প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৩ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

জ্বালানি তেল ক্রমশ রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে

editor
প্রকাশিত এপ্রিল ৬, ২০২৬, ১০:৫০ পূর্বাহ্ণ
জ্বালানি তেল ক্রমশ রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে

Manual7 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে যুদ্ধের দামামা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই এর উত্তাপ এসে লেগেছে বাংলাদেশের তেলের বাজারে। ফলে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করার পর দুই মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই এক চরম সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে প্রশাসন। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি আর সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতায় দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের হাহাকার তৈরি হয়েছে, যা এখন কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বারবার জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুতের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন, ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি আর সাধারণ মানুষের ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অসাধু চক্রকে দমনে দৃঢ়তা দেখাতে না পারলে এই সংকট সরকারের জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের ধস নামাতে পারে। আগামী পাঁচ বছরের স্থিতিশীল শাসনের পথ প্রশস্ত করতে হলে এই মুহূর্তে জ্বালানি খাতকে নিয়ন্ত্রণে আনা সরকারের জন্য এক বড় অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

গত কয়েকদিন রাজধানীর কল্যাণপুর, গাবতলী, তেজগাঁও এবং শাহবাগের পাম্পগুলো ঘুরে দেখা গেছে, শত শত যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছে মাত্র কয়েক লিটার তেলের জন্য। তেলের এই অভাব কেবল যাতায়াতে নয়, মানুষের সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও নাড়িয়ে দিয়েছে।
সরবরাহ কম থাকায় গ্রাহক ও বিক্রেতাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা এখন নিত্যদিনের ঘটনা।

Manual5 Ad Code

তেলের অভাবে বিশৃঙ্খলা ও মারামারিতে এরই মধ্যে দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ঢাকার বাইরে থেকে পণ্য পরিবহনেও সংকটের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

Manual5 Ad Code

রাইড শেয়ারিং অ্যাপের চালকরা জানাচ্ছেন, আগে পাম্পে গিয়ে চাহিদা অনুযায়ী তেল পাওয়া যেত, এখন খুঁজতে হয় কোন পাম্পে তেল দিচ্ছে।
আগে তাদের ৮ ঘণ্টা কাজ করে যা আয় হতো, এখন ১৫ ঘণ্টাতেও এর অর্ধেক আয় হয় না বলে জানা তারা। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত ক্রয়ের কথা বলা হলেও সাধারণ মানুষ এটিকে সরবরাহ ব্যবস্থার বড় ব্যর্থতা হিসেবেই দেখছে। তেলের এই অঘোষিত সংকট জনজীবনে এক গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে যা সামাজিক অস্থিরতাকে উসকে দিচ্ছে।

এদিকে গত ২ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের জানান, দেশে বিদ্যুতের বড় কোনো ঘাটতি নেই, তবে জ্বালানি সংকটের কারণে মাঝে মাঝে বিভ্রাট হতে পারে যা সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। পরবর্তীতে সিরাজগঞ্জে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “কালোবাজারিরা তেলের মজুত তৈরি করে সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
আমি সারাদেশে জেলা প্রশাসক, এসপিদের সাথে কথা বলেছি। তারা মনিটর করছে। তবে হঠাৎ করে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার মধ্যে দুর্নীতি আছে, ব্ল্যাক মার্কেটিং হচ্ছে। সিরাজগঞ্জে ইতোমধ্যে দুটি চক্র ধরা পড়েছে।”

মন্ত্রী আরও জানান যে, সরকার ঢাকা মহানগরীর মোটরসাইকেল চালকদের জন্য কিউআর কোড সিস্টেম চালুর প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যাতে কেউ এক পাম্প থেকে বারবার তেল সংগ্রহ করতে না পারে। সরকার বর্তমানে প্রতিদিন ১৬০ কোটি টাকা জ্বালানি ভর্তুকি দিচ্ছে জানিয়ে তিনি জনগণকে সাশ্রয়ী হওয়ার এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল না কেনার আহ্বান জানান। তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে সরবরাহ লাইন ঠিক থাকলেও অস্বাভাবিক ডিমান্ড বা চাহিদা মেটানো সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মোট চাহিদার বড় অংশ আমদানিনির্ভর হলেও পেট্রোল ও অকটেনের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন, যা বর্তমান সংকটকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেনের মতে, দেশে ব্যবহৃত পেট্রোল ও অকটেনের প্রায় ৭০ শতাংশই স্থানীয়ভাবে কনডেনসেট থেকে উৎপাদন করা হয়। সিলেটের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে পাওয়া উপজাত হাইড্রোকার্বন প্রক্রিয়াজাত করে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড (এসজিএফএল) এবং কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারি দেশের চাহিদার বড় অংশ পূরণ করে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশীয় কনডেনসেট থেকে ২ লাখ মেট্রিক টনের বেশি পেট্রোল উৎপাদিত হয়েছে, যা আমদানির ওপর নির্ভরতা প্রায় শূন্যে নামিয়ে এনেছে। তা সত্ত্বেও কেন পাম্পগুলোতে পেট্রোল ও অকটেনের জন্য কিলোমিটার জুড়ে লাইন লাগছে, তা নিয়ে জনমনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডিজেলের অভাব থাকলেও পেট্রোল-অকটেনের এই হাহাকার সম্পূর্ণভাবেই কৃত্রিম এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারকে শুরুতেই বেকায়দায় ফেলতে কোনো একটি প্রভাবশালী মহল বা সিন্ডিকেট পরিকল্পিতভাবে তেলের সরবরাহ আটকে দিচ্ছে কি না, তা গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। কারণ, আবাসিক ভবন বা গোয়ালঘর থেকে হাজার হাজার লিটার তেল উদ্ধার হওয়া কেবল মুনাফার জন্য নয়, বরং সরকারকে অস্থিতিশীল করার একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্রও হতে পারে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম. তামিম মনে করেন, অতীতে জ্বালানি মজুত নিয়ে ভুল তথ্য দেওয়ার কারণে জনগণের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, যা প্যানিক বায়িংকে উসকে দিচ্ছে।

তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বর্তমান সংকটকে বহুমাত্রিক বলে অভিহিত করেছেন এবং সরকারের তদারকির অভাবকে দায়ী করেছেন। তাদের মতে, সরকারের উচিত তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যাতে গুজব না ছড়ায়। তেলের অবৈধ মজুত ও পাচার ঠেকাতে ৯টি জেলায় বিজিবি মোতায়েন এবং ফিলিং স্টেশনগুলোতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগের সিদ্ধান্তকে বিশেষজ্ঞরা স্বাগত জানালেও এর কঠোর প্রয়োগ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পেছনে অসাধু সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের গন্ধ সরকারও পাচ্ছে। ৪ এপ্রিল দুপুরে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার ধাওড়া গ্রামে এক অনুষ্ঠানে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, “তেল সংকট কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হচ্ছে। প্রয়োজনবোধে আমরা সেই শাস্তি প্রয়োগ করব এবং যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।” একটি শ্রেণি অস্থিতিশীলতা তৈরির জন্য একই মোটরসাইকেল দিয়ে একদিনে একাধিক স্থান থেকে তেল নিচ্ছে, পরে সেই তেল বাসায় এনে বোতল বা ড্রামে মজুত করছেন এবং আবার তেল নিতে আসছেন বলেও জানান মন্ত্রী।

মন্ত্রী আরও বলেন, “আমরা এতদিন নমনীয় ছিলাম। তবে প্রয়োজন হলে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫ ধারা অনুযায়ী কালোবাজারি ও মজুতদারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।” আইনমন্ত্রীর এই বক্তব্যে স্পষ্ট যে, সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রয়োজনে চরম কঠোর হতে পিছপা হবে না। তিনি প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা তদবির অসাধু ব্যবসায়ীদের বাঁচাতে পারবে না।

Manual2 Ad Code

জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের প্রাণ কৃষিখাতে। বর্তমানে বোরো ধানের দানা গঠনের অত্যন্ত সংবেদনশীল সময় চলছে, যখন জমিতে নিয়মিত সেচ দেওয়া অপরিহার্য। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে সেচ পাম্প চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল মিলছে না বলে অভিযোগ করছেন প্রান্তিক কৃষকরা। অনেক জায়গায় পাম্প মালিকরা কৃষকদের মাত্র ১০ লিটার করে ডিজেল দিচ্ছেন, যা দিয়ে বিঘার পর বিঘা জমির সেচ দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই মুহূর্তে পানির ঘাটতি হলে ধানের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে, যার ফলে সামনে ভয়াবহ খাদ্য সংকট তৈরি হতে পারে। যদিও সাম্প্রতিক বৃষ্টির কারণে কৃষকদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি এসেছে, কিন্তু ডিজেল চালিত ট্রাক্টর ও মাড়াই যন্ত্রের অভাবে ফসল কাটা নিয়েও দুশ্চিন্তা কাটছে না। যদি ডিজেল সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হয়, তবে গ্রামীণ অর্থনীতি এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় অনেক চাষি আমগাছে দরকারি স্প্রে পর্যন্ত করতে পারছেন না, যার প্রভাব পড়বে দেশের ফল উৎপাদনেও।

কেবল রাজপথ বা কৃষিখাতেই নয়, জ্বালানি তেলের অভাব দেশের বড় বড় শিল্পকারখানার উৎপাদনকেও স্থবির করে দিচ্ছে। দেশের ইস্পাত খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম-এর মতো কারখানায় প্রতিদিন ৩৫ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হলেও তারা চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছে না। এর ফলে রড উৎপাদনের যন্ত্রপাতি ও পণ্যবাহী ট্রাকগুলো বন্ধ হয়ে পড়ছে, যা নির্মাণ খাতের ওপর চড়া প্রভাব ফেলছে।

তৈরি পোশাক শিল্প, যা দেশের প্রধান রফতানি খাত, তা-ও এখন জেনারেটর চালানোর ডিজেল সংকটে ধুঁকছে। শিল্প মালিকরা আশঙ্কা করছেন যে, যদি তেলের সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হয় তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দেওয়া সময়মতো ডেলিভারি নিশ্চিত করা যাবে না, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধাক্কা দেবে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও তেলের অভাবে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা ব্যাপক হারে কর্মসংস্থান হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের চাহিদা বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন, যার বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানিনির্ভর। ইরান যুদ্ধের প্রলয়ংকরী প্রভাবে পারস্য উপসাগরের প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত জাহাজ চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় বাংলাদেশের সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধাক্কা খেয়েছে। জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে বর্তমানে তিনটি ক্রুড অয়েলের চালান আটকা পড়ে আছে, যার ফলে দেশের একমাত্র শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি কাঁচামাল সংকটে পড়েছে।

মার্চের শেষ দিকে এই শোধনাগারের মজুত মাত্র ৩০ হাজার মেট্রিক টনে নেমে এসেছিল, যা দিয়ে পূর্ণ সক্ষমতায় মাত্র এক সপ্তাহ চলা সম্ভব। জ্বালানি বিভাগের সূত্রে জানা যায়, এপ্রিলের মাঝামাঝি বিকল্প রুটে এক লাখ টন তেল আসার কথা থাকলেও সরবরাহ চেইনে ১০-১২ দিনের একটি ‘গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে সরকার এখন মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং কাজাখস্তান থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে জ্বালানি আমদানির জরুরি উদ্যোগ নিয়েছে।

সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে একগুচ্ছ জরুরি সাশ্রয় নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। ৫ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া নতুন সময়সূচি অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি অফিসের কর্মঘণ্টা সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলম ৩ এপ্রিল সকালে টাঙ্গাইলে এক অনুষ্ঠানে জানান যে, সরকার আগামী তিন মাসের আগাম পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে এবং তেলের আমদানি স্বাভাবিক রাখতে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

এদিকে ৪ এপ্রিল ফরিদপুরের সালথায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, “পৃথিবীর সব দেশে তেলের দাম বাড়লেও বিএনপি সরকার দাম বাড়ায়নি। মানুষ যেন আতঙ্কে অতিরিক্ত তেল না কেনে, সেই অনুরোধ জানাই।” এছাড়াও জাতীয় সংসদে চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম জানান যে, প্রধানমন্ত্রী নিজে বাহুল্য খরচ কমাতে নিজের বহর কমিয়ে দিয়েছেন এবং এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রির নিচে না নামানোর নির্দেশ দিয়েছেন। সরকার ইতোমধ্যেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে খরচ ৩০ শতাংশ কমানোর এবং বিয়ে বা উৎসবে আলোকসজ্জা নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে সরকারের ওপর ভর্তুকির এক বিশাল বোঝা চেপে বসেছে। চলতি অর্থবছরে জ্বালানি ও এলএনজি আমদানিতে সরকার অতিরিক্ত ২৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দিতে বাধ্য হয়েছে। এর মধ্যে ১৭ হাজার কোটি টাকাই যাচ্ছে এলএনজি আমদানির খরচ মেটাতে, যা আগে মাত্র ৬ হাজার কোটি টাকা ছিল। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন যে, উচ্চ মূল্যে বিদেশ থেকে তেল আমদানি করতে গিয়ে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকার ভর্তুকির চাপ কমাতে বিদ্যুতের দাম ১০ থেকে ২০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে, যা কার্যকর হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এবং পাইকারি বাজারের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকার এখন একদিকে ভর্তুকির বোঝা আর অন্যদিকে জনসন্তুষ্টি রক্ষার এক দোটানায় অবস্থান করছে, যা থেকে উত্তরণ অত্যন্ত কঠিন।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ একা নয়, বরং বিশ্বের অনেক দেশই এখন বিভিন্ন উদ্ভাবনী সাশ্রয় নীতি গ্রহণ করেছে। শ্রীলঙ্কা ইতোমধ্যে কিউআর কোড ভিত্তিক রেশনিং সফলভাবে প্রয়োগ করেছে, যা প্যানিক বায়িং বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। ফিলিপাইন সরকার জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে পরিবহন খাতের জন্য ২০ বিলিয়ন পেসোর বিশেষ তহবিল গঠন করেছে এবং ৪ দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে। ভারত সরকার পেট্রোল ও ডিজেলের ওপর ১০ টাকা শুল্ক কমিয়ে জনগণের স্বস্তি নিশ্চিত করেছে এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ঠিক রাখতে ডিজেল রপ্তানিতে শুল্ক বসিয়েছে।

Manual1 Ad Code

চীন তাদের বিশাল কৌশলগত রিজার্ভ থেকে বাজার সামাল দিচ্ছে এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় কয়লা ও নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদেরও দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সমুদ্রসীমায় গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে নজর দিতে হবে। সাময়িকভাবে সংকট কাটাতে কাজাখস্তান বা রাশিয়ার মতো বিকল্প উৎস থেকে জিটুজি পদ্ধতিতে তেল আনা যেতে পারে যা সরকার বর্তমানে চেষ্টা করছে।

ক্ষমতার মাত্র দুই মাসের মাথায় এই জ্বালানি সংকট সরকারের প্রশাসনিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে হাজির হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, পাম্পের দীর্ঘ লাইন কেবল তেলের অভাব নয়, বরং সাধারণ মানুষের মনের মধ্যে দানা বাঁধা অনিশ্চয়তা ও আস্থার সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ।

আইনমন্ত্রী যে কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তার নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং সিন্ডিকেট দমনে সরকারের সফলতা বা ব্যর্থতার ওপরই নির্ভর করবে তাদের জনপ্রিয়তার ভবিষ্যৎ। ৫ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া সাশ্রয় নীতি যদি দীর্ঘায়িত হয় এবং মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ব্যাহত করে, তবে তা জনমনে অসন্তোষের জন্ম দিতে পারে।

সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং কিউআর কোড ভিত্তিক সুষম বণ্টন ব্যবস্থার দ্রুত বাস্তবায়নই এখন জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রধান উপায় হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বৈশ্বিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপট এবং অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র, কারণ যাই হোক না কেন, সাধারণ মানুষ দিনশেষে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং স্থিতিশীল বাজার প্রত্যাশা করে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি সরকারকে তাদের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে এবং আগামী ৫ বছর সফলভাবে দেশ পরিচালনা করতে হলে এই সংকটকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মোকাবিলা করতে হবে। সরকারের আগামী দিনগুলোর পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে তারা জনগণের দেওয়া এই গুরুদায়িত্ব পালনে কতটা সফল হবে। তেলের এই সংকট সমাধান করতে না পারলে তা কেবল অর্থনীতির নয়, বরং নতুন সরকারের স্থিতিশীলতার ওপরও বড় ধরণের ছায়া ফেলতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহল ধারণা করছেন।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code