ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরও দেশে রাজনৈতিক হত্যা অব্যাহত রয়েছে। এসব ঘটনায় উদ্বিগ্ন রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা। নির্বাচনকে ঘিরে এই ধারার হত্যাকাণ্ড আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাদের। সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই একের পর এক রাজনৈতিক হত্যা হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
গত বছরের ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। এর পরদিনই ফিল্মি কায়দায় খুন করা হয় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদিকে। এই হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ গত শনিবার চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় জামাল উদ্দিন নামে এক জামায়াতকর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নাসির উদ্দিন নামে আরও একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। নাসিরও জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
এর আগে গত বুধবার খোদ রাজধানীতে প্রকাশ্যে খুন করা হয় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে। হাদি হত্যার পর রাজনীতিবিদদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। অনেকে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অনেক রাজনীতিবিদকে দেওয়া হয় ব্যক্তিগত নিরাপত্তা।
Manual7 Ad Code
হাদি হত্যার পর জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার ঘটনার পর ৩০০ আসনের প্রার্থী তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিনই একজন প্রার্থীকে গুলি করার অর্থ হলো, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি প্যাকেজ প্রোগ্রাম। আরও সিরিয়াল হয়তো করা হয়েছে।
আর স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মুসাব্বিরকে হত্যার পর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতিতে বলেন, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই এ ধরনের লোমহর্ষক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানো হচ্ছে। দেশে পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীলতা তৈরির অপচেষ্টা চলছে, যার নির্মম বহিঃপ্রকাশ এ হত্যাকাণ্ড।
এ ধরনের সহিংসতা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে চরমভাবে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়াচ্ছে। অভিজ্ঞ এই রাজনীতিবিদদের কথার সত্যতা প্রমাণ হয় তফসিল ঘোষণার এক মাসের মধ্যে কমপক্ষে ৭টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, প্রতিশোধপরায়ণতা, সমাবেশ ও কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ, নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ২০২৫ সালে ৯১৪টি সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
এসব সহিংসতায় নিহত ১৩৩ জনের মধ্যে বিএনপির ৯৩ জন, আওয়ামী লীগের ২৩ জন, ইউপিডিএফের ৬ জন, জামায়াতে ইসলামীর ৩ জন, ইনকিলাব মঞ্চের ১ জন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ১ জন রয়েছেন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৫৪টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩ জন।
মানবাধিকার সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে রাজনৈতিক সহিংসতার ৫৯৯টি ঘটনায় মোট ৫ হাজার ৬০৪ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৮৬ জন নিহত এবং ৫ হাজার ৫১৮ জন আহত হন, যাদের মধ্যে ৯৭ জন ছিলেন গুলিবিদ্ধ।
নিহতদের মধ্যে ৬৫ জন বিএনপি সদস্য, ৮ জন আওয়ামী লীগ সদস্য, ৩ জন জামায়াতে ইসলামীর সদস্য এবং ১০ জন সাধারণ নাগরিক ছিলেন, যাদের রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর মনোনয়ন ও প্রচার সংশ্লিষ্ট ২৬টি ঘটনায় ২৫২ জন ক্ষতিগ্রস্ত হন। এর মধ্যে ৩ জন নিহত ও ২৪৯ জন আহত হন।
অন্যদিকে আরেকটি মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির ১ জানুয়ারিতে প্রকাশিত তথ্য বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনি সহিংসতার ৫৪টি ঘটনায় তিনজন নিহত এবং ৪৯৪ জন আহত হয়েছেন।
Manual2 Ad Code
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরের দিন চাঞ্চল্যকর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদিকে প্রকাশ্য হত্যা করে খুনিরা ভারতে পালিয়ে যায়। এ ঘটনার পর চট্টগ্রামে গুলি করে হত্যা করা হয় সম্প্রতি বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর সমর্থক ও রাউজানের একটি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জানে আলম সিকদারকে।
Manual6 Ad Code
১৯ ডিসেম্বর গভীর রাতে লক্ষ্মীপুরে দরজায় তালা লাগিয়ে ও পেট্রোল ঢেলে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার ঘরে আগুন দেওয়া হয়। এতে আগুনে পুড়ে ওই নেতার সাত বছর বয়সি এক মেয়ের মৃত্যু হয়। দগ্ধ হন বিএনপি নেতাসহ তার আরও দুই মেয়ে। গত ৩ জানুয়ারি যশোর শহরের শংকরপুর এলাকায় বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনকে (৫৫) গুলি করে হত্যা করা হয়। গত ৫ জানুয়ারি সোমবার রাতে চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা আলমগীর সিকদারকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
Manual5 Ad Code
তফসিল ঘোষণার আগেও দেশের বিভিন্নস্থানে ঘটে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। গত বছরের ১৭ নভেম্বর রাজধানীর মিরপুরে দোকানে ঢুকে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্য সচিব গোলাম কিবরিয়াকে (৪৭) গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এর আগে ৫ নভেম্বর চট্টগ্রাম-৮ আসনে (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর জনসংযোগে গুলি করা হয়। এতে একজন নিহত হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, নাগরিক নিরাপত্তা এবং নির্বাচন উপযোগী পরিবেশের প্রশ্নে যে ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আমরা প্রত্যাশা করছি সত্যিকার অর্থে তা তৈরি হচ্ছে না। কারণ এখানে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। এই চ্যালেঞ্জগুলোর কারণে সেই ইতিবাচক বা প্রত্যাশিত পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে যে অভিযানগুলো পরিচালিত হচ্ছে, অনেক অপরাধী গ্রেফতার করা হচ্ছে বলে বলা হচ্ছে। কিন্তু তারপরও যে অপরাধগুলো সংঘটিত হচ্ছে, যে ধরনের অপরাধের ভয়াবহতা বা গুরুতর অপরাধ আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি, সেগুলো যারা সৃষ্টি করছে বা সংঘটিত করছে, তারা কোন বিবেচনায় বাইরে থেকে যাচ্ছে, সেই প্রশ্নটা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসেন বলেন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যেও কিছু ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। তবে অধিকাংশ ঘটনাতেই পুলিশ অপরাধীদের গ্রেফতার করছে। বাকিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে। তিনি আরও বলেন, রাজনীতিবিদদের নিরাপত্তায় অনেককে গানম্যান দেওয়া হয়েছে। আরও যারা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা চান তারা এ জন্য আবেদন করতে পারেন। নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় তাদেরও গানম্যান দেওয়া হবে।