ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতে কতখানি শুরু থেকেই এমন আলোচনা ছিল রাজনৈতিক অঙ্গনে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ফলে ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে এবারের ডাকসু নির্বাচন হচ্ছে। যেখানে হতে যাচ্ছে ত্রিমুখী লড়াই। প্রতিবার ডাকসুতে সরকার ও বিরোধীদলীয় প্যানেল থাকলেও; এবারের চিত্র আলাদা। রাজনীতিবিদরা এবারের ডাকসু নির্বাচন নিয়ে জানাচ্ছেন মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
কেউ কেউ এবারের ডাকসু নির্বাচনকে জাতীয় নির্বাচনের টেস্ট কেস হিসেবে দেখছেন। জাতীয় নির্বাচনের কয়েক মাস আগে ডাকসু নির্বাচনকে নতুন বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নবসূচনা হিসেবে উল্লেখ করছেন অনেকে। আর রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, জাতীয় রাজনীতির মাপকাঠি হবে ডাকসুর ভোট।
Manual6 Ad Code
সবশেষ ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ সাড়ে ছয় বছর ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আজ আবারও অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ও হল সংসদ নির্বাচন। আজ মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে ৪টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ। ১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুসারে, প্রতি বছর ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। ডাকসু মনোনীত পাঁচ শিক্ষার্থী প্রতিনিধি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিনেটের সদস্য হন। শতবর্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এখন পর্যন্ত ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে ৩৭ বার। এর মধ্যে ২৯ বারই হয়েছে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের ৫০ বছরে। স্বাধীন দেশে ৫৩ বছরে মাত্র আটবার ভোট দেখেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ডাকসুর আজকের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেলের বেশিরভাগই জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় যোদ্ধা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেল, বামপন্থি কয়েকটি সংগঠনের সমন্বয়ে ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’, ছাত্র শিবিরের ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন-সমর্থিত বিনির্মাণ পর্ষদ (আংশিক), সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ, উমামা ফাতেমার নেতৃত্বাধীন ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’, ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের প্যানেল, ছাত্র অধিকার পরিষদের ‘ডাকসু ফর চেঞ্জ’ প্যানেল, ‘অপরাজেয় ৭১-অদম্য ২৪’ প্যানেল।
ডাকসুর সবশেষ ভিপি গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরবলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ডাকসুর নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনে খুব একটা প্রভাব ফেলবে না বলে আমার মনে হয়। সবসময় দেখা গেছে, ডাকসুতে সরকারবিরোধী পক্ষের ছাত্র সংগঠন জয়ী হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভোটের মাধ্যমে সরকারের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করেন। এবার সরকারের কার্যত কোনো দল নেই। যদিও সরকারের প্রিয় দল হিসেবে পরিচিত এনসিপি। তাদের ছাত্র সংগঠন আছে বাগছাস। এ দলের নেতারাও জুলাই অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে ছিলেন। অর্থাৎ এবার সবাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে। তাই আমার মনে হচ্ছে এবারের ডাকসু নির্বাচনে একক প্যানেল জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এবারের নির্বাচনে দল থেকে বেশি কাজ করবে ব্যক্তি ইমেজ এবং জুলাই বিপ্লবের ভূমিকা।
Manual1 Ad Code
১৯৯০-৯১ সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন আমানউল্লাহ আমান। ছিলেন এমপি প্রতিমন্ত্রী। বর্তমানে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। আমানউল্লাহ আমান বলেন, ডাকসু হচ্ছে দেশের দ্বিতীয় সংসদ। আমি যখন ভিপি নির্বাচিত হই তার মাস ছয়েক পর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আমি প্রথমবারের মতো ভিপি থাকা অবস্থায় এমপি হই। আমি মনে করি ডাকসু নির্বাচন আমার জাতীয় নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলেছে। ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জাতীয় নেতৃত্ব গড়ে ওঠে।
ডাকসুর সাবেক দুইবারের ভিপি (৭৯-৮০ ও ৮০-৮১ সেশন) ছিলেন মাহমুদুর রহমান মান্না। এবারের ডাকসু নির্বাচন নিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনটি জাতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে হচ্ছে না। এখানে মূলত ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের লড়াই হচ্ছে। যদি ধরি ছাত্রশিবির জিতে গেল; তাহলে জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আর ছাত্রদল জিতে গেলে বিএনপি বলবে তাদের অবস্থা ঠিক আছে। আমি মনে করি এর চেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে না।
Manual4 Ad Code
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, আমি মনে করি ডাকসুও এক প্রকার জাতীয় নির্বাচন। এর গুরুত্ব অনেক। জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে ডাকসুর সংযোগ আছে। কেননা ডাকসুর নেতারাই ভবিষতে জাতীয় নির্বাচনে নেতৃত্ব দিবে। সামনে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনীতির মেরুকরণ রয়েছে। ডাকসু নির্বাচন সেই মেরুকরণে প্রভাব ফেলবে। তিনি বলেন, আমরা আশা করি ডাকসু নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সূচনা হোক। যোগ্যতা অনুয়ায়ী শিক্ষার্থীরা তাদের নেতা নির্বাচিত করুক।
এ বিষয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক সবলেন, ডাকসুর ভোট সবসময়ই জাতীয় রাজনীতির ব্যারোমিটার হিসেবে কাজ করে। ডাকসু নির্বাচনটি এমন সময় হচ্ছে যখন জাতীয় নির্বাচনের আর মাত্র ৪-৫ মাস বাকি। যার ফলশ্রুতিতে ডাকসু দেশের সব জনগণের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষার্থী বলেন, ডাকসুর নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর নজর থাকাটা স্বাভাবিক, কারণ এটি তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটায়। এটি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনমনের প্রবণতা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।