জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সাধারণ পুলিশ সদস্যদের দাবি ছিল বর্তমান পোশাক পরিবর্তন করা। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাব ও আনসার বাহিনীর পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। নয় মাস পর সেই নতুন পোশাক পেতে যাচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা।
পুলিশের পোশাক নির্ধারণ হয়েছে লোহার (আয়রন) রঙের। র্যাবের পোশাক জলপাই (অলিভ) রঙের। আর আনসারের পোশাক সোনালি গমের (গোল্ডেন হুইট) রঙের। আপাতত মেট্রোপলিটন পুলিশ সদস্যরা পোশাক পাবেন। পর্যায়ক্রমে সারাদেশের জেলা পুলিশ সদস্যদের নতুন পোশাক দেওয়া হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, নির্বাচনের আগে সব বাহিনী যেন নতুন ইউনিফর্ম পরতে পারে সেজন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্ধারণ করা হয়েছে ইউনিফর্মের রং ও কাপড়।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে জেলা পুলিশ ও মেট্রোপলিটন পুলিশে ইউনিফর্মের রং ভিন্ন। নতুন ইউনিফর্ম হবে সবার জন্য এক রঙের। ১৫ নভেম্বর থেকে ঢাকা মেট্রোপলিটনসহ (ডিএমপি) সব মেট্রোপলিটন পুলিশ সদস্য নতুন ইউনিফর্ম পরতে পারবেন। আর জেলা পুলিশের নতুন ইউনিফর্ম পেতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।
এদিকে র্যাবের বর্তমান কালো রঙের ইউনিফর্ম পরিবর্তনের কথা থাকলেও নতুন জলপাই রঙের ইউনিফর্মের কোনো অগ্রগতি নেই।
এছাড়া বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য সোনালি গমের রঙের নতুন ইউনিফর্ম তৈরির কথা থাকলেও রং পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই কাপড়
বিশ্বজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক দুই ভাবে নির্ধারণ করা হয়। দেশ-কালের ওপর ভিত্তি করে সেবা সংস্থাগুলোর পোশাক নির্ধারণ করা হয় বেশিরভাগ সময়। যেমন শীতপ্রধান দেশগুলোর পুলিশের পোশাকের রং হয় কালো রঙের। সেখানে তাপমাত্রা ধরে রাখার একটা বিষয় পোশাকে যুক্ত থাকে। গরম বা নাতিশীতোষ্ণ দেশগুলোতে পুলিশের পোশাক সাদা, খয়েরি বা হালকা রঙের দেখা যায়, যা কি না তাপ শোষণ কম করে। ভারত বা এ অঞ্চলে বিভিন্ন সেবাসংস্থার পোশাক খাকি হওয়ার আরেকটি কারণ ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ইতিহাস।
পরিবর্তন হচ্ছে জেলা-মেট্রোপলিটন পুলিশের ইউনিফর্ম-লোগো
পুলিশের ইউনিফর্মের রং ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে। কাপড়ও নির্ধারণ হয়েছে। কাপড় পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে দেশের পরিবেশ ও সব ধরনের আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই কি না, পাশাপাশি কাপড়ের মানও যাচাই করা হয়েছে। কাপড় পরীক্ষায় আরও দেখা হয়েছে নতুন ইউনিফর্মের রং বাহিনীর জন্য উপযুক্ত কি না এবং সদস্যরা সেই পোশাক পরে আরাম অনুভব করছেন কি না। ইউনিফর্ম চূড়ান্ত হওয়ায় রঙের সঙ্গে সমন্বয় রেখে চূড়ান্ত হয়েছে ব্যাচের রং।
Manual2 Ad Code
ডিজাইন চূড়ান্ত
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, যেহেতু ইউনিফর্মের রং চূড়ান্ত হয়েছে, সেক্ষেত্রে ইউনিফর্মের ডিজাইন চূড়ান্ত হয়েছে। পুলিশের আয়রন রঙের সঙ্গে মিল রেখে ডিজাইনও চূড়ান্ত হয়েছে।
Manual5 Ad Code
বর্তমান ইউনিফর্মেও অনীহা অনেকের
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পুলিশ বাহিনী সংস্কারের দাবি ওঠে। একই সঙ্গে পুলিশের ইউনিফর্ম পরিবর্তন চান অনেকে। মাঠ পর্যায়ে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন পুলিশ সদস্য জাগো নিউজকে বলেন, ছাত্র আন্দোলনের সময় এই ইউনিফর্ম পরে পুলিশ সদস্যরা ছাত্র-জনতার বুকে গুলি চালিয়েছিল। সেই ইউনিফর্ম আমরা আর পরতে চাই না। আমরা নতুন ইউনিফর্মে নতুন উদ্যমে কাজ করতে চাই।
১৫ নভেম্বরের মধ্যে নতুন ইউনিফর্ম, এখনই পাচ্ছে না র্যাব-আনসার
Manual3 Ad Code
পুলিশের নতুন ইউনিফর্মের বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (লজিসটিক্স) খোন্দকার নজমুল হাসান বলেন, ‘নতুন ইউনিফর্ম ১৫ নভেম্বরের মধ্যে দেখা যাবে। যে রঙের ইউনিফর্ম পাস হয়েছিল সেটাই দেখা যাবে। ১৫ নভেম্বর থেকে ডিএমপিসহ সব মেট্রোপলিটনে ইউনিফর্ম পরা শুরু করা হবে। পর্যায়ক্রমে সবগুলো ইউনিট নতুন ইউনিফর্ম পাবে।’
নির্বাচনের আগে পুলিশের সব ইউনিট নতুন ইউনিফর্ম পাবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পুলিশের সদস্য সংখ্যা দুই লাখের বেশি। এতসংখ্যক পুলিশের নির্বাচনের আগে নতুন ইউনিফর্ম দেওয়া সম্ভব নয়। জেলা পুলিশ ছাড়া নির্বাচনের আগে পুলিশের সব ইউনিট নতুন ইউনিফর্ম পাবে।’
র্যাবের নতুন ইউনিফর্মের বিষয়ে জানতে চাইলে বাহিনীর লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ‘জানুয়ারিতে মন্ত্রণালয়ে র্যাবের যে নতুন ইউনিফর্ম দেখানো হয়েছিল এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আপডেট নেই। র্যাবের সদস্যরা কালো রঙের ইউনিফর্মই বর্তমানে পরছেন।’
পরিবর্তনের কথা বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের ইউনিফর্মও। কিন্তু বাহিনীটির গোল্ডেন হুইট রঙের ইউনিফর্ম মন্ত্রণালয় থেকে চূড়ান্ত করা হলেও তারা রঙের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে জানান, নতুন কয়েকটি রঙের ইউনিফর্ম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। নির্বাচনের আগে নতুন ইউনিফর্মে যাওয়া মনে হয় সম্ভব হবে না।
আগেও পরিবর্তন হয়েছে পুলিশের ইউনিফর্ম
এক সময় বাংলাদেশ পুলিশের পোশাকের রং ছিল খাকি। এই রঙের পোশাকের ইতিহাস ব্রিটিশ আমলের সঙ্গে জড়িত। আমাদের এ অঞ্চল যখন ব্রিটিশ শাসিত ছিল তখনই পুলিশ ব্যবস্থা চালু হয়, তবে প্রথম দিকে কোনো নির্ধারিত পোশাক ছিল না। কিছু সময় পর তাদের জন্য সাদা পোশাক করা হয়। কিন্তু এই পোশাক নিয়েও সমস্যা দেখা দেয়, সেটা হলো- পুলিশ সদস্যদের সাদা ইউনিফর্ম ডিউটি করার সময় খুব তাড়াতাড়ি নোংরা হয়ে যেত। এতে ব্রিটিশ পুলিশের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা খুবই বিচলিত হয়ে পড়তেন।
Manual4 Ad Code
ফলে নোংরা আড়াল করতে পুলিশ সদস্যরা তাদের ইউনিফর্ম বিভিন্ন রঙে রাঙাতে থাকে, যা ছিল বিব্রতকর। ১৮৪৭ সালে ব্রিটিশ অফিসার স্যার হ্যারি লুমসডেনের পরামর্শে পুলিশের ইউনিফর্ম হালকা হলুদ এবং বাদামি রঙের করা হয়। তারপর চা পাতা, পানি ব্যবহার করে সুতি কাপড়ের রং রঞ্জকের মতো তৈরি করে ইউনিফর্মের ওপর লাগানো হতো। ফলে পোশাকের রং খাকি হয়ে যায়। সেই বছরই পুলিশে খাকি রঙের পোশাক গৃহীত হয়।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও বাঙালি পুলিশ সদস্যরা খাকি রঙের পোশাক ব্যবহার করেন। অনেকে অবশ্য সাদা পোশাকেও লড়াই করেছেন পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে। তবে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ পুলিশের পোশাকে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ২০০৪ সালে। সেই বছর পুলিশের পোশাক পরিবর্তন করে মহানগরগুলোয় হালকা জলপাই রঙের করা হয়। জেলা পুলিশকে দেওয়া হয় গাঢ় নীল রঙের পোশাক। র্যাবের কালো ও এপিবিএনের পোশাক তৈরি করা হয় খাকি, বেগুনি আর নীল রঙের মিশ্রণে।
এমনকি ২০০৯ সালেও কিছুটা পরিবর্তন আসে পুলিশের পোশাকে। ২০২০ সাল থেকেই বাংলাদেশ পুলিশের পোশাক পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা চলছিল। ২০২১ সালের শুরুর দিকে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের জন্য বেশ কয়েকটি পোশাকের ট্রায়ালও হয়। তারপরও নানান কারণে নতুন পোশাক পাননি বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা। তবে শুরু থেকেই র্যাবের কালো ইউনিফর্ম কখনো পরিবর্তন হয়নি।