প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

৭ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৩শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৪শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

ফুরিয়ে আসে চোখের পানি ফেরেনি আপনজন

editor
প্রকাশিত আগস্ট ৩০, ২০২৫, ০৭:২৪ পূর্বাহ্ণ
ফুরিয়ে আসে চোখের পানি ফেরেনি আপনজন

Manual5 Ad Code

 

Manual8 Ad Code

প্রজন্ম ডেস্ক:

আন্তর্জাতিক গুম দিবস আজ। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এ দিনটি গভীর শোক, উদ্বেগ আর ক্ষোভের সঙ্গে পালন করা হচ্ছে।
ভুক্তোভোগী পরিবারগুলোর কাছে শুধু এই একটি দিনই নয়, নিখোঁজের দিন থেকে পরবর্তী প্রতিটি দিনই যেন প্রতীক্ষার যন্ত্রণা, নীরব কান্না, ক্ষোভ আর হতাশার।
বাবার হাতটি ছুঁয়ে ধরতে সন্তানের অনন্ত প্রতীক্ষা, সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরতে মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ, স্বামীর সোহাগবঞ্চিত স্ত্রীর নীরব কান্না এরকম না জানা আরও কত তীব্র যন্ত্রণায় দগ্ধ শত শত গুমের শিকার পরিবার।

স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা ও তার পালিত রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোর দ্বারা গুমের শিকার এসব শত শত ভিকটিমের পরিবার গত ১৬টি বছর ধরে এরকম যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত। কিন্তু এখনও তারা পায়নি প্রিয়জনের সন্ধান, ক্ষতিপূরণ কিংবা ন্যায়বিচার।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, গুম শুধু একজন ব্যক্তির বা পরিবারের ট্র্যাজেডিই নয়, বরং যেকোনো রাষ্ট্রের মানবাধিকার সুরক্ষায় চরম ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
বিগত দেড় বছরে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিপুলসংখ্যক মানুষ গুমের শিকার হয়। এ ধরনের অনেক ঘটনা গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনে উঠে আসে। বহু পরিবার এখনও প্রিয়জনের সন্ধানের অপেক্ষায় আছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের ভাগ্যে কী ঘটেছে এখনও তা অজানা। ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গুমের ঘটনা তদন্তে কমিশন গঠন করা হয়। সেখানে উঠে আসে গুমের ঘটনাগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ও বাহিনীগুলোর নাম। কিন্তু এখন পর্যন্ত দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায়নি। বাংলাদেশে গুমের ঘটনার সঙ্গে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতেরও সম্পৃক্ততার তথ্য পায় গুমসংক্রান্ত কমিশন।

Manual8 Ad Code

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, বাংলাদেশে গুমের ঘটনার আন্তর্নিহিত কারণ উদঘাটন জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে গুমের ঘটনায় রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক দায়িত্বহীনতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি মূল ভূমিকা রেখেছে বলে গুমের শিকার ব্যক্তি ও পরিবারের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার গুমসংক্রান্ত কমিশন গঠন করায় এবং আন্তর্জাতিক বলপূর্বক গুম বিষয়ক সনদে স্বাক্ষর করাটা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে গুমের শিকার ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ, পরিবার ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা সুরক্ষা এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করা, সেই সঙ্গে দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে আসক সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে। কেননা আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে এখন এসব কিছুর দায়-দায়িত্ব এখন সরকারে ওপর বর্তাবে।

এদিকে গত ২৮ আগস্ট ‘গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। প্রস্তাবিত আইনে গুম করার অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। গুমবিরোধী সনদটি ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়। বিশ্বের ৩২টি দেশ এটি অনুস্বাক্ষর করে। পরে ২০১০ সালে তা বাস্তবায়ন শুরু হয়। সামগ্রিকভাবে এই সনদের লক্ষ্য গুম বন্ধের পাশাপাশি এই অপরাধের জন্য দায়মুক্তি বন্ধ করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সহায়তা দেওয়া। এখন পর্যন্ত বিশ্বের ৭৫টি দেশ এই সনদে যুক্ত হয়েছে।

 

Manual2 Ad Code

কমিশন গঠন ও প্রতিবেদন

Manual4 Ad Code

২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত গুমের ঘটনাগুলো তদন্ত করতে অন্তর্বর্তী সরকার গত ২৭ আগস্ট কমিশন গঠন করে। গত ১৪ ডিসেম্বর ‘আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ’ (সত্য উন্মোচন) শীর্ষক প্রথম অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেয় গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন। সেখানে গত ১৫ বছরে সংঘটিত বিভিন্ন গুমের ঘটনায় নির্দেশদাতা হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার কথা জানায় গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন।
গুমের ঘটনায় র‌্যাবের গোয়েন্দা সংস্থা সবচেয়ে বেশি জড়িত ছিল বলে গুমসংক্রান্ত কমিশনের তথ্যে উঠে আসে। এ ছাড়া গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততার বিষয় উঠে আসে। এতে বলা হয়, গুমের বেশিরভাগ ঘটনা সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো, বিশেষ করে পুলিশ, র‍্যাব, ডিবি ও সিটিটিসি ৬৭ শতাংশের বেশি ঘটনার জন্য দায়ী।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিশন এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৮৩৭টি গুমের অভিযোগ পেয়েছে। প্রাথমিক পর্যালোচনার পর এর মধ্যে ১ হাজার ৭৭২টি অভিযোগকে কমিশনের তথ্যভান্ডারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে কমিশন দেখেছে, ১ হাজার ৪২৭ জন (৮১ শতাংশ) নিখোঁজ ব্যক্তি পরে জীবিত অবস্থায় ফিরে এসেছেন এবং ৩৪৫ জন (১৯ শতাংশ) এখনও নিখোঁজ।

গুমসংক্রান্ত কমিশনের অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে এখন পর্যন্ত যেসব গুমের ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তাতে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ৫১ জন গুমের শিকার হয়েছেন ২০১৭ সালে। ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩৬টিতেই গুমের ঘটনা ঘটেছে, যা দেশের অর্ধেকের বেশি এলাকা। জেলাগুলো হলোÑসাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মৌলভীবাজার, মানিকগঞ্জ, কক্সবাজার, শরীয়তপুর, বরিশাল, পাবনা, পটুয়াখালী, নীলফামারী, জয়পুরহাট, কুষ্টিয়া, বাগেরহাট, গাইবান্ধা, ভোলা, চুয়াডাঙ্গা, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, বগুড়া, দিনাজপুর, ঝিনাইদহ, রংপুর, যশোর, টাঙ্গাইল, নরসিংদী, খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ঢাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুমের শিকার হয়েছেন ঢাকায়, শতাধিক ব্যক্তি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২৫২ ব্যক্তিকে তুলে নেওয়ার সময়ের বয়সের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের বেশির ভাগের বয়স ১৯ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে ২৭-২৮ বছর বয়সিরাই বেশি। এদের মধ্যে কমপক্ষে ১০ জন অপহরণের সময় ১৮ বছরের কম বয়সি ছিলেন। গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ছাত্র, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, বেসরকারি চাকরিজীবী, সাংবাদিক, দিনমজুর এবং অন্যান্য ব্যক্তি রয়েছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২৫৩টি ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভুক্তভোগীদের এক দিন থেকে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন মেয়াদে আটকে রাখা হয়েছিল। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যক্তি কয়েক মাস এমনকি বছর ধরে নিখোঁজ ছিলেন।

আসকের প্রতিবেদন

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান বলেছে, গত ১৭ বছরে (২০০৭-২০২৩) গুমের শিকার হয়েছেন ৬২৯ জন। এর মধ্যে ৭৮ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অপহরণের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে ৬২ জনকে। ৭৩ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এখনও নিখোঁজ ৩৮৩ জন। ২০১৬ সালে সবচেয়ে বেশি ৯৭ জন গুম হন। আসকের পরিসংখ্যান বলেছে, ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিন বছরে ২১ জন গুম হন। ২০১০ সালে ৪৭ জন, ২০১১ সালে ৫৯ জন, ২০১২ সালে ৫৬ জন, ২০১৩ সালে ৭২ জন, ২০১৪ সালে ৮৮ জন, ২০১৫ সালে ৫৫ জন, ২০১৬ সালে ৯৭ জন, ২০১৭ সালে ৬০ জন, ২০১৮ সালে ৩৪ জন, ২০১৯ সালে ১৩ জন, ২০২০ সালে ৬ জন, ২০২১ সালে ৭ জন, ২০২২ সালে ৫ জন ও ২০২৩ সালে ৯ জন গুমের শিকার হন।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code