ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে প্রথমবারের মতো ব্যাপক পরিসরে চালু হওয়া পোস্টাল ব্যালটকে ঘিরে শুরু থেকেই বিতর্কে পড়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দেশে ও বিদেশে একই ধরনের পোস্টাল ব্যালট ব্যবহারের সিদ্ধান্ত, ব্যালটে প্রার্থীর নাম ও ছবি না থাকা, প্রতীক বিন্যাস এবং ব্যালট ভাঁজে নির্দিষ্ট প্রতীক আংশিক ঢেকে যাওয়ার অভিযোগ– সব মিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠতে থাকে এই নতুন ভোটব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে।
Manual4 Ad Code
টানা সমালোচনা ও বিএনপির আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত অবস্থান বদলাতে বাধ্য হয়েছে নির্বাচন কমিশন। সিদ্ধান্ত হয়েছে, দেশের ভেতরের পোস্টাল ভোটারদের জন্য আসনভিত্তিক প্রার্থীদের নামসহ প্রতীক সংযোজন করে আলাদা করে পোস্টাল ব্যালট ছাপা হবে। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে দেশ-বিদেশে একই ব্যালটে ভোট গ্রহণের পরিকল্পনা থেকে সরে এল কমিশন, যা পোস্টাল ব্যালট বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশের জন্য আলাদা ব্যালট ছাপানোর সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক মনে করছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এ পদ্ধতির ভোটে জন-আস্থা প্রতিষ্ঠাই ইসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
দেশের পোস্টাল ব্যালটে থাকবে প্রার্থীর নাম
নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের ভেতরে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধিত ভোটারদের ব্যালটে প্রতীকের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আসনের প্রার্থীদের নাম যুক্ত করা হবে। এ বিষয়ে গতকাল শনিবার নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সংবাদিকদের জানান, এই সিদ্ধান্ত কেবল দেশের অভ্যন্তরের পোস্টাল ভোটারদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। প্রবাসীদের জন্য পাঠানো পোস্টাল ব্যালটে আগের মতো কেবল প্রতীকই থাকবে।
এ ক্ষেত্রে ইসির ব্যাখ্যা– প্রবাসে ব্যালট পাঠানো ও ফেরত আনার জন্য প্রায় ২০ দিনের সময় লাগে। তাই প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই বিদেশে কেবল প্রতীকসংবলিত ব্যালট পাঠানো হয়েছে। কিন্তু দেশের ভেতরে নিবন্ধনকারী ভোটারদের জন্য পোস্টাল ব্যালট পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে ২৩ জানুয়ারি থেকে। এর আগে প্রার্থিতা প্রত্যাহারসহ ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পর প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হবে। ফলে দেশের ব্যালটে প্রার্থীর নাম যুক্ত করতে কারিগরি কোনো বাধা নেই।
বিএনপির আপত্তি ও চাপের প্রভাব
পোস্টাল ব্যালট নিয়ে ছিল বিএনপির আপত্তি। দলটির দাবি ছিল– দেশের ভেতরে পোস্টাল ভোটে সাধারণ ব্যালটের মতোই আসনভিত্তিক প্রার্থীদের নাম ও প্রতীক থাকা উচিত। একই ব্যালটে দেশের সব আসনের সব প্রতীক দিয়ে ভোট নেওয়াকে তারা অযৌক্তিক ও বিভ্রান্তিকর বলে উল্লেখ করে। গত বৃহস্পতিবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলেন, ব্যালট ভাঁজ করলে ধানের শীষ প্রতীক আংশিকভাবে ঢেকে যায়। এতে ভোটার বিভ্রান্ত হতে পারেন এবং ভোটের ফল প্রভাবিত হতে পারে। ধারাবাহিক বৈঠক ও প্রকাশ্য আপত্তির পরই ইসি তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করে।
দেশের ভেতরে পোস্টাল ভোটার কতজন?
Manual4 Ad Code
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ভেতরে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য অনুমোদিত ভোটারের সংখ্যা ৭ লাখ ৬০ হাজার ৯৩৯ জন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনলাইনে আবেদন করেছিলেন ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৪১ জন। তবে তথ্যগত ত্রুটির কারণে ২০২টি আবেদন বাতিল করা হয়। এই ভোটারদের মধ্যে রয়েছেন– নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, প্যানেলভুক্ত নির্বাচন কর্মকর্তা এবং কারাবন্দি আসামিরা। এই বিশাল সংখ্যক ভোটারের জন্য এবার আসনভিত্তিক প্রার্থীদের নামসহ আলাদা পোস্টাল ব্যালট ছাপানো হবে, যা কমিশনের জন্য বড় ধরনের লজিস্টিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ।
দেশে-বিদেশে একই ব্যালট নিয়ে কেন আপত্তি
শুরুর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশে ও বিদেশে সব পোস্টাল ভোটারকে একই ধরনের ব্যালট পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। এতে দুই পৃষ্ঠার ব্যালটে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সব প্রতীক গেজেটের ক্রমধারা অনুযায়ী সাজানো হয়। ‘না’ ভোটের অপশনসহ মোট প্রতীকের সংখ্যা দাঁড়ায় ১২০টি। বিএনপির অভিযোগ, দেশের ভেতরের ভোটারদের ক্ষেত্রে এটি অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল এবং বিভ্রান্তিকর। কারণ একটি নির্দিষ্ট আসনের ভোটারকে তার আসনের বাইরের শতাধিক প্রতীকের মধ্যে নিজের পছন্দ খুঁজতে হচ্ছে। এই যুক্তিকেই শেষ পর্যন্ত গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয়েছে কমিশন।
পোস্টাল ব্যালটের ব্যয়: চাপ বাড়ছে ইসির ওপর
Manual7 Ad Code
পোস্টাল ব্যালট– ভোট পদ্ধতিতে ভোটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭০০ টাকা। এই ব্যয়ের মধ্যে ব্যালট ছাপানো, ডাকযোগে পাঠানো ও ফেরত আনা এবং প্রশাসনিক খরচ অন্তর্ভুক্ত। দেশের ভেতরে ৭ লাখ ৬০ হাজারের বেশি ভোটারের জন্য আসনভিত্তিক ব্যালট ছাপাতে এ খাতে ইসির ব্যয় বাড়বে না। কারণ এর আগে শুধু প্রবাসী ভোটারদের জন্য প্রতীক সম্বলিত ব্যালট ছাপিয়েছিল ইসি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে মোট ১৫,৩৩,৬৮৩ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন, যার প্রায় অর্ধেক প্রবাসী।
আর দেশের অনেক আসনে পোস্টাল পদ্ধতিতে ভোটের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যা সরাসরি জয়-পরাজয়ের ফল নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। এমন বাস্তবতায় দেশে ও প্রবাসে ভিন্ন ধরনের ব্যালট ব্যবস্থাপনা ভবিষ্যতে আরও প্রশ্ন তৈরি করতে পারে– এমন আশঙ্কাও করছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা।
পোস্টাল ব্যালট নিয়ে বিতর্কের প্রেক্ষাপটে ইসির এই অবস্থান পরিবর্তনকে কেউ কেউ ইতিবাচক সংশোধন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন¬– এটি শুরুতেই সঠিক পরিকল্পনার অভাবের স্বীকৃতি। ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমিন টুলীর মতে, দেশের জন্য আলাদা ব্যালট ছাপানো– ইসির এই সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। প্রথমবার এত বড় পরিসরে পোস্টাল ভোট চালু হওয়ায় ভুলত্রুটি থাকতেই পারে। তবে সময়মতো সিদ্ধান্ত বদলে আস্থা ফেরানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।