যুদ্ধ চললে ডিজেল-অকটেনে ভর্তুকি লাগবে ৩০ হাজার কোটি টাকা
যুদ্ধ চললে ডিজেল-অকটেনে ভর্তুকি লাগবে ৩০ হাজার কোটি টাকা
editor
প্রকাশিত এপ্রিল ৭, ২০২৬, ১১:৫৯ পূর্বাহ্ণ
Manual6 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান দুই অনুষঙ্গ ডিজেল ও অকটেন। এর মধ্যে ডিজেলের প্রায় পুরোটাই এবং অকটেনের চাহিদার অর্ধেক বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যে তেল কিনে দেশের বাজারে সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ করতে দীর্ঘদিন ধরে এ খাতে ভর্তুকি দিয়ে আসছে সরকার।
Manual6 Ad Code
তবে, সম্প্রতি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মূল্য সমন্বয় করা না হলে কেবল ডিজেল ও অকটেনেই সংস্থাটির ভর্তুকি লাগবে ৩০ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা।
দেশে জ্বালানি তেল ক্রয়, আমদানি ও বাজারজাতকরণের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হলো বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামার ওপর ভিত্তি করেই মূলত এই প্রতিষ্ঠানের লাভ-লোকসান নির্ধারিত হয়। গত কয়েক বছর বিশ্ববাজারে তেলের দাম তুলনামূলক কম থাকায় জ্বালানি তেল বিক্রি করে ধারাবাহিকভাবে মুনাফা করে আসছে বিপিসি।
Manual1 Ad Code
২০২৪-২৫ অর্থবছরে জ্বালানি তেল বিক্রি করে বিপিসি ৪ হাজার ২১৬ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এটি এর আগের অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২৭৩ কোটি টাকা বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সংস্থাটির নিট মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা।
বিগত অর্থবছরে বিপিসি মোট ৬২ লাখ ১৫ হাজার ৯২৯ টন জ্বালানি তেল আমদানি করেছে, যার পেছনে খরচ হয়েছে ৫০ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে
১৫ লাখ ১০ হাজার ৯৪৪ টন ক্রুড অয়েল কিনতে খরচ হয়েছে ১০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা।
Manual1 Ad Code
অন্যদিকে, ৪৭ লাখ ৪ হাজার ৯৮৫ টন পরিশোধিত তেল (ডিজেল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও কেরোসিন) আমদানিতে খরচ হয়েছে ৩৯ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ডিজেল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও কেরোসিন বাবদ খরচ হয়েছে ৩৬ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। আর ফার্নেস অয়েল ও মেরিন ফুয়েল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা।
তবে, ২০২২ সালে ডলার সংকট এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ দেখিয়ে দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে ৪৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। তখন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বিশ্ববাজারে দাম কমলে দেশের বাজারেও তা কমানো হবে। তবে, দীর্ঘ সময় দাম না কমায় বিপিসির মুনাফার পাল্লা ভারী হতে থাকে। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে দেশে জ্বালানি তেলের দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয়ের প্রক্রিয়া শুরু করে সরকার।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজার চরম অস্থির হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ছিল ৬৭ ডলার, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৮ ডলারে। শুধু অপরিশোধিত তেলই নয়, পরিশোধিত ডিজেলের দামও এখন আকাশচুম্বী। সিঙ্গাপুর বেঞ্চমার্ক অনুযায়ী, প্রতি ব্যারেল ডিজেলের দাম ৮০-৯০ ডলার থেকে লাফিয়ে ১৪৩-১৫০ ডলারে পৌঁছেছে।
বিশ্ববাজারে দামের এই ঊর্ধ্বগতি সত্ত্বেও চলতি মাসে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে সরকার। তবে, এর ফলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) ওপর আর্থিক চাপ তীব্র হচ্ছে। বিপিসির তথ্যমতে, বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে খরচ পড়ছে ২০৩ টাকা ৮৪ পয়সা। অথচ খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১০০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি লিটারেই লোকসান হচ্ছে ১০৩ টাকা ৮৪ পয়সা।
অন্যদিকে, প্রতি লিটার অকটেন আমদানিতে খরচ হচ্ছে ১৫১ টাকা ৬১ পয়সা, যা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। এখানে প্রতি লিটারে লোকসান ৩১ টাকা ৬১ পয়সা।
Manual6 Ad Code
চলতি বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিপিসি ২৪ লাখ ৪ হাজার ৫০০ টন ডিজেল এবং ২ লাখ ১৯ হাজার ৫০০ টন অকটেন বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বর্তমান বাজারমূল্য বজায় থাকলে কেবল ডিজেলেই লোকসান হবে ২৯ হাজার ৬১২ কোটি টাকা এবং অকটেনে ৯৪৯ কোটি টাকা। ফলে আগামী ছয় মাসে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা না হলে সরকারকে মোট ৩০ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি না করলেও সরকারকে বিশাল অঙ্কের আর্থিক দায়ভার বহন করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার ফলে চতুর্মুখী চাপ থাকা সত্ত্বেও সরকার এখনই তেলের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা করেনি। তিনি বলেন, ‘জনগণের দুর্ভোগ যাতে কোনোভাবেই না বাড়ে, সেটি নিশ্চিত করতে প্রতিদিন সরকার জ্বালানি খাতে ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে।’
তবে, বিশ্ববাজারের এই অস্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হলে দাম বাড়ানোর একটি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি সম্প্রতি এক বক্তব্যে বলেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং বৃহত্তর স্বার্থে একটি পর্যায়ে গিয়ে আমাদের হয়তো জ্বালানির দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।’
সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বদরুল ইমাম বলেন, ‘ভর্তুকি মূলত দেওয়া হয় জনগণকে স্বস্তি প্রদানের জন্য। সরকার যদি এই ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে, তবে তা অবশ্যই ইতিবাচক।’
‘সরকার মূল্য সমন্বয়ের কথা ভাবলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণের প্রতি সরকারের সহযোগিতামূলক আচরণ বজায় রাখা উচিত’— যোগ করেন তিনি।