প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

৬ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২২শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৩শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

ব্যয়বহুল মেট্রোরেলে নিরাপত্তাঝুঁকি

editor
প্রকাশিত অক্টোবর ২৮, ২০২৫, ০৭:০০ অপরাহ্ণ
ব্যয়বহুল মেট্রোরেলে নিরাপত্তাঝুঁকি

Manual6 Ad Code

প্রজন্ম ডেস্ক:

ঢাকায় দেশের প্রথম ও ব্যয়বহুল মেট্রোরেল প্রকল্পে নিরাপত্তাঝুঁকি দেখা দিয়েছে। রোববার (২৬ অক্টোবর) ফার্মগেটে মেট্রোরেলের পিলার থেকে একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে পথচারী নিহত হওয়ার পর ব্যাপক সমালোচনা চলছে ব্যয়বহুল এই প্রকল্প নিয়ে।

Manual1 Ad Code

মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) সূত্র জানায়, বাংলাদেশের প্রথম মেট্রোরেল প্রকল্প এমআরটি লাইন-৬ অনুমোদন পায় ২০১২ সালে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। পরে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত (১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার) মেট্রোরেল লাইন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয় সরকার। তখন পুরো প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। অর্থাৎ স্টেশনসহ সব খরচ মিলিয়ে প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে খরচ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা, যা আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় কয়েকগুণ বেশি।

 

মেট্রোরেল প্রকল্পের জন্য জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) কাছ থেকে ১৯ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। বাকি টাকা দেয় বাংলাদেশ সরকার।

বর্তমানে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ দশমিক ১০ কিলোমিটার পথে মেট্রোরেল চলাচল করছে। মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার পথে মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ চলছে। এখন মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণের কাজ চলছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই অংশের পূর্ত কাজের অগ্রগতি ৬৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে এই অংশের পূর্ত কাজ শেষ হবে বলে আশা করছে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ।

 

Manual8 Ad Code

 

ব্যয়বহুল গণপরিবহন মেট্রোরেলের নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতো ব্যয়বহুল প্রকল্পে নিরাপত্তাঝুঁকি অস্বাভাবিক। এসব দুর্ঘটনা মেট্রোরেলে নিরাপদ যাত্রা বা নিচে পথচারী চলাচলে মানুষের নেতিবাচক ধারণা জন্মাবে। তাই মেট্রোরেলের নকশায় কোনো ত্রুটি বা বিয়ারিং প্যাডের গুণগত মান ঠিক আছে কি না, তা তদন্ত করে বের করা জরুরি। আর যদি কোনো ত্রুটি পাওয়া যায়, সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যলয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সাবেক পরিচালক ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সামছুল হক বলেন, মেট্রোরেল নির্মাণে যে ত্রুটি তার দায় সরাসরি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানসহ সবাইকে নিতে হবে। এর আগে যিনি মেট্রোরেলের এমডি ছিলেন, উনি না বুঝেই কাজগুলো করেছেন। কারণ উনি নন-টেকনিক্যাল পারসন। এই নন-টেকনিক্যাল লোকটা পুরোপুরি কনসালট্যান্টের ওপর ট্রাস্ট করেছিলেন। ফলে জাইকা নির্মাণের জন্য টাকা নিয়েছে বেশি এবং পরামর্শকের জায়গায় অতি মূল্যায়িত হয়েছে। তারা যখন দেখেছে এখানে বুঝে নেওয়ার মতো প্রতিযোগিতামূলক মেধাবী লোক নেই, তখন তারা তাদের মতো করে করে গেছে। এখন বুঝতেই পারছেন, একটা জিনিস পড়ে মানুষ মারা গেলে নিরাপত্তাঝুঁকি কতটা বেড়ে যায়।

 

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সামছুল হক বলেন, মেট্রোরেল ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়ই চালু করা হয়। কিন্তু কী ধরনের নিরাপত্তা থাকবে সে সবকিছু হয়তো আমাদের প্ল্যান এবং ডিজাইনে আছে। আমি এটিই বলছি যে, মেট্রো যে একটা আশা জাগানিয়া প্রজেক্ট হয়েছে, এখন মেট্রো সম্পর্কে যদি অনিরাপদ পারসেপশন চলে আসে তাহলে খারাপ একটা উদাহরণ তৈরি হবে।

 

২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশে প্রথম মেট্রোরেল চালু হয়। শুরুতে চলাচল করতো উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত। পর্যায়ক্রমে স্টেশনের সংখ্যা বাড়ে। মতিঝিল পর্যন্ত সব স্টেশনে যাত্রী ওঠানামা শুরু হয় ২০২৩ সালের শেষ দিনে। এখন কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল সম্প্রসারণের কাজ চলছে।

 

২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ফার্মগেটে মেট্রোরেলের ৪৩০ নম্বর পিলার থেকে বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়েছিল। ওই ঘটনায় কেউ হতাহত হননি। তবে ওই দিন ট্রেন চলাচল ১১ ঘণ্টা বন্ধ ছিল। রোববার (২৬ অক্টোবর) ৪৩৩ নম্বর পিলার থেকে বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়েছে, যা ফার্মগেট স্টেশনের ঠিক পশ্চিম পাশে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ৪৩৩ নম্বর পিলার থেকে বিয়ারিং প্যাডটা ঠিক ফুটপাতের ওপর আবুল কালাম (৩৫) নামে এক পথচারীর মাথার ওপর পড়ে। এতে ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু হয়। আবুল কালামের গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায়।

ঘটনার পরপর মতিঝিল থেকে উত্তরা মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিকেল ৩টায় উত্তরা থেকে আগারগাঁও এবং সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে মতিঝিল থেকে শাহবাগ পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল শুরু হয়। কিন্তু পুরো পথে কখন নাগাদ মেট্রোরেল চলাচল শুরু হবে তা জানাতে পারেনি ডিএমটিসিএল।

 

ওই ঘটনার পর ফার্মগেট এলাকা সরেজমিনে পরির্দশন করেন ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফারুক আহমেদ। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ফারুক আহমেদ বলেন, মেট্রোরেল পিলার থেকে কেন বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়লো, তা তদন্ত করা হবে।

কিন্তু আগেরবার একই ঘটনা ঘটার পর কেন ফের বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়লো, তার সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। শুধু বলেছেন, সবকিছুই তদন্ত করে বের করা হবে। যদিও এ ঘটনার তদন্তে সেতু সচিবের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি মেট্রোরেল নকশায় নির্মাণত্রুটি আছে কি না, সেটা খুঁজে বের করবে বলে জানা গেছে।

 

মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড কি

ডিএমটিসিএল সূত্র জানায়, মেট্রোরেলের ‘বিয়ারিং প্যাড’ হচ্ছে রাবার ও ইস্পাতের মিশ্রণে তৈরি আয়তাকার একধরনের নরম প্যাড। মেট্রোরেলের প্রতিটি পিলারের ওপর এমন চারটি প্যাড বসানো হয়। একেকটি প্যাড ওজনে ১২০ থেকে ১৫০ কেজি। এমন প্যাডের ওপর বসানো হয় মেট্রোরেলের ভায়াডাক্ট বা উড়ালপথ। এ ভায়াডাক্ট কংক্রিটের তৈরি, যা ৩০ থেকে ৪০ মিটার লম্বা একেকটি স্প্যান জোড়া দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। যেহেতু ভায়াডাক্ট ও পিয়ার দুটিই কংক্রিটের তৈরি, তাই দুটি কংক্রিটের বস্তুর একটির ওপর আরেকটি স্থাপন করলে মেট্রোরেল চলার সময় ঘর্ষণজনিত সমস্যা হতে পারে। হতে পারে ক্ষয়, ঘটতে পারে স্থানচ্যুতিও। এ জন্যই ভায়াডাক্ট ও পিলারের মাঝখানে রাবার ও স্টিলের তৈরি বিয়ারিং প্যাড দেওয়া হয়, যা স্থাপনাটির সুরক্ষায় কাজ করে।

 

যদিও পিলার ও ভায়াডাক্টের সংযোগস্থলে বিয়ারিং প্যাডগুলো বসানোর জন্য বেজ বা ভিত্তি রয়েছে। এটি নাট-বল্টু কিংবা অন্য কিছু দিয়ে আটকানো থাকে না; বরং পিলার ও ভায়াডাক্টের মতো ভারী বস্তুর চাপে এটি টিকে থাকে। একেকটি স্প্যানের ওজন কয়েকশ টন হবে।

Manual6 Ad Code

এতো ওজনের পরও কেন বিয়ারিং প্যাড নিচে পড়ে গেলো, তা সবার কাছেই বড় প্রশ্ন। কারণ, এ ধরনের ঘটনা মেট্রোরেলের ইতিহাসে অনেকটা বিরল বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এর পেছনে নকশাগত ত্রুটি থাকতে পারে বলে মনে করেন তারা। যদিও মেট্রোরেলের লাইনসহ যাবতীয় নকশা প্রণয়নের দায়িত্বে ছিল জাপানের কয়েকটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জোট এনকেডিএম অ্যাসোসিয়েশন।

এ বিষয়ে বুয়েটের অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, পিলারে বিয়ারিং প্যাড বসানো হয়েছে মেট্রোর নিরাপদ চলাচল ও স্থাপনার স্থায়িত্ব ধরে রাখতে। কিন্তু এই ব্যবস্থা নিচে পড়ে মানুষ মারা গেলে তো বলতে হবে এর নকশাগত ত্রুটি থাকতে পারে। এখন যেভাবে দুর্ঘটনা ঘটেছে এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, এর নির্মাণে কোয়ালিটি কন্ট্রোলের ল্যাপস এবং গ্যাপস ছিল।

তিনি বলেন, মেট্রোরেল প্রকল্পে জাপানিদের রাখা হয়েছিল, কারণ তাদের অভিজ্ঞতা বেশি। কিন্তু তারা দায়িত্ব ঠিকঠাকভাবে পালন না করে অর্থছাড় দিয়ে দিয়েছে। ঘটনা তো একটি নয়, পরপর দুটি দুর্ঘটনা ঘটলো। এখন শঙ্কা জাগে অন্যান্য জায়গায়ও এরকম দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ জন্য অতিসত্বর একটা রেসকিউ অডিট করা উচিত। আর কনসালট্যান্টকে দায়বদ্ধ করতে হবে।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএমটিসিএলের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, মেট্রোরেলের ফার্মগেট ও বিজয় সরণি স্টেশনের মাঝে বড় একটা বাঁক রয়েছে। এ বাঁকেই দুবার বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়েছে। আবার বিজয় সরণি স্টেশন (দ্বিতীয় তলা) থেকে ফার্মগেট স্টেশন (তৃতীয় তলা) অনেকটা উঁচুও। অর্থাৎ বিজয় সরণি থেকে রেলপথটি ফার্মগেটে আসতে আসতে উঁচুতে উঠে গেছে। এ কারণে এখানে নির্মাণ ত্রুটি থাকতে পারে। এ ত্রুটি চিহ্নিত করা জরুরি। অন্যথায় আবার দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

 

২০১৯ সালে মেট্রোরেল প্রকল্পে নিম্নমানের বিয়ারিং প্যাড সরবরাহের একটি ঘটনা ঘটেছিল।ডিএমটিসিএল সূত্র জানায়, ওই ঘটনাটি ঘটে উত্তরা-আগারগাঁও অংশের প্যাকেজ ৩ ও ৪-এর নির্মাণকাজে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজটি বাস্তবায়ন করেছিল ইতালিয়ান-থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি (ইতাল-থাই)।

উত্তরা-আগারগাঁও অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ কিলোমিটার। ২০১৯ সালে পিয়ার-ভায়াডাক্টের সংযোগস্থলে বিয়ারিং প্যাড বসিয়ে প্রায় আট কিলোমিটার উড়ালপথ বসানো হয়ে গিয়েছিল। ইতাল-থাইয়ের আনা বিয়ারিং প্যাডগুলো বাকি অংশে ব্যবহৃত হওয়ার কথা ছিল। তখন মেট্রোরেলে ব্যবহারের আগে বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগে এসব বিয়ারিং প্যাডের কারিগরি মান পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, একাধিক বিয়ারিং প্যাডের মান যথাযথ নয়। তখন সেগুলো আর ব্যবহার করতে দেওয়া হয়নি।

 

তদন্ত কমিটি গঠন

মেট্রোরেলের পিলার থেকে বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ার কারণ অনুসন্ধানে একটি কমিটি গঠন করেছে সরকার। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওই যুবকের লাশ দেখতে গিয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান। তিনি বলেন, মেট্রোরেলে নির্মাণত্রুটির কারণে এ ঘটনা ঘটেছে কি না, সেটা খুঁজে বের করতে সেতু বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

পাঁচ সদস্যের এ কমিটিতে বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একজন অধ্যাপক, এমআইএসটির মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একজন অধ্যাপক, সড়ক বিভাগের একজন প্রকৌশলী ও মেট্রোরেল প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক রয়েছেন। এ কমিটি আগের ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনও পর্যালোচনা করবে জানিয়ে উপদেষ্টা ফাওজুল কবির বলেন, কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Manual8 Ad Code

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code