আগামী ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। নির্বাচন কমিশনও তাদের প্রস্তুতি শুরু করেছে। তারা জানিয়েছে, এ সপ্তাহে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করবে। আর এতেই দেশীয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে আশার সঞ্চার হয়েছে। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশে শিল্পে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে বলে মনে করছেন তারা।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সর্বশেষ ভাষণে নির্বাচন নিয়ে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনার পর কে কোন ধরনের শিল্পে বিনিয়োগ ও ব্যবসা করবেন, তা নিয়ে এরই মধ্যে হিসাব কষা শুরু হয়েছে। অনেকে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে ব্যবসা গুটিয়ে দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। এখন তারা সেই পরিকল্পনা বাদ দিয়েছেন।
শিল্প খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে একই মত জানিয়ে অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, নির্বাচিত সরকারের অধীনে দীর্ঘমেয়াদি নীতি-সহায়তা থাকবে। ফলে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আস্থা পাবেন। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে। রাজস্ব আদায় বাড়বে। গোটা অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
Manual2 Ad Code
তৈরি পোশাকশিল্পের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ও রাইজিং ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ হাসান খান (বাবু) বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার আমাদের বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু আমরা জানি না এই সরকার কতদিন থাকবে। সামনে নির্বাচিত সরকার এলে যদি বর্তমান নীতি-সহায়তা সংশোধন করে বা নতুনভাবে নীতি-সহায়তা আনে, তবে বিনিয়োগকারীদের লাভ-লোকসানের হিসাবও বদলে যাবে। তাই অনেক বিনিয়োগকারী বা উদ্যোক্তা স্বল্প সময়ের জন্য ঝুঁকিতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছেন না।’
রপ্তানি খাতের এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘নির্বাচিত সরকারের দিকে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছেন। অনেকে নির্বাচিত সরকারের অধীনে কোন খাতের জন্য কতটা বিনিয়োগ করবেন, তার হিসাব কষতে শুরু করেছেন। এক কথায় বলা যায়, তৈরি পোশাক খাতসহ রপ্তানি খাতে নতুন বিনিয়োগের আশা দেখছি।’
Manual8 Ad Code
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে মুষ্টিমেয় সুবিধাবাদীকে সুযোগ দেওয়া হলেও সাধারণ ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা ছিলেন সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বিনিয়োগে ছিল খরা। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়েও গঠিত নতুন সরকার দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে গুরুত্ব দেয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ কতদিন আছে, নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বর্তমান নীতি-সহায়তার কোন খাতে কী পরিবর্তন আসবে- এসব নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণে শিল্পে বিনিয়োগে আগ্রহী হননি বেশির ভাগ উদ্যোক্তা। শিল্পে বিনিয়োগ না বাড়ার কারণে রাজস্ব আদায়ে গতি আসেনি। ঘাটতি বেড়েছে। দেশে নতুন কর্মসংস্থান হয়নি বললেই চলে। ব্যক্তি খাত ও সরকার- দুই ক্ষেত্রেই আর্থিক সংকট দূর হয়নি। নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি অনেকে। এসবের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের গোটা অর্থনীতিতে। উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশের সঙ্গে অর্থনীতিতে হিসাবে এসেছে নতুন মেরূকরণ, যা অর্থনীতির গতি কমিয়েছে। শিল্প খাতের সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, নির্বাচিত সরকার এলে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও দেশের অবস্থা সুসংহত হবে।
প্রধান উপদেষ্টার সর্বশেষ ভাষণের পর থেকে দেশে নির্বাচনের হাওয়া বইছে। নির্বাচিত সরকারের মেয়াদকালে কে কী ধরনের শিল্পে বিনিয়োগ করবেন, তার হিসাব কষতে শুরু করেছেন অনেকে- এমন তথ্য জানিয়ে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকিন আহমেদ বলেন, ‘দেশীয় ও বিদেশি ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো দেশের আইনশৃঙ্খলার স্থিতিশীলতা। পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অনুকূল ব্যবসায়িক পরিবেশ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, আধুনিক লজিস্টিক অবকাঠামো এবং উন্নত ট্যাক্স-ব্যবস্থা অপরিহার্য। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যদিও আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে নিয়ে আসতে চেষ্টা করেছে, তবে অন্য সমস্যাগুলো আমরা অনুভব করছি। আমরা আশা করব, আগামী সরকার এসব বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করবে। নির্বাচিত সরকারকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। তাই তারা ব্যবসা-শিল্প-বিনিয়োগবান্ধব নীতি-সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করবে। আমি মনে করি, আগামীর গ্রহণযোগ্য নির্বাচিত সরকারের অধীনে গোটা অর্থনীতিতে গতি আসবে।’
যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান সালমা ইসলাম বলেন, নির্বাচিত সরকার এলে নিশ্চয়তার জায়গাটা বাড়বে। অবশ্যই শিল্পে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে।
Manual6 Ad Code
নির্বাচিত সরকারের অধীনে দীর্ঘমেয়াদি পলিসি পাওয়া যাবে- এমন আশা জানিয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) সভাপতি ও বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী হক চৌধুরী বলেন, ‘দেশি বিনিয়োগ বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগও বাড়বে। নির্বাচিত সরকার এলে বিশ্বব্যাপী দেশের ভাবমূর্তি আরও বাড়বে। অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আসবে। ফলে শেয়ারবাজারেও নতুন বিনিয়োগকারী আসবে বলে আশা করছি।’
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সভাপতি আবদুল হক বলেন, নির্বাচিত সরকারের অধীনে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন হবে। একটা শান্তিপূর্ণ স্বাভাবিক নির্বাচন প্রত্যাশা করে সবাই। বিশেষত বাংলাদেশের বন্ধু বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বলেছে ‘এখন দরকার নির্বাচিত সরকার’। নির্বাচিত সরকার এলে সব দেশের সঙ্গেই বিনিয়োগ বাড়াতে দর-কষাকষি করতে পারবে।
Manual5 Ad Code
দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে অবশ্যই নির্বাচিত সরকার প্রয়োজন- এমন মত জানিয়ে অর্থনীতির বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, অর্থনীতি এবং রাজনীতি একে অন্যের সঙ্গে জড়িত। বিনিয়োগ বাড়াতে বর্তমান সরকার অনেক চেষ্টা করেও সফল হতে পারেনি। এর মূল কারণ অনিশ্চয়তা। কিন্তু একটি নির্বাচিত সরকার নিশ্চয়তা দিতে পারবে। তাই নির্বাচিত সরকার এলে অর্থনীতিতে গতি বাড়বে।
তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকারকে বিনিয়োগকারীদের নিয়েই চলতে হবে। নির্বাচিত সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে। তাদের রাষ্ট্রক্ষমতা ছেড়ে আবারও জনগণের কাছে ভোটের জন্য যেতে হবে। তাই দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক ধারা যাতে না হয়, সে জন্য শিল্প-বিনিয়োগ বাড়াতে চেষ্টা করবে। ফলে নির্বাচিত সরকারের অধীনে শিল্প-বিনিয়োগ বাড়বে। ব্যবসা বাড়বে।