প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৯ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

আরেকটি মূল্যস্ফীতির ঝড় মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

editor
প্রকাশিত মার্চ ১২, ২০২৬, ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ
আরেকটি মূল্যস্ফীতির ঝড় মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

Manual7 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতা আবারও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে— আরেকটি সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতির ঝড় মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত?

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাত পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সেই যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি, খাদ্য ও সার বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব বাংলাদেশের বাজারেও দীর্ঘদিন ধরে অনুভূত হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারের সংকট এবং আমদানি ব্যয় বাড়ার কারণে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি কয়েক বছর ধরেই চাপের মধ্যে রয়েছে।

এখন আবার নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সংঘাত তীব্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। সোমবার (৯ মার্চ) লেনদেন চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) নিকটতম মেয়াদের ফিউচার প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৮ ডলার ছাড়িয়ে যায়। একই সময়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দামও ১১৬ ডলারের বেশি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে বড় কারণ হলো— হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যায়। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এ পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

 

অর্থনীতিতে সম্ভাব্য চাপ

বাংলাদেশ জ্বালানি ও সার— দুটোরই বড় অংশ আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব দ্রুত দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়ে, বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বাড়ে, সেচ ও কৃষি উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধি পায়। একইসঙ্গে জাহাজ ভাড়া বাড়ার কারণে আমদানি ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব ব্যয় শেষ পর্যন্ত খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে প্রতিফলিত হয়। অর্থাৎ বৈশ্বিক তেলের বাজারের ধাক্কা ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়ে গিয়ে পৌঁছায়।

এই বাস্তবতা নতুন নয়। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে উঠে যায়। কয়েক বছর ধরে তা উচ্চ পর্যায়েই রয়ে গেছে।

 

মূল্যস্ফীতির চাপ এখনও বেশি

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে, যা গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ— ১৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়লে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ওপর। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য ব্যয়ের পেছনে চলে যায়।

মজুরি প্রবৃদ্ধির চিত্রও উদ্বেগজনক। সর্বশেষ হিসাবে মজুরি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ০৬ শতাংশে। অর্থাৎ টানা প্রায় চার বছর ধরে আয়ের বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

Manual5 Ad Code

 

ডলারের বাজারেও চাপ

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার প্রভাব বৈদেশিক মুদ্রার বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। ব্যাংকগুলো প্রবাসী আয়ের ডলার কিনছে প্রায় ১২২ টাকা ৯০ পয়সা দরে। এর ফলে আমদানির ক্ষেত্রে ডলারের দাম প্রায় ১২৩ টাকায় পৌঁছে গেছে।

Manual7 Ad Code

এক সপ্তাহ আগেও আমদানিতে ডলারের দর ছিল প্রায় ১২২ টাকা ৫০ পয়সা। অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যেই ডলারের দামে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।

ব্যাংক ও ব্যবসায়ী সূত্রে জানা গেছে, এলসি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও ব্যাংকগুলো প্রতি ডলারে ১৫ থেকে ২০ পয়সা বেশি দাম নিচ্ছে। বর্তমানে আমদানি ঋণপত্র নিষ্পত্তিতে প্রতি ডলারের দর ১২২ টাকা ৮০ পয়সা থেকে ১২২ টাকা ৯০ পয়সা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডলারের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

 

অর্থনীতির ভঙ্গুরতা বাড়ছে

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অর্থনীতির কয়েকটি সূচকও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে টানা সপ্তম মাসের মতো রফতানি কমেছে। অপরদিকে জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬ শতাংশে, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের মাসিক ইকোনমিক আপডেটেও উল্লেখ করা হয়েছে, রাজস্ব ঘাটতি এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের দুর্বলতা অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করছে।

Manual2 Ad Code

অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব সূচক দেখায় যে অর্থনীতি এখনও পুরোপুরি শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়াতে পারেনি।

 

নীতিনির্ধারকদের সামনে কঠিন সমীকরণ

বর্তমান পরিস্থিতি মুদ্রানীতির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের দ্বিধা তৈরি করেছে। মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যে বেশি থাকায় সুদের হার কমিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। আবার সুদের হার আরও বাড়ালে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

Manual1 Ad Code

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘‘বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা হলো কৌশলগত জ্বালানি মজুতের অভাব। অনেক দেশেই জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য তেলের স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ থাকে, যা সংকটের সময় বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।’’

তিনি বলেন, “বর্তমানে আতঙ্কে বেশি পরিমাণে জ্বালানি কেনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বাজারকে আস্থায় আনা এবং জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।”

তার মতে, স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মধ্যমেয়াদে কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলা প্রয়োজন।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘‘বর্তমান সময়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে নানা ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাই সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।’’

সামনে কী অপেক্ষা করছে

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ কত দ্রুত স্বাভাবিক হয় তার ওপর।

যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে স্থায়ীভাবে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ এবং পরিবহন ব্যয় দ্রুত বাড়তে পারে। এতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও মন্দার আশঙ্কা বাড়ছে। জ্বালানির দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে সাধারণত ভোক্তা ব্যয় কমে যায় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ধীর হয়ে পড়ে। এতে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’— অর্থাৎ উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ধীর প্রবৃদ্ধির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

 

প্রস্তুতি কতটা

বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা সরাসরি দেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতি হওয়ায় এসব ধাক্কা পুরোপুরি এড়ানোর সুযোগ খুব সীমিত।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শক্তিশালী নীতি সমন্বয়, ডলার বাজার স্থিতিশীল রাখা, খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়াতে পারলে সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতির ঝড় কিছুটা হলেও মোকাবিলা করা সম্ভব।

আগামী কয়েক মাসে বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট— যদি আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আবারও একটি কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code