২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানি কিছুটা বেড়েছে। এই সময়ে ১৪২টি দেশে মোট ১১ লাখ ২৯ হাজার বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১০ লাখ ৭ হাজার। সেই হিসাবে ২০২৪-এর তুলনায় ২০২৫ সালে জনশক্তি রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার। তারও আগের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে বিভিন্ন দেশে ১৩ লাখ ৭ হাজার বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছিল। তবে অভিবাসন খাতে চলমান মন্দার মধ্যে এবারও বাংলাদেশকে রক্ষা করেছে সৌদি আরব একাই।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশি কর্মীদের এবারও প্রধান গন্তব্য ছিল সৌদি আরব। ২০২৫ সালে মোট বিদেশ যাওয়া কর্মীর দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি কর্মসংস্থান হয়েছে দেশটিতে। গত বছর সৌদি আরবে ৭ লাখ ৫০ হাজার ৯৬৭ জন কর্মী গেছেন। ২০২৪ সালে সৌদি আরবে গেছেন ৬ লাখ ২৪ হাজার কর্মী। এই হিসাবে গত বছর সৌদি আরবে জনশক্তি রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার। তবে সৌদি আরব ছাড়া বিশ্বের অন্য দেশগুলোতে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানি সামান্য কমেছে।
Manual4 Ad Code
বিএমইটি সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের বড় বড় শ্রমবাজারের মধ্যে শুধু সৌদি আরব ছাড়া বাকি প্রায় সব দেশেই কয়েক বছর ধরে জনশক্তি রপ্তানি কমেছে। বেড়েছে শুধু সৌদি আরবে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে কর্মী গেছেন ৪ লাখ ৯৮ হাজার। এরপর ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সৌদি আরবে ধারাবাহিকভাবে জনশক্তি রপ্তানি বেড়েছে। তবে বাংলাদেশের অন্য বড় শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং আরও বেশ কয়েকটি দেশে জনশক্তি রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ায় এই খাতের সুফল পাওয়া যায়নি।
Manual3 Ad Code
২০২৫ সালে শীর্ষ পাঁচটি গন্তব্যের তালিকায় সৌদি আরবের পর রয়েছে কাতার (১ লাখ ৭ হাজার ৫৪২ জন), সিঙ্গাপুর (৭০ হাজার ৯৪ জন), কুয়েত (৪২ হাজার ৭৬৯ জন) ও মালদ্বীপ (৪০ হাজার ৫৫ জন)। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য বন্ধ থাকলেও বিশেষ ক্যাটাগরিতে গত বছর ১৩ হাজার ৭৭৩ জন বাংলাদেশির কর্মসংস্থান হয়েছে। মালয়েশিয়ার বাজার বন্ধ থাকার পরও বিশেষভাবে ৩ হাজার ৬৬ জন বাংলাদেশির কর্মসংস্থান হয়েছে।
Manual1 Ad Code
২০২৫ সালে নারী কর্মীদের বিদেশ যাওয়ার হারও কিছুটা বেড়েছে। ২০২৪ সালে প্রায় ৫৫ হাজার নারী কর্মী বিদেশে গেছেন, আর ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১ হাজার ৯৯৭ জনে। এই বৃদ্ধি ইতিবাচক মনে হলেও মোট অভিবাসী কর্মীর তুলনায় নারীদের সংখ্যা এখনো অনেক কম। দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের অভাব, কাজের বৈচিত্র্যহীনতা এবং গন্তব্য দেশগুলোর বিধিনিষেধের কারণে নারীরা এখনো পিছিয়ে আছেন।
জনশক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, কারিগরি প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক সনদ নিশ্চিতকরণ, ভাষার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উচ্চমজুরি ও মানসম্মত পেশা ছাড়া এই খাতে উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ লক্ষ্যে অভিবাসন গন্তব্য দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদনের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। তারা সতর্ক করেছেন যে যথাযথ সংস্কার ছাড়া বাংলাদেশের এই শ্রম অভিবাসন কেবল সংখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, এটি গুণগত কোনো পরিবর্তন আনবে না। তারা বলছেন, অদক্ষ কর্মী পাঠানোর এই ধারা বজায় থাকলে মজুরি বৃদ্ধির সুযোগ কমে যায়, মাথাপিছু রেমিট্যান্স আয় কমবে এবং প্রবাসে কর্মীরা বেশি ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন।
এদিকে ২০২৫ সালে জনশক্তি রপ্তানি কিছুটা বাড়ার আরেকটি কারণ ছিল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। ২০২৪ সালে অভ্যুত্থানের কারণে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও ২০২৫ সালে সেই প্রভাব ছিল না। ফলে জনশক্তি রপ্তানির পাশাপাশি ২০২৫ সালে রেমিট্যান্সের পরিমাণও বেড়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ২৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পেলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৩২ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার হয়েছে।
Manual6 Ad Code
বিএমইটির মহাপরিচালক সালেহ আহমদ মোজাফফর বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে বাংলাদেশে কর্মী নিয়োগ পরীক্ষার জন্য বিদেশি প্রতিনিধিদল খুব বেশি আসতে পারেনি। আবার বাংলাদেশ থেকেও জনশক্তি রপ্তানিকারকরা ওয়ার্ক অর্ডারের জন্য বিদেশে যেতে পারেননি। এতে অনেক কর্মী রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে কর্মী বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেনি। এতে ২০২৪ সালে জনশক্তি রপ্তানি কমে যায়। তবে ২০২৫ সালে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়। এতে আমাদের জনশক্তি রপ্তানিতে কিছুটা গতি ফিরে পেয়েছে।’
জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বায়রার নেতা ফকরুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশের জনশক্তির অধিকাংশই যায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য এখনো বন্ধ। অন্তর্বর্তী সরকার দেড় বছরে বন্ধ থাকা দুটি বড় শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়া চেষ্টা করেও খুলতে পারেনি। এ ছাড়া নতুন কোনো শ্রমবাজারও সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু সৌদি আরবে কোনো কারণে একবার জনশক্তি রপ্তানি কমে গেলে এই খাতে বিপর্যয় ঠেকানো মুশকিল হবে। তাই যত দ্রুত সম্ভব এর বিকল্প শ্রমবাজার আমাদের সৃষ্টি করতে হবে।’