আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিদেশিদের কোনো চাপ নেই কিন্তু বিদেশি অংশীদাররা স্থিতিশীলতার স্বার্থে সামনের ভোট অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণ, সহিংসতামুক্ত, অবাধ ও নিরপেক্ষ দেখতে চায়। বিদেশি অংশীদারদের সামনের নির্বাচন ইস্যুতে কোনো চাপ না থাকলেও তারা নির্বাচনের পরিবেশ জানা-বোঝার জন্য প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের ওপর নজর রাখছে।
এদিকে গত ২০০৮ সালের পর সামনের নির্বাচনে সর্বাধিক সংখ্যক বিদেশি পর্যবেক্ষক থাকার আভাস পাওয়া গেছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এরই মধ্যে আসন্ন নির্বাচনের প্রাথমিক পরিবেশ-পরিস্থিতি মূল্যায়ন শেষে ফেব্রুয়ারির ভোটে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) এবং কমনওয়েলথ (একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা স্বাধীন দেশগুলোর স্বেচ্ছাসেবী আন্তর্জাতিক সংস্থা)। ইইউ থেকে কম-বেশি ২০০ জন আসন্ন নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করবেন। নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানো এবং আসন্ন ভোট অনুষ্ঠানে সহযোগিতা সংক্রান্ত ইস্যুতে ইইউ এরই মধ্যে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
Manual5 Ad Code
আগামী ১১ জানুয়ারি ইইউ আসন্ন ভোট অনুষ্ঠানে পর্যবেক্ষণ ইস্যুতে সাংবাদিকদের ব্রিফ করার কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসবেন প্রায় ৫০ জন পর্যবেক্ষকের দল এবং কমনওয়েলথ থেকে প্রায় ৩০ জনের একটি দল আসার কথা রয়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি দেশ থেকে পর্যবেক্ষক আসতে পারে।
ঢাকায় অবস্থিত ইইউ কার্যালয় এক বার্তায় জানিয়েছে, বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোট অনুষ্ঠানের জন্য ইইউ প্রয়োজনীয় সমর্থন দিবে। শুধু তাই নয় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রত্রিয়ার পুর্নযাত্রার এই সময়ে ইইউ গুরুত্বপূর্ণ ৫টি স্তম্ভকে সহযোগিতা করছে। এগুলো হচ্ছে নির্বাচন কমিশন, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, রাজনৈতিক দল, নারী ও তরুণ সমাজ এবং অবাধ তথ্যপ্রবাহ।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো আরও জানাচ্ছে, আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট অনুষ্ঠানের প্রতি বিদেশি কূটনীতিকদের কঠোর নজর রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সারা দেশে যেসব ‘মব জাস্টিস’ এর ঘটনা ঘটেছে সেসব বিষয়ে বিদেশি কূটনীতিকরা খুবই উদ্বিগ্ন। এই বিষয়ে বিদেশি কূটনীতিকরা প্রকাশে কিছু এখনও বলেননি কিন্তু আড্ডার টেবিলে অনেক সময়েই এগুলো আলোচনার মূল কেন্দ্র দখল করে রাখে। বিদেশিরা মনে করে যে এগুলোর সঙ্গে আসন্ন নির্বাচনের যোগসূত্র রয়েছে।
বিদেশিরা চায় যে আসন্ন নির্বাচন অবাধ. সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং শান্তিপূর্ণ হোক। বিদেশিরা বাংলাদেশে স্থিতিশীল পরিবেশ দেখতে চায়। কারণ এই দেশে ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ আছে। বাংলাদেশ অস্থিতিশীল হলে তাদের বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়বে। এ জন্য বিদেশিরা স্থিতিশীলতার স্বার্থে সহিংসতামুক্ত, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন প্রত্যাশা করে।
যে কারণে ঢাকায় কর্মরত জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লোটজ গত ডিসেম্বরে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাতের সময়ে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে একসঙ্গে বসে আলাপ করতে দেখে ভালো লাগছে। নির্বাচনের পরও এ ধরনের সংস্কার উদ্যোগ অব্যাহত থাকা উচিত।’
Manual1 Ad Code
অন্যদিকে গত ডিসেম্বরে মব জাস্টিসের কৌশল নিয়ে দেশের দুটি প্রথম সারির গণমাধ্যম আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ঢাকায় কর্মরত ইইউর রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার ওই গণমাধ্যমগুলো পরিদর্শন করতে এসে বলেন, বাংলাদেশ যখন নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে, তখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিসর বজায় রাখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, আমি সেটি বিশেষভাবে তুলে ধরতে চাই। আমি আশা করি, এমন ঘটনা আর কখনোই আমরা দেখব না। এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি ভয়াবহ মুহূর্ত ছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যাতে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে এগোতে পারে সে জন্য পত্রিকার প্রকাশনা চালিয়ে যেতে হবে, সংবাদ পরিবেশন অব্যাহত রাখতে হবে এবং সবার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
আসন্ন নির্বাচন ইস্যুতে ঢাকায় কর্মরত বিদেশি কূটনীতিকরা চলতি বছরজুড়েই বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। শুধু তাই নয় নির্বাচন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ইস্যুতে একাধিক দেশের প্রতিনিধিরা গত ২-৩ মাসে বাংলাদেশও সফর করেছেন। ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক গত ডিসেম্বরে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন।
ঢাকার যুক্তরাজ্য দূতাবাস টুইট বার্তায় এই বিষয়ে জানায়, হাইকমিশনার সারাহ কুক গত ৪ ডিসেম্বর জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। যা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা পর্বের একটি অংশ। বৈঠকে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন এবং দ্বিপক্ষীয় বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে।
Manual7 Ad Code
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে গৃহীত হালনাগাদ প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে ঢাকাস্থ বিদেশি দূতাবাসগুলোকে অবহিত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ডিসেম্বরের মধ্যভাগে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বিদেশি কূটনীতিকদের জন্য একটি অবহিতকরণ সভা আয়োজন করে। ওই ব্রিফিংয়ে নির্বাচন কমিশন যে বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের স্বাগত জানাবেন, তা-ও তাদের অবহিত করা হয় এবং তাদের নির্বাচন পর্যবেক্ষক প্রেরণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। এ ছাড়া সশস্ত্র বাহিনীসহ দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে সদা সতর্ক ও সচেষ্ট রয়েছেন তা-ও তাদের জানানো হয়।
এ প্রসঙ্গে দূতাবাসগুলোকে তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারেও আশ্বস্ত করা হয়। ওই ব্রিফিংয়ে ঢাকাস্থ দূতাবাসগুলোর প্রায় চল্লিশজন কূটনীতিক উপস্থিত ছিলেন।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গত সপ্তাহে বাংলাদেশের নির্বাচন ইস্যুতে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বলেন, বাংলাদেশর আসন্ন জাতীয় নির্বাচন দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়। চীন কখনো অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে কথা বলে না। চীন বিশ্বাস করে যে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এবং জনগণ আসন্ন নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য যথেষ্ট। চীন আশা করে যে বাংলাদেশর অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে দেশটির আসন্ন নির্বাচন মসৃণভাবে সমাপ্ত হবে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, নির্বাচন ইস্যুতে বিদেশিদের কোনো চাপ নেই। আমরা নিজেরাই একটি ভালো নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে চাই। সে বিষয়ে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বিদেশি কূটনীতিকদেরও এ বিষয়ে ব্রিফ করা হয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করছি যে ১২ ফেব্রুয়ারি একটি ভালো নির্বাচন অনুষ্ঠান শেষে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফায়েজ বলেন, বিভিন্ন সহিংস ঘটনা ঘটছে, যা আসন্ন নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত। তবে সহিংস ঘটনা বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। এসব ঘটনায় বিদেশিরা মনে করছে যে বাংলাদেশ দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। তবে এসব ঘটনায় বিদেশিরা এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। তারা পরিস্থিতি আরও পর্যবেক্ষণ করবে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের ভাবমূর্তি আমাদেরই ঠিক রাখতে হবে।