এক দিন বাদেই মাঠে গড়াবে আনুষ্ঠানিক ভোটযুদ্ধ। যে যুদ্ধে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী জোটের দ্বিমুখী লড়াইয়ের পাশাপাশি রয়েছে ইসলামী আন্দোলনের মতো বড় দল। তাদের মধ্যে কথার উত্তাপ, আদর্শিক লড়াই ইতিমধ্যে শুরু হয়ে অনেকদূর গড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত কে মাঠের কৌশলে নিজেদের এগিয়ে রাখতে পারে, সেটিই বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
Manual7 Ad Code
প্রথমবারের মতো অনেকটা একক শক্তি নিয়ে নির্বাচন করতে যাওয়া জামায়াত ভোটের প্রচারে কোন পন্থায় ভোটার টানবে, সেটিও থাকবে আলোচনার কেন্দ্রে। তারেক রহমানের সশরীরে উপস্থিতি বিএনপির প্রত্যাশিত জোয়ার জয়ের বন্দরে পৌঁছাবে বলে প্রত্যাশা নেতাকর্মীদের। জামায়াতের আচরণে গোসসায় জোটত্যাগী ইসলামী আন্দোলনও ফণা তুলতে চায় ভোটের মাঠে। আর নীরবে মাঠে পড়ে থাকতে চায় গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বিতর্কিত জাতীয় পার্টি।
তফসিল অনুযায়ী, ২১ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে। এরপর ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হবে আনুষ্ঠানিক প্রচার। বিএনপি জানিয়েছে, তাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২২ জানুয়ারি সিলেট সফরে যাবেন। সিলেটে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতের মধ্য দিয়ে তারেক রহমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার শুরু করবেন।
এরই ধারাবাহিকতায় মৌলভীবাজারে একটি জনসভায় যোগ দেবেন তারেক রহমান। এরপর তিনি শ্রীমঙ্গলে নির্বাচনি পথসভায় বক্তব্য রাখবেন। ঢাকায় ফেরার সময় তিনি বিভিন্ন স্থানে পথসভা-জনসভায় অংশ নেবেন। ভোটের প্রচার শুরুর বিষয়ে সম্প্রতি তারেক রহমান এক অনুষ্ঠানে বলেন, সামনে নির্বাচন। আমি একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য। স্বাভাবিকভাবেই আমরা ২২ জানুয়ারি থেকে আমাদের সবরকম পরিকল্পনা নিয়ে জনগণের সামনে যাব।
আর জামায়াত জানিয়েছে, নির্বাচনের প্রচারে অংশ হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ২৩ ও ২৪ জানুয়ারি উত্তরবঙ্গ সফর করবেন।
সফরের প্রথম দিন ২২ জানুয়ারি তিনি তার নির্বাচনি এলাকা ঢাকা-১৫-এ গণসংযোগ করবেন এবং একটি নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য রাখবেন। পরদিন ২৩ জানুয়ারি দুপুর ২টায় দিনাজপুর জেলা জামায়াতের উদ্যোগে স্থানীয় গোর-ই-শহিদ ময়দানে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন। একই দিন বিকাল ৪টায় ঠাকুরগাঁওয়ে এবং সন্ধ্যায় বিভাগীয় শহর রংপুরে আয়োজিত পৃথক জনসভায়ও তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্য দেবেন।
অন্য দলগুলোও তাদের প্রচার পরিকল্পনা সাজাচ্ছে একইভাবে।
বিএনপি জানিয়েছে, তাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’-এর কথা বলেছে তা ‘আর্ট কার্ড’-এর মাধ্যমে জনগণের কাছে তুলে ধরবেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের জন্য ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে প্রতিটি সংসদীয় আসনভিত্তিক ‘সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজার’ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সেখানে তারা এগুলো প্রচার করবেন।
Manual4 Ad Code
ঢাকা-৪ আসনের ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন বলেন, আমরা অনেক ধরেই মাঠে আছি। এখন পর্যন্ত আমার আসনে কোনো ঝামেলা সৃষ্টি হয়নি। গোটা ঢাকায় বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটেছে। আমরা বড় কোনো ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা করছি না। তবে প্রচারের শুরুর দিন থেকে আমরা সতর্ক থাকব। ভোট বানচালে আওয়ামী লীগ নানা ষড়যন্ত্র করবে। তবে আশা করি ভোট উৎসবমুখর হবে।
বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াত প্রশ্নে তিনি বলেন, তারা যেভাবে প্রচার চালাচ্ছে, তা খুবই ভ্রান্ত চিন্তা। জামায়াতকে নতুন করে চেনার কিছু নেই। তারা প্রত্যেক সরকারের সঙ্গে ছিল। ১৯৭১-এর আগে ও পরে মানুষ জামায়াতের চরিত্র দেখেছে। সুতরাং তাদের কথায় মানুষ ভোট দেবে না।
তবে ঠিক বিপরীত বক্তব্য জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও এমপি প্রার্থী আতাউর রহমান সরকারের। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠ সমতল নয়। প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। এভাবে চলতে থাকলে মানুষের মনে নির্বাচন সুষ্ঠু না হওয়ার যে শঙ্কা ভর করেছে, তা আরও ঘনীভূত হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের এই নেতা বলেন, আমরা কখনোই ক্ষমতায় ছিলাম না। ২০০১ সালে জোট সরকারের সময় আমাদের দুজন মন্ত্রী ছিল। তাদের সততা ও দায়িত্বশীলতা জনগণ প্রত্যক্ষ করেছে। আমরা বলার চেষ্টা করছি, ৫৪ বছরে কেউ শান্তি উন্নয়ন সর্বোপরি ইনসাফের রাষ্ট্র কায়েম করতে পারেনি। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে মায়া, মমতার ও ভালোবাসার সমাজ গড়ে তুলবে। যেখানে থাকবে না চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি।
Manual2 Ad Code
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত পিরোজপুর-২ আসনের প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ বলেন, এখন পর্যন্ত মাঠে লেভেল প্লেয়িং নেই। তবে প্রার্থীরা এখনও লেবেল প্লেয়িংয়ে আছে। খেলা মাঠে গড়ানোর পর দেখা যাবে কে কেমন খেলে এবং ফাউল করে। তবে আশঙ্কা হচ্ছে, এই প্রশাসন দিয়ে সরকার একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে পারবে না। আর নির্বাচন কমিশন শুরুতেই ও ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও এমপি প্রার্থী ডা. আব্দুল আহাদ বলেন, নির্বাচন কমিশন একপক্ষীয় আচরণ করছে। স্থানীয় প্রশাসন অনেক জায়গায় একটি দলের নেতাদের কথায় ওঠে-বসে। তারা ধরেই নিয়েছে কোন দল ক্ষমতায় আসবে। সে অনুয়ায়ী আচরণ করছে। তাই তারা একটি দলের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আমরা উদ্বিগ্ন তবে ময়দান ছাড়ব না। কাউকে মাঠ খালি করে দেব না। লড়াই চালিয়ে যাব।
এদিকে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটি হুঁশিয়ারি দিয়েছে, ২০০৮ সালের মতো ‘ভারসাম্যহীন’ নির্বাচন তারা মেনে নেবে না। সোমবার নির্বাচনের নানা বিষয় নিয়ে সাংবাদিকদের কাছে দলীয় অবস্থান জানানোর সময় এ হুঁশিয়ারি দেন জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি বিশেষ দলের প্রতি পক্ষপাত করছে। প্রধান উপদেষ্টা এর প্রতিকার না করলে জামায়াত শক্তিশালী পদক্ষেপ নেবে। ২০০৮-এর মতো ভারসাম্যহীন নির্বাচন জামায়াত মেনে নেবে না।
আর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০০৮ সালের নির্বাচনের মতো হবে না বলে জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তার মতে, এবারের নির্বাচন হবে ১৯৯১ সালের মতো। সোমবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন।
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের সংশয় দেখছি না। কারও পক্ষ থেকে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কোনো পরিকল্পনা থাকলে প্রতিহত করা হবে। আমরা মনে করি, এবারের নির্বাচন ২০০৮-এর মতো নয়, ৯১ সালের মতো হবে।
নির্বাচনে সুষ্ঠু ভোট ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকলে জাতীয় পার্টি ৪০ থেকে ৭০টি আসন পেতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন দলটির একাংশের মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী। সময়ের আলোর সঙ্গে আলাপকালে শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ভোটের মাঠ অত্যন্ত ফ্লুইড বা অনিশ্চিত। যদি সুষ্ঠু ভোট হয়, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকে, আমি মনে করি ৪০ থেকে ৭০টি আসন পাব।
তবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমরা এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনকে দেখেছি যে, মোটামুটিভাবে তারা যোগ্যতার সঙ্গে কাজ করছে। যে দুয়েকটা সমস্যা মনে করেছি সেটা আমরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সামনে তুলে ধরেছি। আমরা বিশ্বাস করি— নির্বাচন কমিশন যোগ্যতার সঙ্গে এই নির্বাচন পরিচালনা করতে সক্ষম হবে।
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরে পুষ্পমাল্য অর্পণের পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব এ মন্তব্য করেন। ভোটে সমান সুযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ আমাদের নেই।
ঢাকা-১৮ আসনের ভোটার বেসরকারি চাকুরে মাহবুবুর রহমান বলেন, ভোট উৎসবমুখর হবে বলেই প্রত্যাশা করছি। তবে ভোটের পরিবেশ কেমন হবে এই চিত্র আরও দিন গেলে বলা যাবে। ভোটযুদ্ধ তো পুরোদমে এখনও শুরু হয়নি। নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন কঠোর থাকলে ভোটের পরিবেশ সুষ্ঠু থাকবে। তবে প্রতি ভোটেই কিছু শঙ্কা থাকে। এবারও বেশ কিছু শঙ্কা আছে।
গাজীপুরের বাসিন্দা নতুন ভোটার মোশতাক আহমদের মতে, বিগত তিন নির্বাচনে অনেকেই ভোট দিতে পারেনি। আশা করি এবার তারা ভোটের অধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। পরিবেশ কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার মতো থাকবে। নিজের ভোট দিতে কেউ কাউকে বাধা কিংবা হুমকি দেবে না।
এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. সাহাবুল হক বলেন, প্রায় দুই যুগ ধরে বাংলাদেশের মানুষ তাদের ভোটাধিকার সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারেনি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনই ছিল বিতর্কিত, ধোঁকাবাজির নির্বাচন এবং জোরপূর্বকভাবে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার নির্বাচন। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঘিরে মানুষের মনে যেমন প্রত্যাশা রয়েছে, তেমনি গভীর শঙ্কাও কাজ করছে।
এই বিশ্লেষক মনে করেন, নির্বাচন কমিশন ক্রমশ রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে— এমন অভিযোগ জনমনে জোরালো হচ্ছে। অনেক ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিককে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, যা আইন ও নৈতিকতার পরিপন্থী। এই ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের সুযোগ দেওয়ার জন্য ২০২৪ সালের আগস্টের ছাত্রঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়নি, শত শত তরুণ তাদের জীবন দেয়নি এমন অনুভূতিও জনগণের মধ্যে রয়েছে।
তিনি বলেন, ভোটের মাঠে প্রভাব বিস্তারকারী তিনটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে দুটি দল প্রকাশ্যে জানিয়েছে যে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ ধীরে ধীরে কলুষিত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের মধ্যে হুমকি-ধমকির ঘটনা ঘটছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
Manual8 Ad Code
এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এই সংকট থেকে উত্তরণে নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীল আচরণ ও পারস্পরিক আস্থার পরিচয় দিতে হবে। অন্যথায় নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব হবে না এবং পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে— এই আশঙ্কা থেকেই যায়।