ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের দালিলিক প্রমাণ নেই বলে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের মন্তব্যকে ঘিরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও বিভিন্ন মহল থেকে তার অপসারণের দাবি উঠেছিল গত বছরের অক্টোবর মাসে। বিষয়টি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপ তৈরি হলে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে তখন পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল সরকার। কিন্তু ১০ মাস পর ফের আলোচনায় এসেছে রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দেওয়ার ইস্যুটি।
বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলো থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়ার খবর প্রকাশে পর রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ ইস্যু নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। একইভাবে রাজনৈতিক মহলেও চলছে নানা গুঞ্জন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ নির্দেশনা কি রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত-এমন প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণত বিশ্বের সব দেশের মতো বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোতেও রাষ্ট্রপতির ছবি সম্মানসূচকভাবে প্রদর্শন করা হয়ে থাকে। রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্য ও সম্মানবোধের অংশ হিসেবেই এ রীতি বহাল ছিল এতদিন। সেই প্রেক্ষাপটে হঠাৎ ছবি সরিয়ে ফেলার এ সিদ্ধান্ত নজিরবিহীন বলে মনে করছেন অনেকে। এ ঘটনার জেরে রাজনৈতিক অঙ্গনেও দেখা দিয়েছে নানা ধরনের আলোচনা।
Manual1 Ad Code
কেউ কেউ বলছেন, এটি রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের ‘নীরব বিদায়’-এর সূচনা সংকেত হতে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক চাপ বা কৌশল কাজ করছে। প্রবাসী সাংবাদিক ও ইউটিউবার ইলিয়াস হোসেন এ ইস্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।
রাষ্ট্রপতির একটি ছবি পোস্ট করে তিনি লেখেন, ‘টাটা বাই বাই খতম, পরের ধাক্কা ক্যান্টনমেন্টে’। তার এ বক্তব্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ ছাড়া ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপির নেতারাও বিভিন্ন সময় তাদের বক্তব্যে রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি অব্যাহত রেখেছেন।
Manual5 Ad Code
এদিকে সংসদ বিদ্যমান না থাকায় আইন ও সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সুযোগ আছে কি না-সেই প্রশ্ন উঠেছে। কারণ সংবিধান অনুযায়ী সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করতে হয়। তবে রাষ্ট্রপতি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে তখন আর সংসদের প্রয়োজন নেই। ফলে রাষ্ট্রপতি যদি এখন পদত্যাগ করেন, তাহলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব কে পালন করবেন সেই প্রশ্ন রয়েছে। সংবিধানে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি যদি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন বা মৃত্যুর কারণে পদশূন্য হয়, তখন স্পিকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। রাষ্ট্রপতি চাইলে স্পিকারের কাছে পদত্যাগ করতে পারেন। তবে বর্তমানে সংসদ নেই এবং স্পিকার পদত্যাগ করেছেন। আর ডেপুটি স্পিকার কারাগারে আছেন। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ বা অপসারণের দাবিটি নতুন করে উঠলেও সেটি সংবিধান অনুযায়ী হওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করেন আইনবিদরা।
তারা বলছেন, রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করতে পারে সংসদ। কিন্তু সেটি বাতিল করা হয়েছে। আবার তার পদত্যাগেরও সুযোগ নেই। কারণ স্পিকার না থাকায় তিনি কার কাছে পদত্যাগ করবেন সেই প্রশ্ন রয়েছে। সে কারণে সংবিধান ও আইনগতভাবে তাকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি নিজেই বর্তমান সরকারকে শপথ পড়িয়েছেন। সরকার তাকে সংসদ ছাড়া অভিশংসন করলে বা বাদ দিলে এখন হয়তো কেউ কিছু বলবে না; কিন্তু ভবিষ্যতে আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে কথা উঠতে পারে। আর দেশে নতুন করে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হবে।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, এখন সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের কোনো সুযোগ নেই। কারণ এখন সংসদ নেই। তবে যেকোনো সময় রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে পারেন। পদত্যাগে কোনো বাধা নেই। এখানে স্পিকারের কথা বলা আছে। কিন্তু স্পিকার অনুপস্থিত। তাই রাষ্ট্রপতি চাইলে স্বেচ্ছায় বা কারও কথায় চলে যেতে পারেন। এখন একটাই উপায় ওনার পদত্যাগপত্র বঙ্গভবনে রেখে চলে যাওয়া।
জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ প্রক্রিয়া : এদিকে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বৈঠকের পর জুলাই জাতীয় সনদের খসড়া চূড়ান্ত করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। খসড়ায় রাষ্ট্রপতির অভিশংসন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রদ্রোহ, গুরুতর অসদাচরণ বা সংবিধান লঙ্ঘনের জন্য রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যাবে। আইনসভার নিম্নকক্ষে অভিশংসন প্রস্তাবটি দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে পাস করার পর তা উচ্চকক্ষে প্রেরণ এবং উচ্চকক্ষে শুনানির মাধ্যমে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনে অভিশংসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।’ এ প্রস্তাবে ২৮টি দল ও জোট একমত হয়েছে। গত শনিবার রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানো জুলাই সনদের খসড়া থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
সনদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ‘সংবিধানে এ রূপ যুক্ত করা হবে যে বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন, যিনি আইন অনুযায়ী আইনসভার উভয় কক্ষের (নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ) সদস্যদের গোপন ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্বাচিত হবেন। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার সময় কোনো ব্যক্তি কোনো রাষ্ট্রীয়, সরকারি বা রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের পদে থাকতে পারবেন না।’
পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান রোববার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, বিদেশে বাংলাদেশের সব কূটনৈতিক মিশন, কনস্যুলেট, কূটনীতিকদের কার্যালয় ও বাসভবন থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি সরানোর নির্দেশের সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। ‘রাষ্ট্রপতি থাকছেন না, প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন’-এমন একটা আলোচনা আছে। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, এ রকম আলোচনার কি শেষ আছে? কত আলোচনা শুনেছিলাম। জুনের মধ্যেও নির্বাচন হবে না। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের কথা জানিয়ে দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।