প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

৬ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২২শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৩শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের মুখে

editor
প্রকাশিত অক্টোবর ৩০, ২০২৫, ০৪:৪৪ অপরাহ্ণ
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের মুখে

Manual4 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। বলা হচ্ছে, এই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে গণভোট ইস্যুতে। বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ কেন জুলাই আদেশে স্থান পায়নি, সেই আলোচনাও সামনে এসেছে। ঘোষিত সনদ আদেশে লাভবান হয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি- রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন আলোচনাও উঠেছে। পক্ষান্তরে বিএনপি কিছুটা কোণঠাসা হয়ে হয়ে পড়েছে। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ তুলেছেন, বিএনপির সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। এসব কারণে বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের মুথে পড়তে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আদেশ ঘোষিত হওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যের সুর দেখে মনে হচ্ছে, নির্বাচনের পথে বড় ধরনের ঝামেলা বা বাধার সৃষ্টি হচ্ছে। দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ থাকা উচিত।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. শাহদীন মালিক মনে করেন, বর্তমান সংবিধানে গণভোটের কোনো আইন নেই।

Manual2 Ad Code

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক আলতাফ পারভেজের মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথে অন্তরায় আছে। গণভোটে না জিতলে কী হবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. জাহেদ উর রহমান মনে করেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে।

বাস্তবায়ন আদেশ

গত মঙ্গলবার জাতীয় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়ার পর পরই এ প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সুধী সমাজের মধ্যে নানা বিতর্ক দৃশ্যমান হয়। অনেকেই জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে জটিলতার আশঙ্কা করেন। কোনো কোনো গণমাধ্যমের আলোচনায় এই উদ্যোগকে ‘অটোপাস’ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই সনদ আগামী সংসদে ২৭০ দিনের মধ্যে অনুমোদন না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়ে আইনি জটিলতা রয়েছে। কারণ সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই।

যেকোনো বিল সংসদে পাসের পর স্পিকার তাতে সই করে অনুমোদনের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর বিধান রয়েছে। রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর করলেই সেটি আইনে পরিণত হয়। সেই আইন গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। কিন্তু স্বয়ংক্রিয়ভাবে হলে সাংবিধানিকভাবে স্পিকার ও রাষ্ট্রপতিকে অবজ্ঞা করা হয় বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। পাশাপাশি আদেশে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে এটিকে সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। সংসদ যেকোনো আইন প্রণয়ন ও বাতিল করার ক্ষমতা রাখে।

সংবিধান সংস্কারের পক্ষের মতামতের লোকজন বলছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের আলোচনা টেবিলে না থাকলেও এটি এনসিপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি ছিল। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঐকমত্য কমিশন একটা সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। তবে নোট অব ডিসেন্ট তারা কেন বিবেচনায় নেয়নি, সেই প্রশ্ন রয়েই গেছে। মূলত পরবর্তী সংসদ যাতে জুলাই সনদ আদেশ বাস্তবায়নের জন্য তৎপর থাকে, তার বাধ্যবাধকতার জন্য করা হচ্ছে। পরবর্তী সরকার যদি ইচ্ছা করে বা করতে না চায়, তাহলে তারা যেন সময় নিতে নিতে দীর্ঘ পরিক্রমার মধ্যে পুশ করতে না পারে। এটা মূলত পরবর্তী সরকারকে দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য করা হচ্ছে। পরবর্তী সরকারকেও একটা হুমকি দিয়ে রাখা।

তবে নির্বাচিত সরকারকে এটি মানতে বাধ্য করা যাবে কি না, সেই প্রশ্ন নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে দ্বিমত স্পষ্ট রয়েছে। গণভোটে জুলাই সনদ পাস হওয়ার পরও রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে মামলা করলে বিষয়টি ঝুলে যেতে পারে বলেও আলোচনা আছে।

জুলাই আদেশ ঘোষণার পর দেখা যাচ্ছে, ৪৮টি আদেশের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়নি। অনেকের আপত্তি থাকলেও সেই আপত্তি এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি। নোট অব ডিসেন্টের বিষয়টি অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি বিএনপিকে জানানো হয়নি- এমন অভিযোগ উঠছে।

পাশাপাশি গণভোটের দিনক্ষণ নিয়েও জটিলতা বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোট চাইছে বিএনপি। অন্যদিকে জামায়াত আগামী নভেম্বরে এই গণভোট অনুষ্ঠানের দাবিতে অনড় রয়েছে। এ নিয়ে নির্বাচনের আগে বিবাদ আরও বাড়তে পারে। অনেকের মতে, গণভোটের দিনক্ষণের বিষয়ে ঐকমত্য কমিশন সিদ্ধান্ত না দিয়ে বল সরকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে। সরকার যেকোনো একটা বেছে নিলে একটা দল সন্তুষ্ট, আরেকটি দল অসন্তুষ্ট হবে। এতে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়বে।

জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আলাদাভাবে করলে টাকা বেশি খরচ হবে- এমন আলোচনাও আছে। নির্বাচন কমিশন বলেছে, গণভোট করতে ২ হাজার কোটি টাকা লাগবে। তবে কেউ কেউ বলছেন, গণভোট আলাদা করলে সুবিধা হলো- সংবিধানের সংস্কার প্রস্তাবগুলো সমাধান আগে করে পরে জাতীয় নির্বাচনে যাওয়া যায়। তাদের মতে, প্রতিটি দিকের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই দিকই রয়েছে।

সংসদ নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে গেলেও গণভোটে অংশ নিতে কতটা যাবে, সেটি নিশ্চিত নয়। ফলে গণভোটে কতটা সাড়া পাওয়া যাবে, এ নিয়ে সংশয় রয়েছে।

ইংরেজি ‘রেফারেন্ডাম’-এর বাংলা প্রতিশব্দ ‘গণভোট’। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে জনগণ সরাসরি ভোট দেওয়ার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে তাদের মতামত দিয়ে থাকে। এটি মূলত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনমত যাচাইয়ের জন্য গণভোটকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ধরা হয়। সংবিধান সংশোধন, আইন তৈরি, রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করা, এমনকি শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রেও গণভোটের আয়োজন করা হয়। ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে গণভোট নেওয়া হয়।

স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে দেশে মোট তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি প্রশাসনিক গণভোট এবং আরেকটি সাংবিধানিক গণভোট। প্রথম গণভোট হয়েছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৭ সালের ৩০ নভেম্বর। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে বৈধতা দিতে অনুষ্ঠিত ওই গণভোটে ৮৮ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে ‘না’ ভোট পড়েছিল ১ দশমিক ১ শতাংশ।

Manual7 Ad Code

১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ দেশে দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সময়ে। তার নীতি ও কর্মসূচি এবং স্থগিত সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের ওপর জনগণের আস্থা আছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য ওই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এই গণভোটে ভোট পড়েছিল ৭২ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট ছিল ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ‘না’ ভোট ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।

১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তৃতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ‘তিন জোটের রূপরেখা’ অনুযায়ী জাতীয় সংসদে গৃহীত সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠার পর সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীতে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে থাকা প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ সম্মতি দেবেন কি না, সে প্রশ্নে দেশব্যাপী গণভোট আয়োজনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ওই গণভোট পড়ে ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে ১ কোটি ৮৩ লাখ ৮ হাজার ৩৭৭ জন ভোটার সংসদীয় গণতন্ত্রের পক্ষে, অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন। এই হার ৮৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে ৩৩ লাখ ৯০ হাজার ৬২ জন ভোটার ‘না’ ভোট দেন। অর্থাৎ তারা রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থার পক্ষে মত দেন। ‘না’ ভোটের হার ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিলে সেটি গণভোটের মাধ্যমে পাস করার সিদ্ধান্ত হয়। তবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠকে জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংস্কারের বৈধতা দিতে গণভোট আয়োজন নিয়ে বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি।

মঙ্গলবার ঘোষিত জুলাই সনদের আদেশের ৬ নম্বরে বলা হয়েছে, ‌‘এই আদেশ জারির অব্যবহিত পর অনুষ্ঠিব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে যথোপযুক্ত সময়ে অথবা উক্ত নির্বাচনের দিনে এই আদেশ অনুসারে গণভোট অনুষ্ঠান করা হইবে।’

গণভোট বিষয়ে জুলাই সনদের আদেশেও একধরনের জটিলতা রয়েছে বলে আলোচনা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ‌৪৮ দফা সুপারিশের বিষয়ে একজন সাধারণ নাগরিকের ধারণা থাকা খুবই কঠিন। দেশের প্রকৃত সাক্ষরতার হার ৫০ শতাংশের নিচে এবং ২২ শতাংশ মানুষ এখনো নিরক্ষর। অনেকের মতে, সচেতন ও শিক্ষিত নাগরিকদের অনেকেরই ৪৮ দফাসহ জুলাই সনদ সম্পূর্ণভাবে বুঝতে কষ্ট হচ্ছে। সেখানে গ্রামে-গঞ্জের একজন নাগরিক এই ৪৮ দফা প্রশ্নে কীভাবে ‘হ্যাঁ-না’ ভোট দেবেন। তা ছাড়া একজন ভোটার ২৪টি সুপারিশের বিষয়ে রাজি হলেও সব কটির বিষয়ে রাজি নাও হতে পারেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তার কোনো অপশন নেই। ফলে এ ক্ষেত্রে জটিলতা থাকছেই। অনেকের মতে, এই গণভোটের মধ্য দিয়ে জনগণকে ৪৮ দফা সুপারিশ মানতে বাধ্য করা হচ্ছে। ৪৮ দফার মধ্যে নোট অব ডিসেন্টের বিষয়ে উল্লেখ নেই। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো নোট অব ডিসেন্ট ছাড়াই রাজি হয়েছে কি না, সেটি স্পষ্ট না। বরং এটি না থাকায় বিএনপি চরম প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।

গণভোটে ৮০ শতাংশ মানুষ জুলাই সনদকে গ্রহণ করার পর ৪০ শতাংশ ভোট পেয়ে কোনো দল সরকার গঠন করলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে- সেই প্রশ্নও তুলছেন অনেক বিশ্লেষক। তাদের মতে, সে ক্ষেত্রে পরবর্তী সরকার ৮০ শতাংশ মানুষের ইচ্ছাকে অগ্রহণযোগ্য করতে পারবে না। আবার কোনো দল যদি সংসদের নিম্নকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং উচ্চকক্ষে যদি তাদের ৫০ শতাংশ থাকে, তাহলে তারা আবারও সংবিধান সংশোধন করতে পারবে। গণভোটকে জনগণের সার্বভৌমত্ব মনে করা হলেও এটি কারও ওপর চাপিয়ে দেওয়া সমীচীন নয় বলেও কেউ কেউ মনে করেন।

কোনো দলের গণভোট না মানার ঘটনাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করেন। তাদের মতে, প্রথমত তারা জনগণকে গণভোটে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকতে বলবে। জনগণ যদি তাদের কথা শোনেন, তাহলে জুলাই সনদে ভোট কম পড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, কোনো দল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করলে তারা আবারও সংবিধান পরিবর্তন করে দিতে পারবে। তাদের সামনে সেই সুযোগ আছে।

ড. মাহবুব উল্লাহ

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, সনদ ঘোষণার পর বিএনপির বিবৃতিতে ‘প্রতারণা বা গোল দেওয়া’র যে ভাষা বা অভিযোগ করার পর বড় ধরনের জাতীয় সমঝোতা হবে সেটি মনে করতে পারছি না। জুলাই অভ্যুত্থানের পর যে জাতীয় সমঝোতা প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল- সেটির তিলে তিলে মৃত্যু ঘটছে। অনৈক্যের বক্তব্য দেখা যাচ্ছে। অথচ এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল ঐক্য। কারণ ওপর থেকে ফ্যাসিবাদী হাসিনা ফেরার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠছেন। তারা যেকোনো সময় যেকোনো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেন। এই পরিস্থিতি দলগুলো উপলব্ধি করতে না পারলে দেশের জন্য বিপদ আছে।

৪৮ দফার বিষয়টি একজন নাগরিক না বুঝে কী করে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেবেন এবং সেটি সম্ভব কি না, জানতে চাইলে মাহবুব উল্লাহ বলেন, এটা তখনই সম্ভব যখন জনগণ এই আদেশের বিষয়ে আস্থাশীল থাকবেন। ম-এর পেছনে ক আছে না অ আছে দেখলাম না। মনে করবেন যে রাজনৈতিক দলগুলোর এ বিষয়ে একমত হয়ে এটি তৈরি করেছে। এর মধ্যে ড. ইউনূসের সরকার জড়িত। তারা সৎমানুষ। তাদের উদ্দেশ্য সৎ। তাহলে তারা সম্মতি দিতে পারেন। এর পেছনে কী অ আছে না আছে তখন তারা দেখলেন না। তবে এক দফা করে ৪৮ দফা বোঝা সত্যিই কঠিন। এটা অনেক লেখাপড়া জানা লোকের পক্ষেও সম্ভব নয়।

মতামতটা আসবে যারা এটা করছেন তাদের ওপরে আস্থা অর্থাৎ তাদের কাজের ওপর আস্থা থাকলে। তবে সেগুলোর জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য থাকলেই কেবল সম্ভব।

সংসদে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইন পাসের নজির আরও রয়েছে। যেমন: সংসদ কোনো বিল রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য দুবার পাঠানোর পরেও তিনি সম্মতি না দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাস হয়ে যায়। যারা ক্ষমতায় যাবেন তারা আন্তরিক হলে ৯ মাস কেন- ৯০ দিনেই পাস করা সম্ভব।

ড. শাহদীন মালিক

Manual7 Ad Code

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, গণভোটের সম্পর্কে কারও কোনো ধারণা নেই। সাধারণত সরাসরি গণভোট হয় না। আমাদের গণভোটের কোনো আইন নেই। সাধারণত গণভোট হয়, আগে পার্লামেন্টে একটা জিনিস পাস করে তারপর জনগণের কাছে যায়। জনগণের তার পক্ষে আছে কি না মতামত নেওয়া হয়।

তিনি বলেন, দ্বিতীয়ত, এখানে ৪৮টি বিষয় রয়েছে। এখানে আমি ৪৭টি একমত, একটিতে দ্বিমত। তাহলে কী উত্তর দেব? আর এই পুরো সিস্টেমেই সংবিধান পরিপন্থি। এই ধারাগুলো সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাহলে আমাদের বর্তমান সংবিধানকে বাতিল ঘোষণা করতে হবে। যদি সংসদে অটোমেটিক পাস হয়ে যায় তাহলে এত দিনের আলোচনা করে লাভটা কী? এতে দেশে কিন্তু এই নিয়ে অস্থিতিশীলতা বাড়বে।

 

আলতাফ পারভেজ

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথে অন্তরায় আছে উল্লেখ করে লেখক ও বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, প্রথমত গণভোটেই তো একটা সমস্যা হবে। একজন ভোটারের সামনে ৪৮টি বিষয় তুলে ধরলাম। ৪৮টি বিষয় কিন্তু ৪৮ ধরনের। কিন্তু এখানে উত্তর শুধু একটাই- ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’। ৪৮টির মধ্যে ২০টি কারও খুব পছন্দ, ২৮টি অপছন্দ হলে তিনি কীভাবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলবেন? এখানে আমরা বিকল্প কোনো চয়েজ দিলাম না এটা কী ধরনের ভোট? এটা তো অভিনব, পৃথিবীতে এভাবে কোনো ভোট হয় বলে আমার জানা নেই।

তিনি বলেন, প্রথমত গণভোট পৃথিবীর অন্য দেশে কোনো একটা সিম্পল বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ মতামত চাওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, এভাবে গণভোটে আপত্তি শুধু বিএনপির নয়, অন্যদেরও থাকতে পারে। সবার আপত্তি আপনি পাশ কাটিয়ে গেলেন। কিন্তু এই রাজনৈতিক দলগুলোর তো সমাজে একটা জনসমর্থন আছে। এরা যদি বিরোধিতা করে, এমনকি গণভোটে গেলেও বিরোধিতা করতে পারে। গণভোটের পরও বিরোধিতা করতে পারে। পরবর্তী সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ পেলে এগুলো তো আবার বদলাতেও পারে। যদি কোনো কারণে বিএনপি বলে জুলাই সনদে আমাদের মতামত আসেনি, আমরা গণভোটে নেই। তাহলে গণভোটের ওজনও তো কমে যাবে। আবার গণভোটে যদি না জিতে তখন কী হবে?

 

ডা. জাহেদ উর রহমান

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, জুলাই সনদ একেবারে বাস্তবায়ন করা যাবে না। এটা নিয়ে মারাত্মক সংকট তৈরি হবে। বিশেষ করে গণভোট নিয়ে। নোট অব ডিসেন্ট বাদ দিয়ে যদি গণভোট হয় তাহলে কী দাঁড়াবে? বিএনপির তো নোট অব ডিসেন্ট আছে, তারা গণভোট বর্জনও করতে পারে! আবার গণভোটে ‘না’ ভোটের দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে কী হবে? অন্যরা মিলে যদি ‘না’ ভোট জিতে তাহলে এত সংস্কার প্রস্তাব করে কী লাভ হলো? ‘নোট অব ডিসেন্ট’ যদি বাদ দেওয়া অর্থ কী! তাহলে ৬ কমিশন মিলে যাচাই-বাছাই করে গণভোট দিলেই হতো? এত আলোচনার কী প্রয়োজন ছিল।

Manual1 Ad Code

তিনি বলেন, এটা একটা হাস্যকর ব্যাপার। মারাত্মক বিভেদ তৈরি করবে, সংঘাতের সৃষ্টি হতে পারে। মূলত, এনসিপি যা যা চেয়েছে তা তা দিয়ে তাদের স্বাক্ষর নিশ্চিত করার জন্য সরকার এটা করেছে। বিএনপি গণভোট যেভাবে চেয়েছিল সেটা হলেও মোটামুটি একটা অবস্থানে যেত। কিন্তু এখন আমি সামনে খুবই সংঘাত দেখছি। যদি সরকার এটা বাস্তবায়ন করতে যায়, তাহলে বড় ঝামেলা আছে।

জাহেদ উর রহমান বলেন, ২৭০ দিনের মধ্যে অটোমেটিক্যালি কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়েছে। গণভোট বর্তমানে সংবিধানে নাই। পরবর্তী সময়ে পার্লামেন্ট গণভোট সংবিধানে না পাস করে তাহলে কী দাঁড়াবে? গণভোটের তো একটা সাংবিধানিক ব্যাপার আছে। সংবিধানে এই ইস্যুতে গণভোটের কথা নেই। সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code