নতুন বছরে সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রত্যাশা থাকে খাদ্যপণ্যের দামে স্থিতিশীলতা। মানুষ প্রত্যাশা করে যেন স্বল্প খরচের মধ্যে তারা পরিবারের চাহিদার পূরণ করতে পারে। ২০২৫ সালের উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতি বিবেচনায় সে প্রত্যাশার বিষয়ে সুখবর মিলছে দেশি-বিদেশি পরিসংখ্যানে।
২০২৫ সালের শুরু থেকেই বিশ্ববাজারে দাম কমার প্রবণতা ছিল। নভেম্বরে বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুসারে, ২০২৫ সালে সামগ্রিকভাবে পণ্যমূল্য ৭ শতাংশ কম। আগামী বছর, অর্থাৎ ২০২৬ সালে পণ্যমূল্য আরও ৭ শতাংশ কমবে। এ দাম হবে ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এ হিসাব আন্তর্জাতিক বাজারের। তবে অধিকাংশ পণ্য ও পণ্যের কাঁচামাল আমদানিনির্ভর হওয়ায় বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বিশ্ববাজারের কারণে দেশেও কৃষিপণ্য, খাদ্য ও কাঁচামালের দাম কমবে। চলতি বছরের শেষেও এসব পণ্যের দাম কমেছে।
বাংলাদেশেও ২০২৫ সালে খাদ্য উৎপাদন ও অন্য পণ্যের আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতিতে খুব একটা জটিলতা ছিল না। সব মিলে মোটাদাগে ২০২৬ সালে পণ্যমূল্য স্থিতিশীল অথবা নিম্নমুখী থাকারই ইঙ্গিত মিলছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ‘এবার বৈশ্বিক আবহাওয়া ভালো। যে কারণে কৃষি ও খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ভালো প্রায় অধিকাংশ দেশে। যে কারণে বিশ্ববাজারে গম, ভুট্টা ও মসলাজাতীয় ফসলগুলোর দাম এখন কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। যার একটি সুফল কিছুদিনের মধ্যে পাবেন বাংলাদেশের ভোক্তারা।’
‘এবছর (২০২৫) বাংলাদেশে আমন ও আউশের ভালো ফলন হয়েছে। গম আমদানিও হচ্ছে কম দামে। যে কারণে দানাদার খাদ্য নিয়ে এখনো কোনো দুশ্চিন্তা নেই। আসন্ন বোরো উৎপাদন ভালো হলে তখন নিঃসন্দেহে বলা যায় ২০২৬ সাল ভালো যাবে সাধারণ মানুষের জন্য।’
তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে এমন কোনো শঙ্কা নেই। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা চ্যালেঞ্জ আছে। সেটা ঠিক থাকলে সামনে সুদিন আসতে পারে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক সেলিম রায়হান বলেন, ‘অনেক সময় বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কমলেও বাংলাদেশের বাজারে তার প্রভাব দেখা যায় না। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়, শুল্ক ও করের চাপ এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতার কারণে সেটা হয়। পাইকারি থেকে খুচরা পর্যন্ত অতি মুনাফা ও অস্বচ্ছ বাণিজ্যিক শৃঙ্খলার কারণেও বাজারে কৃত্রিমভাবে উচ্চমূল্য বিরাজ করে। যে কারণে বৈশ্বিক মূল্যহ্রাসের সুফল ভোক্তাপর্যায়ে পড়ে না। এসব বিষয় সুশৃঙ্খল করা গেলে ভোক্তারা ২০২৬ সালে স্বস্তি পাবে।’
Manual5 Ad Code
দেশের খাদ্য উৎপাদন পরিস্থিতি
Manual2 Ad Code
প্রথমবারের মতো ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চার কোটি টনের বেশি চাল উৎপাদন করেছে বাংলাদেশ। ওই বছর চার কোটি ছয় লাখ টন চাল উৎপাদন হয়েছিল, যা তার আগের অর্থবছরের তুলনায় চার দশমিক এক শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) উৎপাদন আরও ১৩ লাখ টন বেড়ে ৪ কোটি ১৯ লাখ টন হয়েছে। ওই বছর দুই কোটি ২৬ লাখ টন বোরো, এক কোটি ৬৫ লাখ টন আমন ও ২৮ লাখ টন আউশ ধান উৎপাদন হয়। গম উৎপাদন হয় ১০ লাখ টন আর ভুট্টা ৭৪ লাখ টন।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ দুই ফসলের উৎপাদন ছিল যথাক্রমে ১১ লাখ টন ও ৬৭ লাখ টন। ফলে এ তিন ফসল মিলে গত অর্থবছরে দেশে মোট দানাদার খাদ্যশস্যের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৩ লাখ টন। যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪ কোটি ৮৭ লাখ টন। ফলে প্রথমবারের মতো এক অর্থবছরে পাঁচ কোটি টনের বেশি দানাদার খাদ্য উৎপাদন করেছে বাংলাদেশ।
চলতি বছর (২০২৫-২৬) আমন চালের উৎপাদন ১ কোটি ৮১ লাখ ৭৫ হাজার টনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্যমতে, এবার ৫৯ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৫১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে, যেখানে হেক্টরপ্রতি গড়ে ৩ দশমিক ১১ টন হিসেবে প্রায় এক কোটি ৬১ লাখ টন ফলন পাওয়া গেছে।
ডিএইর ফিল্ড উইংয়ের পরিচালক মো. ওবাদুর রহমান মন্ডল বলেন, ‘এ বছর আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে। এর আগে গত আউশের উৎপাদনও ভালো হয়েছিল। যে কারণে এ বছর ব্যবসায়ীদের চাল আমদানি করতে হয়নি।’
এ কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘দেশে ২০২৫ সালে প্রাকৃতিক দুর্যোগে উৎপাদনের তেমন ক্ষতি হয়নি। যে কারণে অধিকাংশ ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। চালের মজুতও বাড়ছে।’
খাদ্যশস্যের মজুত ভালো
২০২৫ সালের শুরুতে প্রায় ১৭ লাখ ৩ হাজার টন বোরো সংগ্রহ করে নতুন রেকর্ড গড়ে সরকার। ধান সংগ্রহ করে তিন লাখ ৭৭ হাজার টন। পাশাপাশি ভালো উৎপাদনের পরও অন্তর্বর্তী সরকার চাল ও গম আমদানি অব্যাহত রেখেছে। যে কারণে সরকারি পর্যায়ে সবোর্চ্চ মজুত তৈরি হয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, এখন সরকারের কাছে ১৪ লাখ ৪৯ হাজার টন খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে।
মন্ত্রণালয় বলছে, বাংলাদেশের খাদ্যশস্যের মজুত এখন ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এটি ২০২২ সালের অক্টোবর মাসের আগের রেকর্ড ১৪ লাখ ৩৫ হাজার টনকে ছাড়িয়ে গেছে।
Manual2 Ad Code
বছর শেষে সরকার আমন মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ছয় লাখ টন সিদ্ধ চাল, ৫০ হাজার টন আতপ চাল এবং ৫০ হাজার টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। মজুত আরও বাড়াতে সরকার আরও পাঁচ লাখ টন চাল এবং চার লাখ টন গম আমদানি করছে, যা পাইপলাইনে রয়েছে।
বছরজুড়ে ভর্তুকির খাদ্য কর্মসূচি
এখন খোলাবাজারে খাদ্যশস্য বিক্রি (ওএমএস), খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি (এফএফপি) এবং স্কুল ফিডিং কর্মসূচির মতো বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে নিম্ন আয়ের এক কোটির বেশি মানুষকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
Manual2 Ad Code
খাদ্য অধিদপ্তর বলছে, বর্তমানে ওএমএস কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশজুড়ে এক হাজার ৯০২টি কেন্দ্রে এক কোটি ২২ লাখ পরিবারের কাছে প্রতি মাসে পাঁচ কেজি চাল ৩০ টাকা কেজি দরে ভর্তুকিমূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া তালিকাভুক্ত চা বাগানের শ্রমিকদের কাছে মাত্র ১৯ টাকা কেজি দরে গম বিক্রি করা হচ্ছে।
পাশাপাশি, ৫৫ লাখ পরিবার এখন প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে চাল পাচ্ছে। আগে এই কর্মসূচি পাঁচ মাস চললেও বাজারে বেশি দামে চাল কিনতে বাধ্য হওয়া পরিবারগুলোর ওপর চাপ কমাতে আগস্ট থেকে তা ছয় মাসে বাড়ানো হয়েছে। আবার দুস্থ নারীদের জন্য পরিচালিত ‘ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট’ কর্মসূচির আওতায় ১০ লাখ ৪০ হাজার নারী মাসিক ৩০ কেজি চাল পাচ্ছেন।
গত অর্থবছর বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে সাড়ে ৩৩ লাখ টন খাদ্য বিতরণ করেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর ৩৬ লাখ ৬১ হাজার টন খাদ্য বিতরণ করা হবে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) মহাপরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘দেশে খাদ্যের কোনো ঘাটতি নেই। পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত আছে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের এসব কর্মসূচি বাজারে খাদ্যদ্রব্যের দামে বাড়তি চাপ কমাচ্ছে।