বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কড়া নজর রাখছে প্রভাবশালী তিনটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত। এই নির্বাচনকে শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই হিসেবে নয়, বরং প্রভাবশালী ত্রিশক্তির গভীর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন কূটনীতিকরা। বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত অবস্থানের কারণে এই তিনটি শক্তিই চায় নিরপেক্ষ শক্তি বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসুক। তবে প্রতিটি দেশই চায়, সম্ভাব্য বিজয়ী দল তাদের সঙ্গে ‘অত্যন্ত নিবিড়’ সম্পর্ক বজায় রেখে দেশ পরিচালনা করবে। এ জন্য নির্বাচনে যে দল বা জোট জয়ী হবে, তাদের নিয়েই ভূ-রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করতে চাইবে তারা। এ লক্ষ্যে নির্বাচনে সম্ভাব্য জয়ী দল বা দলগুলোর সঙ্গে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন এই তিন দেশের কূটনীতিকরা।
বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় প্রতিযোগিতার চিত্র ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে, যেখানে প্রতিটি শক্তি তাদের প্রভাব বজায় রাখার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু চব্বিশের গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে রাজনৈতিক দলগুলো কে-কীভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং ভূ-রাজনৈতিক কৌশলে দলগুলোর অবস্থান কী হতে পারে, তা জানার চেষ্টা করছে প্রভাবশালী এই তিন দেশ। শুধু তা-ই নয়, নতুন ভূ-রাজনৈতিক কৌশলে প্রতিদ্বন্দ্বী এই তিন পরাশক্তির কাছে কোন দল ক্ষমতায় আসবে এবং তাদের সমর্থন কোন দেশের দিকে ঝুঁকবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ জন্য নির্বাচনের আগেই প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মনোভাব বোঝার চেষ্টায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলো। এরই অংশ হিসেবে ঢাকায় নিযুক্ত এসব দেশের রাষ্ট্রদূতরা নির্বাচনে সম্ভাব্য জয়ী দল ও জোটের প্রধানদের সঙ্গে ইতোমধ্যেই বৈঠক করেছেন এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের মোহনায় বাংলাদেশ। সে কারণেই বাংলাদেশ বৃহত্তর ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় শক্তির প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে চীনকে টার্গেট করে আগামীতে মার্কিন জোটের যে অবস্থান, সেটি বাংলাদেশের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী ও বাংলাদেশের চারদিক বেষ্টিত ভারতের নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক কৌশলে তাদেরও অবস্থান পরিবর্তিত হবে। ফলে এই ত্রিশক্তির সঙ্গে সমন্বয় করে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করা নতুন সরকারের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত যেমন একে অন্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, তেমনি বাংলাদেশেও রয়েছে তাদের আলাদা আলাদা রাজনৈতিক দৃশ্যপট এবং শক্তিশালী স্বার্থ। আবার যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত–তিনটি দেশই বাংলাদেশের প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার। চীন বাংলাদেশের শীর্ষ বাণিজ্যিক অংশীদার এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর মাধ্যমে প্রধান অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্পগুলোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগকারী। ভারত বাংলাদেশকে তার নিজস্ব নিরাপত্তা এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হিসেবে দেখে, যেখানে শক্তিশালী বাণিজ্য ও জ্বালানি সহযোগিতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। সে দেশ বাংলাদেশি পোশাকের বৃহত্তম বাজার এবং বৃহত্তম বিদেশি বিনিয়োগকারী। ফলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এই দেশগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই তাদের বৈদেশিক নীতির অবস্থানকে দেশীয় রাজনৈতিক কৌশলের জন্য ব্যবহার করে। যেমন–কিছু দলকে ভারতের কাছে নতজানু, কিছু দলকে চীনপন্থি বা যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যা বৈদেশিক সম্পর্ককে একটি পক্ষপাতমূলক ইস্যুতে পরিণত করেছে। তবে কীভাবে এই নাজুক সম্পর্কগুলো এগিয়ে যায়, তা নির্বাচনের ফলাফলের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হচ্ছে।
Manual4 Ad Code
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির এ বিষয়ে জানান, বাংলাদেশের নির্বাচন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও এখানে ভু-রাজনৈতিক বাতাবরণ আছে। তাই যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত এই নির্বাচন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে রেখেছে। কারণ পরবর্তী সরকার কার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করবে, সেটি বুঝতে চাইছে এসব শক্তি।
তিনি আরও বলেন, আসন্ন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের জন্য দুটি প্রধান বাস্তবতা সামনে আসবে। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন–এক. চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং জনগণ যে আধিপত্যবাদ পছন্দ করছে না তার জলজ্যান্ত প্রমাণ আওয়ামী লীগ সরকারের পতন। বাংলাদেশ ইস্যুতে এই বিষয়টি বহিঃশক্তির জন্যও প্রযোজ্য। এটি মাথায় রেখেই সরকারকে পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করতে হবে।
Manual2 Ad Code
দুই. আগামীতে উন্নয়শীল দেশে (এলডিসি) উত্তরণ ঘটাতে যাচ্ছে বাংলাদেশের। সেখানে এই তিন পরাশক্তির সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে, যেন তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে না হয়। সে জন্য অবশ্য কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আগের কূটনৈতিক ধারায় চলবে না, কূটনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সমতা রক্ষা করে, উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে আগামী সরকারের জন্যও হবে নতুন বাস্তবতা। এ জন্য সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বহিঃশক্তি ও স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে নেগোসিয়েশনে দক্ষতা, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার দক্ষতা, সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধিসহ বাংলাদেশকে অনেক সংস্কার করতে হবে, যার দক্ষতা নির্ভর করবে নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলের ওপর।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত চেয়েছে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন যেন অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহও দেখিয়েছে তারা। ভারত তাদের এই অবস্থান আগে থেকেই জানিয়ে আসছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলো এ নিয়ে কী ভাবছে, সেটি সৌজন্য সাক্ষাৎ করে জানার চেষ্টা করছেন তাদের কূটনীতিকরা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, আসন্ন নির্বাচনে চীনের আগ্রহ তুলনামূলক বেশি, কারণ এখানে তাদের বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি। তবে বাংলাদেশের পরিবর্তিত অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের আগ্রহও বেশি থাকবে নতুন সরকারের সময়। এ জন্যই এসব দেশের কূটনীতিকরা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঘন ঘন বৈঠক করে তাদের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছেন।