আওয়ামী জমানার সাড়ে ১৬ হাজার ‘গায়েবি’ মামলা প্রত্যাহার, অপেক্ষায় আরোও সাড়ে ১৯ হাজার মামলা
আওয়ামী জমানার সাড়ে ১৬ হাজার ‘গায়েবি’ মামলা প্রত্যাহার, অপেক্ষায় আরোও সাড়ে ১৯ হাজার মামলা
editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ১৯, ২০২৬, ১০:২২ পূর্বাহ্ণ
Manual6 Ad Code
# সবচেয়ে বেশি মামলা সাতক্ষীরায়
# সবচেয়ে কম মামলা মাদারীপুরে
# ডিএমপিতে প্রত্যাহার করা হয়েছে ৪,৮৪৪ মামলা
# নাজমুলদের জীবনে স্বস্তি ফিরলেও ক্ষত মোছেনি
প্রজন্ম ডেস্ক:
Manual3 Ad Code
২০২৩ সালের ২০ ডিসেম্বর। চারদিকে তখন নির্বাচনী উত্তাপ আর ধরপাকড় চলছিল। পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম সুবিদখালী গ্রামের ছাত্রদলকর্মী নাজমুল মৃধা পলাতক অবস্থা থেকে মুমূর্ষু বাবাকে দেখতে বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছালে পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। পরে বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের এক ‘গায়েবি’ মামলায় তাঁকে পাঠানো হয় কারাগারে।
এর ২৩ দিন পর নাজমুলের বাবা মারা যান। তাঁকে শেষ বিদায় জানাতে প্যারোলে মুক্তি মিললেও নাজমুলের পায়ে তখন পরা ছিল ডান্ডাবেড়ি। সে অবস্থাতেই বাবার জানাজায় অংশ নেন নাজমুল।
ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নাজমুলের মতো হাজারো মানুষের দুঃস্বপ্ন কাটতে শুরু করে।
রাজনৈতিক কারণে করা হাজারো গায়েবি মামলা প্রত্যাহারের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত আট মাসে ১৬১টি পৃথক প্রজ্ঞাপনে ১৬ হাজার ৯৬২টি গায়েবি মামলা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত আদেশ জারি করা হয়। এ ছাড়া আরো দুই হাজারের বেশি মামলা প্রত্যাহার প্রক্রিয়াধীন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন শাখার তথ্যানুযায়ী, গত বছর ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হলেও ৫ মার্চের পর তা গতি পায়।
এরপর গত বছর ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জারি করা ১৬১টি পৃথক প্রজ্ঞাপনে ১৬ হাজার ৯৬২টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। সূত্র জানায়, প্রত্যাহারের জন্য মোট ১৯ হাজার ৫০০টি মামলা সুপারিশ করা হয়েছিল।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই গায়েবি মামলা প্রত্যাহারের হার সবচেয়ে বেশি ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় (ডিএমপি)। ডিএমপিতে মোট চার হাজার ৮৪৪টি মামলা প্রত্যাহার করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এ ছাড়া বড় শহরগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনে এক হাজার ১২৮টি, খুলনা মেট্রোপলিটনে এক হাজার ১৪২টি এবং রাজশাহী মেট্রোপলিটনে ৬২৪টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়।
এর বাইরে দেশের ৬৪ জেলায় ৯ হাজার ২২৩টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
১৬১টি প্রজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে সাতক্ষীরায়। ২০১৩-১৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় এই জেলাটি ছিল খুবই উত্তপ্ত। তৎকালীন সরকারের দমন-পীড়নে এই জেলার রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর চাপানো হয়েছিল বিপুল মামলা। প্রজ্ঞাপনে সাতক্ষীরা জেলায় ৭৯৪টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। মামলা প্রত্যাহারে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সিরাজগঞ্জ জেলা। সেখানে প্রত্যাহার করা হয় ৬৪৭টি মামলা।
Manual1 Ad Code
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, যেসব এলাকায় বিরোধী দলের আন্দোলন তীব্র ছিল, সেসব এলাকায় গায়েবি মামলার হারও ছিল বেশি। ফলে সেসব জেলা থেকে মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ এবং প্রত্যাহারের সংখ্যাও বেশি।
বিপরীত চিত্র দেখা গেছে মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ ও শরীয়তপুর জেলায়। আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এসব জেলায় বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কম থাকায় মামলার সংখ্যাও ছিল কম। মাদারীপুরে মাত্র ছয়টি, গোপালগঞ্জে ১৭টি এবং শরীয়তপুরে ২১টি মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়। অন্যদিকে পাহাড়ি জেলাগুলোয়ও রাজনৈতিক মামলা থেমে ছিল না। বান্দরবানে আটটি, খাগড়াছড়িতে ৫৮টি এবং রাঙামাটিতে ১৮টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, শেখ হাসিনা সরকারের ১৬ বছরে করা রাজনৈতিক গায়েবি মামলাগুলো যাচাই-বাছাই করতে একটি উচ্চ পর্যায়ের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। আইন উপদেষ্টাকে সভাপতি করে গঠিত হয়েছে একটি কেন্দ্রীয় কমিটি। এ ছাড়া প্রতিটি জেলায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে (ডিসি) সভাপতি করে গঠন করা হয়েছে মাঠ পর্যায়ের কমিটি। প্রক্রিয়াটি তিন স্তরে সম্পন্ন হয়। প্রথমে মাঠ পর্যায়ের কমিটি গায়েবি মামলাগুলো চিহ্নিত করে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে আইন ও বিচার বিভাগের সলিসিটর কার্যালয়ে পাঠায়। সেখান থেকে কেন্দ্রীয় কমিটি মামলাগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চূড়ান্ত সুপারিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যাচাই শেষে প্রজ্ঞাপন জারি করে।
শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) তাহসিনা বেগম এ বিষয়ে বলেন, ‘রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। আমি যোগদানের পর কোনো সভা হয়নি, তবে আগের জেলা প্রশাসকের সময় মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ পাঠানো হয়েছিল।’
Manual8 Ad Code
তবে রাজনৈতিক গায়েবি মামলার নামে যে সব মামলা প্রত্যাহার করা হচ্ছে, এমন নয়। এসব মামলা প্রত্যাহারে অন্তর্বর্তী সরকার কিছু কঠোর নীতিমালা অনুসরণ করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে জানিয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলা হলেও যদি সেখানে সুনির্দিষ্টভাবে হত্যা, ধর্ষণ বা গুরুতর অগ্নিসংযোগের (যাতে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে) মতো অভিযোগ থাকে এবং সেগুলোর প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সেই মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হচ্ছে না।
এ ছাড়া সাবেক অনেক রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা রয়েছে। যেহেতু দুদকের নিজস্ব আইন ও স্বায়ত্তশাসন রয়েছে, তাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বিশেষ কমিটি দুদকের মামলাগুলোয় সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারছে না।
Manual6 Ad Code
মামলা প্রত্যাহারের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ অনেকের জীবনে স্বস্তি আনলেও নাজমুল মৃধার মতো ভুক্তভোগীদের মনের ক্ষত মুছে দিতে পারেনি। নাজমুল বলেন, ‘মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারছি, এটাই বড় পাওনা। কিন্তু যে বাবাকে দেখার জন্য আমি বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলাম, তাঁকে শেষ বিদায় জানাতে ডান্ডাবেড়ি পরা অবস্থায় আমাকে আসতে হয়েছে। এসব মিথ্যা মামলা শুধু আমাদের জেল খাটায়নি, আমাদের পরিবারগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছে।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, গত বছর ১৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের ফেসবুক পেজে ১৬ হাজার ৪২৯টি মামলার কথা বলা হলেও বর্তমানে এই সংখ্যা আরো বেড়েছে। পাইপলাইনে থাকা আরো অন্তত দুই হাজার ৫০০ মামলা শিগগিরই প্রজ্ঞাপন আকারে প্রত্যাহার করা হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, এটি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় পদক্ষেপ। গত দেড় দশকে বিচার বিভাগ ও পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করে যেভাবে বিরোধী মত দমনের সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছিল, এই প্রজ্ঞাপনগুলো সেই সংস্কৃতির অবসানের বার্তা দিচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু মামলা প্রত্যাহারই যথেষ্ট নয়, ভবিষ্যতে যেন আর কোনো সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে ব্যবহার করে এমন ‘গায়েবি’ মামলার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে না পারে, সে জন্য স্থায়ী আইনি সংস্কার প্রয়োজন।