মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত নতুন করে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও মানবিক পরিস্থিতিকে চাপে ফেলছে। আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ যেমন তীব্র হচ্ছে, তেমনি এই সংঘাতে যুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠন। এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে কক্সবাজার-টেকনাফ সীমান্ত, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও আশপাশের জনপদে।
সরকারের একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার বিশেষ প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। বলা হয়েছে, ড্রোন হামলা, সশস্ত্র সংঘর্ষ, অপহরণ, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান এবং ক্যাম্পভিত্তিক অপরাধমূলক তৎপরতা উদ্বেগজনক হতে পারে। প্রতিবেদনটি সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থায় প্রেরণ করা হয়েছে। পাশপাশি সীমান্তে নতুন করে মিয়ানমার নাগরিকদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি ও কোস্ট গার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর তৎপরতাসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সুপারিশও করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, গত ৬ জানুয়ারি রাখাইন রাজ্যের সিত্তে টাউনশিপের থেইন তান এলাকায় আরাকান আর্মি ড্রোন ব্যবহার করে তাতমাদাওয়ের অবস্থানে বোমা হামলা চালায়। এতে অন্তত ৮ থেকে ১০ জন সেনা আহত হয় বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ড্রোন হামলা প্রমাণ করে যে রাখাইনের সংঘাত এখন আর শুধুই গেরিলা পর্যায়ের নয়; এটি আধুনিক যুদ্ধ প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ড্রোন ব্যবহারের অর্থ হলো আরাকান আর্মি এখন কেবল স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী নয়, বরং একটি আধুনিক বিদ্রোহী বাহিনীতে রূপ নিচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তার ওপর পড়বে।
চলতি বছর ৫ জানুয়ারি মংডু জেলার টে চং ও গদুরা বাজার এলাকায় আরাকান আর্মি ক্যাম্পে হামলা চালায় রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠন এআরএ ও ইসলামিক আল-মাহাজ। এই হামলায় ৬ জন আরাকান আর্মি সদস্য এবং ১ জন এআরএ সদস্য নিহত হয়। একই দিনে রাথেডাউংয়ের কু লার চং এলাকায় আরাকান আর্মি ও আরসা সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে এই ভাঙন সীমান্তে অস্থিরতা বাড়াবে। বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চাপ আবারও তৈরি হতে পারে।
এদিকে কক্সবাজার নয়াপাড়া রেজিস্টার্ড ক্যাম্প ও ক্যাম্প-১৭ এলাকায় সম্প্রতি প্রতি সপ্তাহে অন্তত ৮টি গোলাগুলির ঘটনায় প্রায় ৬৬ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। একই সময়ে ৭টি অপহরণের ঘটনায় ৯ জনকে তুলে নেওয়া হয়, যাদের মধ্যে মাত্র দুজন মুক্তিপণের বিনিময়ে ফিরে আসে।
টেকনাফের পাহাড়ি এলাকায় ডাকাত দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৯ জানুয়ারি ডাকাত মো. হাসান গুলিবিদ্ধ হন এবং ১০ জানুয়ারি নুর কামাল ছুরিকাঘাতে নিহত হন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য, পাহাড়ি এলাকা এখন কার্যত অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে।
ক্যাম্পে বসবাসকারী এক রোহিঙ্গা নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাতে গুলির শব্দে তারা ঘুমাতে পারেন না। অপহরণ হলে পরিবার ভয়েই থানায় যেতে চায় না।
গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরাকান আর্মি এর সহায়তায় মিয়ানমার থেকে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে খাদ্য ও নিত্যপণ্য পাচার হচ্ছে মিয়ানমারে। এই মাদকের অর্থই আরাকান আর্মিরা তাদের যুদ্ধ অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে। এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) শরীফ উদ্দীন বলেন, মাদক চোরাচালান এখন শুধু অপরাধ নয়, এটি একটি সশস্ত্র সংঘাতের জ্বালানি। যতদিন এই অর্থপ্রবাহ বন্ধ না হবে, ততদিন রাখাইনের যুদ্ধও থামবে না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শত শত বাংলাদেশি পাহাড়ি যুবক আরাকান আর্মির পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে। প্রশিক্ষণ শেষে তারা অস্ত্রসহ দেশে ফিরে আসছে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। একজন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, যুদ্ধফেরত এসব যুবক ভবিষ্যতে সংঘবদ্ধ অপরাধ বা সন্ত্রাসে জড়ালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
গোয়েন্দা সূত্রমতে, আরাকান আর্মি বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতরে ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি চালাচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত নজরদারি না থাকায় এই কার্যক্রম ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
Manual1 Ad Code
সূত্র মনে করছে, মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যে দু’পক্ষের যুদ্ধ তীব্র হলে বাংলাদেশে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় বড় ধরনের সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
Manual1 Ad Code
সাম্প্রতিক কয়েকটি মর্টার শেল পড়ার পর টেকনাফে ডাকাতি ও মাদক অপরাধ পর্যটন শিল্পকে হুমকির মুখে ফেলছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আইন প্রয়োগ দুর্বল হওয়ায় অপরাধ বাড়ছে। এ প্রেক্ষিতে সংস্থাটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ দিয়েছেন। সুপারিশগুলো হচ্ছেÑ সীমান্তে মাদক-অর্থনীতি প্রবাহ ঠেকাতে গোয়েন্দা ও আর্থিক নজরদারি জোরদার করতে হবে। নিত্যপণ্য ও অস্ত্র চোরাচালানের মধ্যস্বত্বভোগীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা আবশ্যক। আরাকান আর্মির পক্ষে যুদ্ধে যাওয়া বাংলাদেশিদের তালিকা তৈরি করে বিচার করতে হবে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় স্থায়ী ক্যাম্প ও যৌথ অভিযান জোরদার করতে হবে। ড্রোন মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তি স্থাপন ও ক্যাম্পে সিসিটিভি এবং কমিউনিটি পুলিশিং সম্প্রসারণ জোরদার করতে হবে।
Manual6 Ad Code
এ বিষয়ে সাবেক আমলা ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর বলেন, রাখাইনের যুদ্ধ এখন আর কেবল মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। এর ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্ত, ক্যাম্প ও সমাজে। সময়মতো কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট ভবিষ্যতে আরও গভীর নিরাপত্তা ও মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। যার মূল্য দিতে হবে পুরো দেশকেই।