প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

৫ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২১শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২২শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

গণভোটের প্রচারে রাজনৈতিক দলগুলো নীরব

editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ১৪, ২০২৬, ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ
গণভোটের প্রচারে রাজনৈতিক দলগুলো নীরব

Manual6 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনে একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে ‘গণভোট’ হবে। ভোটের বাকি আর মাত্র ২৮ দিন। কিন্তু নির্বাচন ঘনিয়ে এলেও গণভোটের প্রচারে পিছিয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। দেশের শাসনব্যবস্থা ও সংবিধানে আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে গণভোট নিয়ে জনগণের মধ্যে কিছুটা আলোচনা থাকলেও মাঠপর্যায়ের প্রচারে দলগুলো রহস্যজনক নীরবতা পালন করছে। তাদের বেশি মনোযোগ সংসদ নির্বাচনের প্রচারের ওপর। দলগুলো সংস্কারের পক্ষে কথা বললেও গণভোট নিয়ে তেমন প্রচার এখনো দৃশ্যমান হয়নি।

Manual4 Ad Code

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সংস্কারের দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে নির্বাচনের রোডম্যাপ পিছিয়ে যায় কি না, এমন আশঙ্কা থেকেই দলগুলো গণভোটের প্রচারে সক্রিয় হতে এখনো দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। এদের মধ্যে গণভোটের ব্যাপারে বিএনপির নীরবতা দৃশ্যমান । অন্যদিকে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, এনসিপিসহ ১১-দলীয় জোটের শরিক দলগুলো গণভোটের ব্যাপারে কিছুটা প্রচার করছে। তবে সেটিও খুব বেশি আলোচনায় আসছে না। প্রতীক বরাদ্দের পর আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে দলগুলো সংসদ নির্বাচনের প্রচার শুরু করবে। এর আগে সংসদ নির্বাচনের প্রচারে বাধা থাকলেও গণভোটের প্রচারে কোনো বাধা নেই। তবু গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে মাঠপর্যায়ে তেমন কোনো প্রচার চালাতে দেখা যায়নি। মূলত, রাষ্ট্র সংস্কারের মেরামতে সব দল একমত পোষণ করলেও কিছু মৌলিক বিষয়ে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে কিছু সংস্কারের বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সিদ্ধান্তে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে। ফলে গণভোটে জনগণের কতটা সাড়া মিলবে তা নিয়ে একধরনের সংশয় আছে। সর্বশেষ গতকাল গণভোটের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করতে প্রচার চালাতে ক্যারাভ্যান (পিকআপ) করে ঢাকা শহরে প্রচার চালিয়েছে।

বিএনপির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, আসন্ন নির্বাচনি ইশতেহারে গণভোটের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষেই প্রচার চালাবে বিএনপি। কারণ সংস্কার একটা চলমান প্রক্রিয়া। বিএনপি অতীতেও সংস্কার করেছে, আগামী দিনেও করবে। নির্বাচনি প্রচার শুরু হলে তখন দলীয়ভাবে গণভোটের পক্ষে প্রচার চালাতে প্রার্থী ও নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, “সংস্কার একটা চলমান প্রক্রিয়া, এটি চলতেই থাকবে। আমরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার শুরু করিনি। আমরা গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষেই প্রচারে থাকব।”

গতকাল বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, “আমরাই সংস্কারের দাবি সবার আগে করেছি। আমাদেরই প্রস্তাব অনুযায়ী এসব সংস্কারের বিষয়ে আলোচনায় এসেছে এবং কমিটি হয়েছে। সেখানে আমরা অংশ নিয়েছি, বহু বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি। কিছু প্রস্তাবে আমরা নোট অফ ডিসেন্ট দিয়েছি। সুতরাং সংস্কারের বিপক্ষে তো আমরা নই, আমরা সেই সংস্কারের পক্ষে। অতএব আমরা ‘হ্যাঁ’ ভোট দেব, এটিই আমাদের সিদ্ধান্ত।”

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে গণভোটের বিষয় থাকবে। দলীয় অবস্থান শিগগিরই দেশবাসীর সামনে তুলে ধরা হবে।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের অনেকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে বলছেন। গতকাল রাজধানীর বাংলামোটরে দলীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে গণভোটসংবলিত ক্যারাভ্যানের মাধ্যমে এনসিপি প্রচার যাত্রা শুরু করে।

Manual7 Ad Code

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গণভোট ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত না হলে জুলাই সনদ আইনি ভিত্তি পাবে না। রাষ্ট্রের মৌলিক কোনো পরিবর্তন হবে না। আগামী দিনে আবারও স্বৈরাচারের জন্ম হবে।”

তিনি বলেন, দলীয় প্রচার সামনে আরও জোরদার করা হবে। দলীয় প্রার্থীদের পাশাপাশি গণভোটকে জয়ী করতে সভা-সমাবেশসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু করা হবে।

উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বিএনপির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “আমরা দেখতে পাচ্ছি, একটি বিশেষ দল গণভোটে ‘না’-এর পক্ষে কথা তুলছে। যারা ‘না’-এর পক্ষে কথা বলছেন, তারা আসলে কী বার্তা দিতে চান তা স্পষ্ট নয়। ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কথা বলাটা সব রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব ছিল। তবে গণভোটে ‘না’ জয়যুক্ত হলে গণ-অভ্যুত্থান ব্যর্থ হবে।” এ সময় ভোটারদের সচেতনভাবে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

গণতন্ত্রের মঞ্চের অন্যতম নেতা ও নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ভোটের প্রচার এখনো শুরু হয়নি। গণভোটে সরাসরি কোনো প্রতিযোগিতা নেই। কিন্তু সংসদ নির্বাচনে প্রতিযোগিতা আছে। তাই গণভোটের প্রচার একটু কম হবে। তবে আরও আগে প্রচার চালানো গেলে তাহলে ভালো হতো।

জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার শুরু করবে জাতীয় পার্টি। তবে গণভোটের প্রচারের ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। দলীয় ফোরামে আলোচনার পর গণভোটের ব্যাপারে দিকনির্দেশনা প্রার্থী ও নেতা-কর্মীদের জানিয়ে দেওয়া হবে।

আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘গণভোটের ব্যাপারে বিএনপির নীরবতা রহস্যজনক। জুলাই সনদে বিএনপি স্বাক্ষর করেছে। সুতরাং তাদের না ভোটের পক্ষে থাকার কোনো সুযোগ নেই। বিএনপি যদি গণভোটের পক্ষে প্রচার না করে, তখন আরেকটা ইস্যু তৈরি হবে।’

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “গণভোটের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কোনো ধরনের প্রচারে আমরা যাচ্ছি না। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। আমরা দলীয় ফোরাম ও জোটে আলোচনা করার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব।”

তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে গণভোটের কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ গণভোট সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত নেই। আইনি বৈধতার জন্য সংসদে পাস হতে হবে। তাই আমরা বলেছিলাম, নির্বাচিত সরকার গঠনের পর সংবিধানে গণভোট যুক্ত করার পর গণভোট আয়োজন করার।’

অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগ

Manual4 Ad Code

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের নেতৃত্বে শপথ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংস্কার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। দীর্ঘ আট মাস আলোচনার পর গত অক্টোবরে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে তৈরি করা হয় জুলাই জাতীয় সনদ। এই সনদে থাকা সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে হবে গণভোট। এই ৪৮ প্রস্তাবকে চারটি বিষয়ে ভাগ করে গণভোটের প্রশ্ন তৈরি করা হয়েছে। এই চারটি প্রশ্নের একটি উত্তর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ রাখায় সাধারণ মানুষের কাছে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাবের সঙ্গে বেশির ভাগ মানুষের তেমন কোনো ধারণাও নেই। সে জন্য ভোটারদের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে গণভোটের ব্যাপক প্রচার চালানো প্রয়োজন।

এদিকে গণভোটের প্রচারে অন্তর্বর্তী সরকার অবশ্য নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু সেসব উদ্যোগ এখনো মাঠপর্যায়ে খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারেনি। তৃণমূলের মানুষের মধ্যে সরাসরি গণভোটের প্রচার করতে মসজিদের ইমাম ও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজে লাগাচ্ছে সরকার। পাশাপাশি সরকারি ব্যাংক, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও এনজিওর মাধ্যমে গণভোটে ’হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিতে প্রচার চালাতে বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

যা বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, “অনেক সংস্কার নিয়ে গণভোট হবে। ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হওয়া মানেই সংস্কার হওয়া। ‘না’ জয়যুক্ত হওয়া মানেই সংস্কার না হওয়া। সংস্কার না হলে আমরা আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারি। আবার সরকার নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসবে, তাদের স্বৈরাচারী হওয়ার সম্ভাবনা একবারে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, সংসদ নির্বাচন ও গণভোট এক দিনে অন্তর্বর্তী সরকারের এমন ভুল সিদ্ধান্তের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট নির্বাচনের আগে করার দরকার ছিল। জাতীয় নির্বাচনের দিনে গণভোট হওয়ায় সাধারণ জনগণ দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেছেন।

তিনি বলেন, যারা সংস্কার চায়, পরিবর্তন চায়, তারা গণভোটের প্রচার চালাবে। আর যেসব দল পরিবর্তন চায় না, তারা গণভোটের প্রচার চালাবে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘কেউ কেউ গণভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। সেটি খুব বেশি ফোকাসে আসছে না। তবে কেউ গণভোটের বিপক্ষে প্রচার চালাচ্ছে না। আমি মনে করি, হতাশ হওয়ার কিছু নেই। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, ততই সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটের প্রচার বাড়বে। সরকারের পক্ষ থেকেও প্রচারে ভালো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যতদিন যাবে, রাজনৈতিক দলগুলো আরও সক্রিয় হবে। গণভোটের ব্যাপারে মানুষের মধ্যে সচেতনতাও বৃদ্ধি পাবে। মানুষ সজাগ হবেন।’

Manual4 Ad Code

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code