চাহিদা কমে যাওয়ায় শীতকালে দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রায় ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত অলস পড়ে থাকছে।
এমনকি এ মৌসুমে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতার ৬০ শতাংশ কাজে লাগে না। এটি গ্রহণযোগ্য মাত্রার তিনগুণেরও বেশি বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
হিসাব বলছে, শীতের মধ্যে তুলনামূলক উষ্ণ আবহাওয়ায় বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা দেশে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার হয় সেটির তুলনায় ১৬৩ শতাংশ বেশি। আর শীতকালের সবচেয়ে ঠান্ডা সময়ে যে বিদ্যুৎ ব্যবহার হয় তা থেকে উৎপাদন সক্ষমতা বেশি ৩২৫ শতাংশের বেশি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদনের এ অতিরিক্ত সক্ষমতা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতি ও পরিকল্পনার ত্রুটির বহিঃপ্রকাশ।
এর মূল কারণ হিসেবে তারা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অপরিকল্পিত লক্ষ্যমাত্রাকে দুষছেন, যা শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা চাপিয়েছে। এর কারণ অনেক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ না কিনলেও সেগুলোকে কিছু চার্জ দিতে হয়।
দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯৪৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে কিছু কিছু সময় বিদ্যুতের চাহিদা ৭ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায়।
বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বিতরণের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০ নভেম্বরের পর থেকে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদাও বেশির ভাগ সময় ছিল ১১ হাজার মেগাওয়াটের নিচে। চলতি সপ্তাহের শনি ও রোববার চাহিদা ছিল সাত হাজার মেগাওয়াটের নিচে।
বিদ্যুৎ সঞ্চালন কোম্পানি পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ লিমিটেডের ঘণ্টাভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার বিকাল ৫টায় চাহিদা ছিল ৬ হাজার ৯৮৫ মেগাওয়াট। এর আগে ১৭ ডিসেম্বর বিকাল ৫টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৬ হাজার ৭৬৬ মেগাওয়াট।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা থাকে সাধারণত সন্ধ্যা ৭টা এবং রাত ১২টার দিকে।
Manual5 Ad Code
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) বাংলাদেশ বিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, “উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর পর যদি ব্যবহার সেই হারে না বাড়ে, তাহলে এমনটাই ঘটার কথা।”
দেশে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও সরবরাহ সক্ষমতা (ইভ্যাকুয়েশন ক্যাপাসিটি) গড়ে তুলতে ব্যর্থ হওয়ায় শিল্পখাতের এক বড় অংশকে ক্যাপটিভ পাওয়ার, অর্থাৎ নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভর করতে হয়।
আগের সরকারের প্রত্যাশা ছিল, বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবে ফলেনি। এরপরও আওয়ামী লীগ সরকার নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন অব্যাহত রাখে, যা শেষ পর্যন্ত এ খাতে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এ সংকটের একটা প্রধান কারণ ছিল বিদ্যুৎখাতে অতিরিক্ত খরচ, যা ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাষায় ছিল ‘লুটেরা ব্যয়’।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বেশ কিছু কল-কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যায়।
শীতকালেও লোডশেডিং
শীতের চূড়ান্ত সময়েও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎ ছিল না, যা বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালন ব্যবস্থার বেহাল চিত্রই তুলে ধরে।
ঢাকার কিছু এলাকায় দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
উত্তর বাড্ডার একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের কেয়ারটেকার নূর হোসেন বলেন, “সম্প্রতি একটানা দুই ঘণ্টার বেশি সময় বিদ্যুৎ ছিল না।”
এ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে জেনারেটরে ডিজেল পোড়াতে হয়েছে, যা একটি নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবস্থা থাকলে সহজেই এড়ানো যেত।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বিভ্রাট নতুন কোনো বিষয় নয়। এমনকি শতভাগ বিদ্যুতায়ন উদ্যাপনের কয়েক মাসের মধ্যেই ২০২২ সালের জুলাইয়ে ‘রেশনিং’ করে লোডশেডিং চালু করে তৎকালীন সরকার। ওই সময় গ্রীষ্মকালের কোনো কোনো দিনে ১৯ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার ঘটনাও ঘটে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সদস্য জহুরুল ইসলাম বলেন, “শীতকালে বিদ্যুতের চাহিদা কমে যাওয়া স্বাভাবিক। আর এ বছর শীতের তীব্রতা আগের বছরের চেয়ে বেশি।”
তিনি বলেন, “আগামী গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। জরুরি পরিস্থিতিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিশ্বের অনেক দেশ তাদের উৎপাদন সক্ষমতার ৪০ শতাংশ বিকল্প হিসেবে সংরক্ষণ করে।”
তবে তিনি স্বীকার করেন, “জ্বালানি সংকটের কারণে বাস্তব বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা সরকারি হিসাবের তুলনায় কম।”
শীতকালে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণ হিসেবে তিনি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সঞ্চালন লাইনের রক্ষণাবেক্ষণ কাজকে দায়ী করেন।
বাংলাদেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট, যা আসে গত বছরের ২৩ জুলাই।
অতিরিক্ত সক্ষমতার বোঝা
Manual3 Ad Code
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার সময় দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৬ হাজার মেগাওয়াটেরও কম।
Manual8 Ad Code
ক্ষমতায় এসে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনকে সামনে রেখে দায়মুক্তি আইন (ইনডেমনিটি আইন) প্রণয়ন করে। তখন দরপত্র ছাড়াই শতাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়, যার বেশির ভাগই ছিল বেসরকারি বিনিয়োগে।
বিদ্যুৎ কেনার চুক্তিতে ক্যাপাসিটি চার্জ চালু করে বিনিয়োগকারীদের জন্য সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফার সুযোগ রাখা হয়। ফলে কেন্দ্রগুলো উৎপাদনে থাকুক বা না থাকুক, বিনিয়োগকারীরা তাদের পাওনা ঠিকই পেতে থাকেন।
শুধু শীতে নয়, গরমের সময়ও কম চাহিদার কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস পড়ে থাকে। এজন্য বসিয়ে রেখেও কেন্দ্রগুলোকে অর্থ দিতে হয়।
আবার রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের মতো বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের সময় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস ও তেল আমদানি না হওয়ায় অনেক কেন্দ্র ব্যবহার না হয়ে অলস বসে থাকে।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন স্থবির থাকার কারণেও অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র মাসের পর মাস সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদনে যেতে পারেনি।
ওই সময়ের পর থেকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমতে থাকলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে। বিদেশি মুদ্রার সংকটে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি কেনার সক্ষমতা কমে যায়।
অনেকের চোখে, অর্থপাচার এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) আমদানির ব্যয় মেটাতে গিয়েই রিজার্ভ কমে যেতে থাকে।
আরেকটি বিষয় হলো, ক্যাপাসিটি চার্জের বেশির ভাগ অর্থও সরকারকে ডলারে পরিশোধ করতে হয়েছে।
২০০৯ সালের পর থেকে পরের ১৪ বছরে সরকারিভাবে সংসদে উপস্থাপিত হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, উৎপাদন ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ ক্যাপাসিটি চার্জসহ রেন্টাল বা ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্রগুলো ৩ থেকে ৫ বছর পর বন্ধ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। সেগুলোর চুক্তি বারবার নবায়ন করা হয়েছে। ফলে কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রায় ১৫ বছর পরও চালু রয়েছে।
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষক হাসান মেহেদীর মতে এটি ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনার ফল। এ বিষয়ে সরকারকে বারবার সতর্ক করা হলেও কাজ হয়নি।
এ ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়ে সম্প্রতি পাকিস্তান সরকার বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে পুনরায় আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়। সেই আলোচনায় অবশ্য দেশটি বিদ্যুতের দাম কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এখনো এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
এর সামগ্রিক প্রভাব পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ সংস্থা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ওপর। বিদ্যুৎ কেনার দায়িত্বে থাকা সংস্থাটির লোকসানের পরিমাণ বেড়ে গেছে ব্যাপক হারে।
২০২৪¬-২৫ অর্থবছরে সরকার ৩৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার পরও পিডিবির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি।
উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডজনেরও বেশি বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়, যার ফল হিসাবে দেশে দেখা দেয় এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি, যা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে অব্যাহত থাকে।
Manual7 Ad Code
২০২৪ সালের জানুয়ারির পর থেকে যুক্ত হওয়া আড়াই হাজার মেগাওয়াট জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর চালু করে।
এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার ১৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকার অব্যাহত রেখেছে, যেগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার ৭১৪ মেগাওয়াট। ২০৩০ সালের মধ্যে এসব কেন্দ্র চালু হওয়ার কথা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ২০৪০ সালের মধ্যেও দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ২৯ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।
“সরকার যদি বর্তমান পরিকল্পনা থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ না বাড়ায়, তাহলে অতিরিক্ত সক্ষমতার যে সংকট, তা আরও গভীর হবে।”
দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা প্রসার করার বিষয়টি স্থবির অবস্থায় রয়েছে, যা মোট উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ।