অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে নেওয়া মেগা প্রকল্প অনুমোদন এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বেশকিছু চুক্তি করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেয় সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার শেষ সময়ে এটা করতে পারে কি না বা কার স্বার্থে তড়িঘড়ি করে এসব করা হয়েছে তা নিয়েও নানা আলোচনা চলছে।
অথচ এই সরকারের প্রথম একনেক সভায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, এখন থেকে মেগা প্রকল্প না নিয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ ছোট প্রকল্প নেওয়া হবে। তার এ বক্তব্যে সরকারের একাধিক উপদেষ্টা একই সুরে কথা বলেন। কিন্তু গত ২৫ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) দুটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব সভায় ৪৭টি প্রকল্প বাস্তবায়েনে ৯১ হাজার ৬১১ কোটি টাকা খরচ করার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়।
সাধারণত রাজনৈতিক সরকারের আমলে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর একনেক সভা বন্ধ থাকত। কিন্তু এই সরকারের আমলে তফসিল ঘোষণার পরও একনেক সভায় এক সপ্তাহে একাধিক মেগা প্রকল্প অনুমোদন দিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে। নির্বাচনের আর বাকি এক সপ্তাহ। এই সময়েও কয়েকটি দেশের সঙ্গে হতে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু চুক্তি। এর মধ্যে নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি টোকিওতে সই হবে। আর ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে সই হওয়ার কথা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির কাঠামো নিয়ে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ১৪টি কেনার চুক্তি আগামী সপ্তাহে করতে যাচ্ছে এই সরকার।
এদিকে গত ২৭ জানুয়ারি বাংলাদেশে সামরিক ড্রোন তৈরির কারখানা নির্মাণে চীনের সঙ্গে চুক্তি করে ঢাকা। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৬০৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এক প্রকার কাউকে না জানিয়েই চীনের সঙ্গে চুক্তিটি সই হওয়ায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হলো, একনেক সভায় পাস হয় ‘ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ’ প্রকল্প। এতে ব্যয় ধরা হয় ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা। ভোটের আগে এত বড় অঙ্কের প্রকল্প অনুমোদন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক–দুই দিক থেকেই বিতর্কিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। শুধু তা-ই নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশে জ্বালানি তেল শোধনাগার বা রিফাইনারি নির্মাণ ব্যয়ের তুলনায় ইস্টার্ন রিফাইনারির প্রকল্প বাস্তবায়নে যে খরচ ধরা হয়েছে, তা অনেক বেশি বলেও মনে করেন তারা।
অভিযোগ উঠেছে, জাতীয় নির্বাচনের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে তড়িঘড়ি করে অস্বচ্ছ ও শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষদিকে এসে দ্রুতগতিতে দীর্ঘমেয়াদি নানা সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের হাত বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনালের কার্গো কার্যক্রম পরিচালনার সম্ভাব্য চুক্তি। এর আগে গত নভেম্বরে ৫৫০ মিলিয়ন ডলারে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে ৩৩ বছরের চুক্তি করা হয়। একই সময়ে সুইজারল্যান্ডের মেডলগ এসএ ২২ বছরের চুক্তিতে পানগাঁও নদীবন্দর পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর মেডলগের নিয়োগটি উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে হলেও লালদিয়া ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের ক্ষেত্রে সে ধরনের কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
বন্দরসংক্রান্ত চুক্তির পাশাপাশি সরকার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বড় একটি ক্রয় প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে এবং ১১৮ জন ঊর্ধ্বতন আমলাকে পদোন্নতি দিচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত এয়ারলাইনসটির বোর্ডে নতুন করে তিনজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তারা হলেন–জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও রোহিঙ্গাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব এবং নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। এ ছাড়া বোয়িং চুক্তি নির্বিঘ্ন করতে বিমানের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালককে একটি অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে–এই সরকারের সময়ে নয়, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বোয়িং চুক্তিতে তার সম্মতি ছিল।
Manual4 Ad Code
অর্থনীতিবিদদের মতে, ড. ইউনূস সরকার ওয়াশিংটনের সঙ্গে এক উচ্চঝুঁকিপূর্ণ কূটনৈতিক স্বস্তি আদায় করেছে। বাংলাদেশের এই স্বস্তির জন্য মূল্যও দিতে হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষদিকে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিসহ বহু বিলিয়ন ডলারের এক চুক্তিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের এয়ারবাসের মধ্যে তুলনামূলক বিশ্লেষণ ছাড়াই এই চুক্তি করা হচ্ছে। নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে বিমানের বোর্ডেও হঠাৎ রদবদল করা হয়, যা শাসনব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
Manual3 Ad Code
Manual2 Ad Code
এদিকে রাষ্ট্রনিযুক্ত একটি কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, কেবলমাত্র এই বর্ধিত বেতন কার্যকর হলেই ইতোমধ্যে দুর্বল অবস্থায় থাকা সরকারি অর্থব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। সবমিলিয়ে এসব দায় ভবিষ্যতের নির্বাচিত নেতৃত্বের কাঁধে এমন আর্থিক ও রাজনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়াবে, যে বোঝা তৈরিতে তাদের কোনো ভূমিকাই ছিল না।
Manual7 Ad Code
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘এখন সময় গণনা শুরু হয়ে গেছে। সরকারের সময় ফুরিয়ে আসছে। তাদের উচিত ছিল, যে সংস্কারের প্রতিশ্রুতিগুলো তারা দিয়েছিল, সেগুলো সম্পন্ন করার দিকে মনোযোগ দেওয়া। তিনি প্রশ্ন তোলেন, শেষ সময়ে নেওয়া এই সিদ্ধান্তগুলো কি পুরো সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছে, নাকি ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে ব্যক্তিগত স্বার্থ নিশ্চিত করতে চাওয়া নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠী এগুলো করাচ্ছে?’ তিনি বলেন, ‘এসব কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। এমনকি অংশীজন বা পেশাগত আলোচনারও ঘাটতি আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যারা ক্ষমতায় আসতে চান, তাদের জীবন কঠিন করে তুলবে এমন বিষয়েও যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ায় আমি বিস্মিত।’
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ মনে করেন, ‘বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এসব চুক্তিতে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং যেসব পদ্ধতিতে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে, সেগুলো পতিত শাসনামলের মতোই মনে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘শেষ মুহূর্তে এমন তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক দল ও জনগণের মতামত উপেক্ষা করা আগের স্বৈরাচারী শাসনের কথা মনে করিয়ে দেয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংস্কার ও স্থিতিশীল করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। অথচ আমরা দেখছি, সরকার নিজেই সেই সংস্কার মানছে না।’
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, ‘এই সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়, তাই তারা সাধারণ সরকারের মতোই কাজ করতে পারে। তবে এই সরকার শেষ সময়ে যেসব মেগা প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে সেগুলো পরবর্তী সরকার পর্যালোচনা করতে পারে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীনসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে যেসব অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ চুক্তি করেছে বা করতে যাচ্ছে এগুলো অনেকদিন ধরেই আলোচনা চলছে। এসব চুক্তির ব্যাপারে সরকারের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া ছিল।’