রাজনৈতিকভাবে পরিচিত মুখদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এটি দলের নতুন প্রজন্মকে সামনে আনার একটি কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-৩ আসনে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ঢাকা-৪ আসনে তানভীর আহমেদ রবিন, ঢাকা-৬ আসনে ইশরাক হোসেন, ঢাকা-৮ আসনে মির্জা আব্বাস, ঢাকা-১০ আসনে ব্যারিস্টার নাছির উদ্দিন আহমেদ অসীম, ঢাকা-১২ আসনে হাবিব উন খান নবী সোহেল, ঢাকা-১৩ আসনে ববি হাজ্জাজ, ঢাকা-১৫ আসনে মামুন হাসান এবং ঢাকা-১৬ আসনে আমিনুল হক মনোনয়নের জন্য গ্রিন সিগন্যাল পেয়েছেন।
Manual2 Ad Code
এবার ঢাকা থেকে সবচেয়ে আলোচিত নাম ‘মায়ের ডাক’ আন্দোলনের সমন্বয়কারী সানজিদা ইসলাম তুলি। তিনি ইতোমধ্যে ঢাকা-১৪ আসনে নির্বাচনের গ্রিন সিগন্যাল হিসেবে তারেক রহমানের ফোনকল পেয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম হওয়া বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন তুলিকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন।
এছাড়া ঢাকা-১৭ আসনটি বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)-এর সভাপতি ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থকে ছাড় দেওয়া হয়েছে বলে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।
শুধু ঢাকায় নয়, সারাদেশেই ধীরে ধীরে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রস্তুত হচ্ছে। বিএনপির হাইকমান্ডের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, অন্তত ৬০টি আসনে দল ইতোমধ্যেই নির্ভার, অর্থাৎ যেখানে প্রার্থী নিয়ে কোনো মতভেদ বা অনিশ্চয়তা নেই। এসব আসনে দলের শীর্ষস্থানীয় ও পরীক্ষিত নেতাদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
এই তালিকায় আছেন দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। তারা হলেন- ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন (কুমিল্লা-১), মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (ঠাকুরগাঁও-১), ড. আব্দুল মঈন খান (নরসিংদী-২), ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু (সিরাজগঞ্জ-২), সালাহউদ্দিন আহমদ (কক্সবাজার-১), মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ (ভোলা-৩), বরকতউল্লাহ বুলু (নোয়াখালী-৩), মো. শাহজাহান (নোয়াখালী-৪), শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি (লক্ষ্মীপুর-৩), মিয়া নুরুউদ্দিন অপু (শরীয়তপুর-৩), আসাদুল হাবিব দুলু (লালমনিরহাট-৩), অনিন্দ্য ইসলাম অমিত (যশোর-৩), রশিদুজ্জামান মিল্লাত (জামালপুর-১), ব্যারিস্টার কায়সার কামাল (নেত্রকোনা-১), মাহমুদ হাসান খান (চুয়াডাঙ্গা-২), ফজলুল হক মিলন (গাজীপুর-৫), আমিরুল ইসলাম খান আলীম (সিরাজগঞ্জ-৫), লুৎফুজ্জামান বাবর (নেত্রকোনা-৪), ব্যারিস্টার মুহম্মদ নওশাদ জমির (পঞ্চগড়-১), সাইফুল ইসলাম ফিরোজ (ঝিনাইদহ-৪)।
Manual4 Ad Code
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, যারা এলাকায় সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য এবং জনপ্রিয় প্রার্থী হিসেবে পরিচিত, তারাই এবার বিএনপির মনোনয়ন পাবেন। একই আসনে অনেক প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাশা করতে পারেন, সেগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিজে খোঁজ-খবর নিয়েছেন এলাকার মানুষের কাছে কার গ্রহণযোগ্যতা এবং জনপ্রিয়তা বেশি।
এদিকে তারেক রহমানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই মনোনয়ন প্রক্রিয়া একদিকে যেমন দলের ভেতরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করছে, তেমনই অন্যদিকে প্রার্থীর গুণগত মান উন্নত করতে এবং তরুণ ও যোগ্য নেতৃত্বকে সামনে আনতে সহায়ক হচ্ছে বলে মনে করেন বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ।