প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

৪ঠা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২০শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২১শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

রপ্তানি আয়ের ক্রমাগত পতন থামছে না কেন?

editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২৬, ১০:০৭ পূর্বাহ্ণ
রপ্তানি আয়ের ক্রমাগত পতন থামছে না কেন?

Manual5 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

দেশের রপ্তানি আয়ে পতনের ধারা গত কয়েক মাস ধরে অব্যাহত রয়েছে। পতনের হার কিছুটা ছোট হলেও বিশ্ব বাজারে দুর্বল চাহিদার কারণে থামছে না এ পতন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা গত ডিসেম্বরে ছিল ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের (২০২৫–২৬) জুলাই–জানুয়ারি সময়ে রপ্তানি আয় ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ কমেছে। জুলাই-ডিসেম্বর মাসে পতনের হার ছিল ২ দশমিক ১৯ শতাংশ।

ধারাবাহিক হ্রাস রপ্তানিকারীদের উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। যদি এই নেতিবাচক প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহলে ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা হারাতে পারে বলে মনে করছেন রপ্তানিকারকরা।

প্রধান খাতগুলো, যেমন তৈরি পোশাক ও কৃষিপণ্য উল্লেখযোগ্য হ্রাসের মুখোমুখি হয়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি ও সরবরাহ চেইনের জটিলতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

 

অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, যদি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া না হয়—যেমন বাজার বৈচিত্র্য বাড়ানো, সরবরাহ চেইন উন্নত করা এবং মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদন বাড়ানো—তাহলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের রপ্তানি কার্যক্রম ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

Manual4 Ad Code

 

রপ্তানি আয়ের চিত্র

Manual8 Ad Code

২০২৬ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে তা ছিল ৪ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার।

সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়
চলতি অর্থবছরের জুলাই–জানুয়ারি সময়ে দেশের মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ২৮ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪–২৫ অর্থবছরের একই সময়ের ২৮ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ কম। ফলে এই সময়ে মোট রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।

দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প থেকে জুলাই–জানুয়ারি ২০২৫–২৬ সময়ে আয় হয়েছে ২২ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের ২৩ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ কম। এর মধ্যে নিটওয়্যার পণ্যের রপ্তানি কমে ১২ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে, যেখানে আগের বছর ছিল ১২ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ৩ দশমিক ১৩ শতাংশ হ্রাস হয়েছে এবং ওভেন পণ্যের রপ্তানি ১০ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা আগের বছরের ১০ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১ দশমিক ৬০ শতাংশ কম।

Manual2 Ad Code

 

জীবিত ও হিমায়িত মৎস্য রপ্তানি চলতি সময়ে বেড়ে ২৯৭ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আগের বছর একই সময়ে তা ছিল ২৮৩ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এ খাতে ৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর মধ্যে চিংড়ি রপ্তানি ২০২৫–২৬ সালে ২০৩ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪–২৫ সালের ১৯৭ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৩ দশমিক ০৩ শতাংশ বেশি।

 

Manual1 Ad Code

কৃষিপণ্যের রপ্তানি চলতি সময়ে কমে ৬০৭ দশমিক ২৮ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যেখানে আগের বছর ছিল ৬৭৪ মিলিয়ন ডলার। ফলে এ খাতে ৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।

 

রপ্তানি আয় কমছে কেন?

ওষুধ শিল্পে রপ্তানি আয় ২০২৫–২৬ সময়ে ১৩৯ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা আগের বছরের ১৩২ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৫ দশমিক ০৩ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। তবে প্লাস্টিকপণ্যের রপ্তানি ১৭৪ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যেখানে আগের বছর ছিল ১৮২ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ এ খাতে ৪ দশমিক ৩২ শতাংশ হ্রাস হয়েছে।

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতে চলতি সময়ে মোট রপ্তানি হয়েছে ৭০৭ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪–২৫ সালের ৬৬৯ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৫ দশমিক ৭১ শতাংশ বেশি হলেও খাতভিত্তিক চিত্রে ভিন্নতা রয়েছে। চামড়া রপ্তানি ৭১ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যেখানে আগের বছর ছিল ৭৪ মিলিয়ন ডলার। ফলে ৩ দশমিক ৪২ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

অন্যদিকে চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়ে ২২৯ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের ১৯২ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১৯ দশমিক ২০ শতাংশ বেশি এবং চামড়ার জুতা রপ্তানি সামান্য বেড়ে ৪০৭ মিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা আগের বছরের ৪০৩ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় ০ দশমিক ৯৬ শতাংশ বেশি।

পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি ২০২৫–২৬ সময়ে ৪৯৪ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪–২৫ সালের ৪৮৪ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১ দশমিক ৯৭ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে পাট সুতা ও টুইনের রপ্তানি বেড়ে ৩১৪ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের ২৭১ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১৬ দশমিক ০২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে।
বিশেষায়িত টেক্সটাইল রপ্তানি অবশ্য চলতি সময়ে কমে ২১২ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে, যেখানে আগের বছর ছিল ২৩০ মিলিয়ন ডলার, ফলে এখানে ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।

হোম টেক্সটাইল খাতে রপ্তানি আয় বেড়ে ৫১০ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আগের বছর ছিল ৪৯৪ মিলিয়ন ডলার। ফলে ৩ দশমিক ২৬ শতাংশ ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। তবে নন-লেদার জুতার রপ্তানি কমে ৩১২ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে, যা আগের বছরের ৩১৮ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় ২ দশমিক ০৬ শতাংশ হ্রাস।

বাইসাইকেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ৮৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যেখানে আগের বছর ছিল ৬৩ মিলিয়ন ডলার। ফলে এ খাতে ৩১ দশমিক ১২ শতাংশ শক্তিশালী ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।

 

কেন নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামিম এহসান বলেন, ‘দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি মূলত বিশ্ব বাজারে দুর্বল চাহিদার কারণে নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ট্যারিফ নীতি বিশ্ব রপ্তানি বাজারে উল্লেখযোগ্য ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছে। ফলে বাংলাদেশের যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে রপ্তানিতেও প্রভাব পড়েছে। বিশ্বব্যাপী দুর্বল চাহিদা, ইউরোপীয় বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ক্রেতারা কম অর্ডার দিয়েছেন, যা সামগ্রিক রপ্তানিকে প্রভাবিত করেছে।’

ফজলে শামিম এহসান আরও উল্লেখ করেন, ‘এই পরিস্থিতি আগামী কয়েক মাসও চলতে পারে। তবে যদি একটি সুষ্ঠু ও স্বাধীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং নির্বাচিত সরকার গঠিত হয়, তাহলে রপ্তানি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হতে পারে।’

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। বাংলাদেশ এখনো মূলত সাধারণ, কম মূল্যের পণ্যের ওপর জোর দেওয়ায় মূল্য নির্ধারণে সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘একই সময়ে, প্রতিযোগীরা বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ও অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত বাজার, যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অনৈতিহ্যবাহী বাজারে আরও আগ্রাসী হয়ে উঠেছে, যেখানে বাংলাদেশ আগের মতো শক্তিশালী অবস্থান রাখতে পারছে না।’

 

রুবেল বলেন, ‘বাজার ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর পাশাপাশি উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্যের দিকে কৌশলগত পরিবর্তন অত্যন্ত প্রয়োজন, যা প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করবে। বর্তমানের মতো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি, যাতে রপ্তানিতে ভালো পারফরম্যান্স নিশ্চিত করা যায়।

রপ্তানি ইতিবাচক ধারায় ফেরাতে করণীয়

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, রপ্তানির নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মূল কারণ চাহিদা ও সরবরাহ- উভয় দিকের চ্যালেঞ্জ। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বাজারে চাহিদা কমেছে। একই সঙ্গে চীনা ও ভারতীয় পণ্য ইউরোপে আগ্রাসীভাবে বিক্রি হওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি মার্জিন কমেছে। সরবরাহ ক্ষেত্রে লজিস্টিকস, জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিও সমস্যা সৃষ্টি করেছে।’

তিনি মনে করেন, ‘পজিটিভ গ্রোথ ফিরিয়ে আনার জন্য প্রথমে বাজার বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, উচ্চমূল্য সংযোজন ও মানোন্নত পণ্যে ফোকাস করতে হবে। তৃতীয়ত, সরবরাহ চেইনের সমস্যা কমাতে হবে, যেমন লজিস্টিকস ও জ্বালানি খরচ নিয়ন্ত্রণ। পাশাপাশি সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনার মাধ্যমে রপ্তানিকারীদের সক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে।’

ড. হোসেন আশাবাদী যে, নির্বাচনের পরে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে এবং বাজার চাহিদা পুনরায় বাড়লে রপ্তানি খাত ধীরে ধীরে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে ফিরতে পারবে। সেক্ষেত্রে পদক্ষেপ নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে ট্যারিফ সংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধান করতে এবং শুল্ক আরও কমাতে আলোচনা করা জরুরি। একই সময়ে বন্দরের সক্ষমতা উন্নত করা ও আইন-শৃঙ্খলা সঠিক পথে ফেরাতে পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ক্রেতাদের আস্থা পুনঃস্থাপন করা প্রয়োজন।’

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code