প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১লা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৪ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

সংকটে স্বল্প পুঁজির উদ্যোক্তারা

editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬, ০৯:৪৫ পূর্বাহ্ণ
সংকটে স্বল্প পুঁজির উদ্যোক্তারা

Manual2 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে জর্জরিত স্বল্প পুঁজির উদ্যোক্তাদের টিকে থাকাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি) খাতের এসব উদ্যোক্তা কঠিন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।

অর্থনীতির বিশ্লেষক ও শিল্প খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের বাজারে প্রায় সব ধরনের কাঁচামালের দাম বেড়েছে। শ্রমিকের মজুরি, কারখানা ভাড়া, যাতায়াত খরচও এখন বেশি। সবকিছু মিলিয়ে ব্যবসায়ের খরচ বেড়েছে। অন্যদিকে নিম্নমানের আমদানি করা পণ্যে বাজার সয়লাব। ন্যূনতম লাভ রেখে বিক্রি করলেও নিম্নমানের এসব পণ্যের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় পড়েছে এসএমই খাতের উৎপাদিত পণ্য। মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপটেও এসএমই উদ্যোক্তারা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না।

তারা এসএমই খাতের দূরবস্থার জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে টানাপোড়ন, ডলারের উচ্চমূল্য, রাজনৈতিক অস্থিরতাকে দায়ী করেছেন।

Manual3 Ad Code

অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার পরিবর্তন হলেও ব্যাংকঋণে সুদহার কমেনি। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি হয়েছে। এসবের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে এসএমই খাতের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না বলে তারা মন্তব্য করেছেন।

এসএমই ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ‘এসএমই খাত একটি দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে এ খাত ভূমিকা রাখছে। ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন থেকে পুঁজির সংকট, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার অভাব ও বিনিয়োগে ঘাটতি, রপ্তানি বাজারে অনুপ্রবেশের অক্ষমতা, চাহিদামতো নীতিসহায়তা না থাকায় এসএমই খাতে সংকট কাটছে না।’

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশেই শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। এতে বেশির ভাগ কাঁচামাল আমদানিতে খরচ বেড়েছে। অন্যদিকে এসএমই উদ্যোক্তারা বেশির ভাগই উপজেলায় বসবাস করেন, সেখানেই ব্যবসা করেন। আমদানি করা এবং দেশে উৎপাদিত সব ধরনের কাঁচামাল পাইকারি ব্যবসায়ী, আড়তদার, মধ্যস্বত্বভোগী–বিভিন্ন হাত ঘুরে রাজধানী, বিভাগ ও জেলা হয়ে যখন এসএমই উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছায়, তখন দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বেশি দামের কাঁচামাল দিয়ে পণ্য উৎপাদন করে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশের বাজারে উৎপাদন সূচকের ক্রমাগত পতন ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের উদ্যোক্তাদের আঘাত করছে। অন্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকও এসএমই খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা স্বল্পপুঁজির মানুষদের জন্য যা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে।’

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, পর্যাপ্ত পুঁজি থাকার কারণে বড় মাপের ব্যবসায়ীরা অনেক ধরনের আঘাত কাটিয়ে উঠতে সক্ষম। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে এসব ব্যবসায়ীকে সহজে ঋণ দেয়। কিন্তু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এসএমই খাতের ব্যবসায়ীদের ঋণ দিতে আগ্রহী হয় না। সাধারণত দুটি কারণে তারা ঋণ পান না। একটি হলো–ছোট ঋণে ব্যাংকের লাভ কম। অন্যটি, এসএমই উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়ার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকে না। সরকার চেষ্টা করলে এসএমই খাতে ঋণপ্রবাহের দ্রুত উন্নয়ন ঘটাতে পারে। কোনো সরকারই এ সমস্যার সমাধান করেনি।

Manual6 Ad Code

এসএমই নিয়ে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের আয় ও সঞ্চয় সীমিত। ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা কম। বর্তমানে অপর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ, অবকাঠামোগত ঘাটতি, বাজারে বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণে এসএমই খাতের ব্যবসাযীরা টিকে থাকার কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়েছেন। ক্রমাগত লোকসানে এরই মধ্যে অনেক এসএমই প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধের পথে।

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের তথ্যানুসারে, দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮০ শতাংশ এসএমই খাত থেকে আসে। জিডিপিতে এই খাতের অবদান ২৫ শতাংশের বেশি।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, ‘নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, আঞ্চলিক ভারসাম্যহীনতা দূর করা ও নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে এসএমই খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পুঁজির সংকট। এসএমই খাতের বিকাশ হলে বাংলাদেশ শক্তিশালী উদ্যোক্তানির্ভর অর্থনীতি হিসেবে দাঁড়াতে পারবে। কিন্তু বর্তমানে টিকে থাকার লড়াইয়ে আছেন এসব উদ্যোক্তা। বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনসহ সরকারকে জোরালোভাবে স্বল্পপুঁজির উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। না হলে দেশের অর্থনীতিতে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে।’

নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠন ওয়েব ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেছেন, বাংলাদেশের শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে এ সংকট মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। ২০২৩-২৪ সালে গ্যাসের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়ানোর পর সম্প্রতি শিল্প খাতে আরও ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে টেক্সটাইল, স্টিল ও সারের মতো সেক্টরগুলোর উৎপাদন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কমেছে। জ্বালানির অভাবে এসএমই খাতের কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে হচ্ছে।

Manual5 Ad Code

বিদায়ী সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সুরক্ষা এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা চেয়েছিলেন।

বাংলাদেশের শিল্পনীতির সংজ্ঞা অনুযায়ী ১৬ থেকে ৩০০ জন পর্যন্ত কর্মীর প্রতিষ্ঠান অণু, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অন্তর্ভুক্ত। এমএসএমই খাত পণ্য ও পরিষেবার ৩৩টি উপখাতে বিভক্ত।

শিল্প খাতের জরিপ অনুযায়ী দেশে গৃহকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া ৪৬ হাজার ২৯১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে, যেসব প্রতিষ্ঠানের ৯৩ শতাংশই অণু, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এই জরিপ অনুযায়ী অণু, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত কর্মসংস্থানের ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ অবদান রাখছে, যা জিডিপির ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ।

Manual3 Ad Code

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ৯০ শতাংশ ব্যবসা এবং ৫০ শতাংশের অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রাখছে। তাদের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় আট লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা দেশের ৮৭ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখছে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, মুদ্রানীতির কারণে এসএমই খাতটি সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। এর কারণ বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং উৎপাদন কমে যাওয়ায় মূলধনের অভাব দেখা দিয়েছে। এসএমই খাতের বিকাশ না হলে অর্থনীতির বিকাশ হবে না।

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এবং নতুন সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশগুলোর মোট জিডিপির ৬০-৭০ শতাংশে এসএমই অবদান রাখে। ২০৪১ সালের মধ্যে আমাদের ৩ ট্রিলিয়ন ডলার লক্ষ্য অর্জনের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা প্রয়োজন। এ জন্য আলাদা এসএমই ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। এসএমইকে সহায়তার জন্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি শুল্ক বাড়ানো এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোয় গুরুত্ব দিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘এসএমই পণ্য ডিজাইন, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিকে সুসংহত ও সমন্বিত পদ্ধতিতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর দিকে মনোনিবেশ করা উচিত।’ মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার কিছুদিন আগে আবদুল আউয়াল মিন্টু এই কথাগুলো বলেছিলেন।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০৩১

Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code