ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে প্রথমবারের মতো আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট চালু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে এবার প্রবাসী ভোটার, দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও কারাবন্দিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভোট গ্রহণ শুরুর আগেই এই নতুন ব্যবস্থাকে ঘিরে একের পর এক বিতর্ক, অভিযোগ ও জালিয়াতির আশঙ্কা সামনে আসছে। কোথাও ব্যালট না পাওয়ার অভিযোগ, কোথাও এক ঠিকানায় শতাধিক ব্যালট পৌঁছানোর ভিডিও ভাইরাল, আবার কোথাও ব্যালটের ভাঁজে প্রতীক পড়া নিয়ে রাজনৈতিক অভিযোগ–সব মিলিয়ে পোস্টাল ব্যালট এখন নির্বাচন ব্যবস্থার সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়। এর আগে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আগের রাতের ভোট, ব্যালট বাক্স দখল এবং কেন্দ্রভিত্তিক অনিয়ম নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছিল, তা এখনো বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাসকে তাড়া করে ফেরে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার পোস্টাল ব্যালটের আওতায় দূর প্রবাসে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন।
প্রথমবার ব্যাপক পরিসরে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে এবার দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বের ১০৪টি দেশ থেকে মোট নিবন্ধন করেছেন ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন ভোটার। এর মধ্যে দেশের বাইরে থাকা প্রবাসী ভোটারদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। অনেক আসনে পোস্টাল ভোটের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি, যা সরাসরি জয়-পরাজয়ের ফল নির্ধারণ করতে পারে। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করছে, যদি এই ভোট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা না থাকে, তাহলে ফলাফল নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে।
বাহরাইনের ভিডিও: সবচেয়ে বড় বিতর্ক
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় বাহরাইনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর। ভিডিওতে দেখা গেছে, একটি বাসায় একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক পোস্টাল ব্যালট রাখা হয়েছে এবং কয়েকজন ব্যক্তি বাহরাইনের ঠিকানাসংবলিত ব্যালট গণনা করছেন। অভিযোগ ওঠে, এটি একটি রাজনৈতিক দলের (জামায়াতে ইসলামী) নেতার বাসা। এ বিষয়ে ইসির পক্ষ থেকে গতকাল ব্যাখ্যা দিয়েছেন সংস্থাটির সচিব আখতার আহমেদ। তিনি বলেন, বাহরাইনের পোস্টাল সিস্টেম বাংলাদেশের মতো নয়। সেখানে প্রায় ১৬০টি ব্যালট একটি বক্সে রাখা হয়েছিল, অনেকটা ছাত্রাবাসের চিঠির বক্সের মতো। তিনি দাবি করেন, ভিডিওতে কোথাও কোনো খাম খোলা হয়নি।
বাহরাইনের পোস্টাল ব্যালট নিয়ে বিতর্কের ইস্যুতে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্তাধীন। তিনি স্বীকার করেন, প্রথমবার পোস্টাল ব্যালট চালু হওয়ায় কিছু সমস্যা হতেই পারে, তবে ‘মিসইউজ’ ঠেকাতে তদন্ত জরুরি।
ব্যালটের নকশা ও প্রতীক বিতর্ক
পোস্টাল ব্যালটের নকশা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। নকশা নিয়ে বিএনপির অভিযোগ, ব্যালট ভাঁজ করলে তাদের প্রতীক ‘ধানের শীষ’ মাঝখানে পড়ে যায় এবং সহজে চোখে পড়ে না। তবে এ বিষয়ে ইসি বলছে, ব্যালট ছাপানো হয়েছে সরকারি গেজেটের ক্রমধারা অনুসরণ করে। তবে ইসি সচিব স্বীকার করেছেন, এটি একটি ‘মিস’ হতে পারে এবং কমিশন বিষয়টি বিবেচনায় নেবে।
গোপনীয়তা ও শাস্তির আতঙ্ক
নির্বাচন কমিশন কড়া নির্দেশ দিয়েছে, পোস্টাল ব্যালটের খামের ওপর কোনো লেখা, প্রতীক বা রাজনৈতিক বার্তা থাকলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ। এমনকি ভোটারের এনআইডি ব্লক করা হতে পারে। এই নির্দেশে ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ঢাকার মিরপুরের ভোটার আফজাল হোসেন বলেন, ‘আমি প্রথমবার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেব। কিন্তু খামের ওপর ভুলক্রমে কিছু লিখে ফেললে এনআইডি ব্লক হবে–এই ভয় কাজ করছে।’
Manual5 Ad Code
মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে ব্যালট পেতে বিড়ম্বনা
মালয়েশিয়ায় ৮৪ হাজারের বেশি প্রবাসী পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধন করলেও অনেকেই ঠিকানাজনিত ত্রুটি ও অ্যাপ-সংক্রান্ত সমস্যায় ব্যালট পাননি। একই ধরনের অভিযোগ এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও ওমান থেকেও। কেউ কেউ বলছেন, ডাকযোগে ব্যালট ফেরত পাঠাতে হাজার টাকার মতো খরচ হচ্ছে, যা শ্রমজীবীদের জন্য বড় বাধা।
Manual8 Ad Code
ভোট জালিয়াতির আশঙ্কা
Manual1 Ad Code
রাজনৈতিক মহলে আশঙ্কা রয়েছে–একই ঠিকানা ব্যবহার করে একাধিক ভুয়া রেজিস্ট্রেশন, ভোটারদের এনআইডি ও আর্থিক তথ্য সংগ্রহ করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো অকাট্য প্রমাণ সামনে আসেনি।
পোস্টাল ব্যালট নিয়ে চলমান বিতর্কের ঘটনায় নির্বাচন বিশ্লেষক ও ফেমার প্রেসিডেন্ট মুনিরা খান বলেন, ‘এটা প্রথমবার হচ্ছে, ভুলত্রুটি থাকতেই পারে। কিন্তু এই বিতর্কের কারণে প্রবাসীদের ভোটাধিকার কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত করা যাবে না।’
তিনি মনে করেন, নির্বাচন কমিশনের উচিত ছিল পোস্টাল ব্যালটের পুরো প্রক্রিয়াটি আরও আগেই পরিষ্কারভাবে সবাইকে জানানো, স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা। তাহলে এত বিতর্ক তৈরি হতো না। যেসব রাজনৈতিক দল বা পক্ষের আপত্তি আছে, তারা নির্বাচন কমিশনের কাছে গিয়ে সমস্যাগুলো তুলে ধরুক। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই এই বিতর্কের কারণে প্রবাসীদের যে ভোটাধিকার তৈরি হয়েছে, সেটাকে প্রশ্নবিদ্ধ বা বাধাগ্রস্ত করা উচিত নয়। প্রতীক ব্যবস্থাপনা, গোপনীয়তা কিংবা খামের ভেতরে রাজনৈতিক বার্তা–এসব বিষয়ে যে আপত্তিগুলো উঠেছে, সেগুলো কমিশনের সঙ্গে বসে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত।
Manual7 Ad Code
পোস্টাল ব্যালটের চ্যালেঞ্জ
২১ থেকে ২৫ জানুয়ারি পোস্টাল ব্যালটে ভোট গ্রহণ হবে। এই সময়ের মধ্যে বিতর্কের সুষ্ঠু সমাধান না হলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও ফলাফল নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠতে পারে। পোস্টাল ব্যালট–একদিকে ভোটাধিকার বিস্তারের সুযোগ, অন্যদিকে নতুন ঝুঁকির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এই ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করবে স্বচ্ছতা, নজরদারি এবং সব পক্ষের সহযোগিতার ওপর।