প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

৩রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৯শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২০শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

ছিনতাই-চুরির মামলায় জামিন ‘ডালভাত’, বারবার একই অপরাধ

editor
প্রকাশিত এপ্রিল ২২, ২০২৬, ০১:৩৯ অপরাহ্ণ
ছিনতাই-চুরির মামলায় জামিন ‘ডালভাত’, বারবার একই অপরাধ

Manual2 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

মাত্র এক মাস আগে ইমন ও শিপন নামে দুই যুবক ছিনতাইয়ের মামলায় গ্রেফতার হন। মাস যেতে না যেতেই জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে আবারও যুক্ত হন ছিনতাইয়ের কাজে। পুলিশের হাতে ধরা খান ফের।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নবীনগর এলাকা থেকে গত ১৮ মার্চ ফের গ্রেফতার হন ইমন ও শিপন। এবারও তারা মোহাম্মদপুরের নবীনগর ৯ নম্বর সড়কে স্টেডফাস্ট কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারিম্যানকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে নগদ টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেন।

 

মো. শাহাদাত চুরির মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে ছিলেন এক মাস। সেখান থেকে জামিনে বের হন মাত্র চার দিনে। এরপর আবার চুরি করেন এবং পুলিশের হাতে আবারও গ্রেফতার হন। পুলিশ জানায়, গ্রেফতার শাহাদাত স্বর্ণালংকার চুরি করে নিজের স্ত্রীকে দেন। এরপর স্ত্রী সেই স্বর্ণালংকার জুয়েলারি দোকানে বিক্রি করতেন।

মো. সেলিম নামে এক যুবকের ছিনতাইকারী হিসেবে নাম রয়েছে পুলিশের খাতায়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তিনি নিউমার্কেট ও কামরাঙ্গীরচর এলাকায় ছিনতাই করেন। তার নামে ঢাকার বিভিন্ন থানায় অন্তত ১১টি মামলা রয়েছে। ২০১৬ সালে প্রথমবার তাকে গ্রেফতার করা হয় ঢাকার কোতোয়ালি থানা এলাকা থেকে। তখন দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন। এরপর জামিনে বেরিয়ে ফের শুরু করেন ছিনতাই। পরে আরও ১০ বার গ্রেফতার হন, তবে প্রতিবারই জামিনে বেরিয়েছেন এবং যথারীতি জড়িয়ে পড়েছেন অপরাধে।

ইমন শিপন, শাহাদাত কিংবা সেলিমের মতো ঢাকায় অনেক ছিনতাইকারীই গ্রেফতারের এক থেকে তিন মাস পর জামিনে বেরিয়ে আসেন। কেউ আবার বের হন সপ্তাহের ব্যবধানেই।

পুলিশ ও আইনজীবীরা বলছেন, চুরি-ছিনতাইয়ের মামলায় জামিন ডালভাতের মতো সহজ ব্যাপার। জামিনে বাইরে এসে আবারও অপরাধ জগতে বিচরণ শুরু করেন ছিনতাইকারীরা।

 

সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকায় দাপিয়ে বেড়ায় আট হাজারের বেশি ছিনতাইকারী। তাদের বড় অংশের নামে ১০টির বেশি ছিনতাই ও মাদক মামলা রয়েছে। আর ৫-৯টি মামলা রয়েছে অর্ধেকের বেশি ছিনতাইকারীর নামে। এসব মামলায় অনেকের সাজা হয়ে গেছে। তারপরও তাদের কাছে কারাগার নিছক ডালভাত।

পুলিশ বলছে, ছিনতাই মামলার আসামিদের জামিন করিয়ে আনা আইনজীবীদেরও দায়বদ্ধতা রয়েছে। তারা এসব আসামির বিষয়ে খোঁজখবর রাখবেন বলে আদালতের কাছে অঙ্গীকার করলেও জামিনের পর আর কোনো খোঁজ রাখেন না।

 

ছিনতাইয়ের শিকার হলেও পুলিশের দ্বারস্থ হন না অনেকে

ডিএমপির অপরাধ পরিসংখ্যানের সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে ১ হাজার ৪৬৪টি। এর মধ্যে ছিনতাই করে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ৮২০টি। ছিনতাইয়ের সময় হাতেনাতে আটক ৬৪৪টি। এ সময়কালে অপরাধের ঘটনা ক্রমাগত বেড়েছে। তবে ছিনতাইয়ের ঘটনা এর চেয়ে অনেক বেশি বলে ধারণা পুলিশের। অনেকেই ছিনতাইয়ের শিকার হলেও পুলিশের দ্বারস্থ হতে চান না।

Manual2 Ad Code

 

বেশিরভাগ আসামিই ভাসমান ও উঠতি বয়সী

ছিনতাইকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঢাকায় ভাসমান ও উঠতি বয়সী তরুণরা বেশি জড়িয়ে পড়ছে এ অপরাধে। রাজধানীজুড়ে বেশ কয়েকটি ছিনতাই গ্রুপের দাপট রয়েছে। এর মধ্যে বংশাল, তাঁতীবাজার ও ফুলবাড়ী বাসস্ট্যান্ড এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেন কয়েকজন রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি। প্রাথমিক পর্যায়ে কেউ এককভাবে ছিনতাই শুরু করলেও একপর্যায়ে তাকে গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হতে হয়। গ্রুপে থাকলে জামিন পেতে বেশ সুবিধা হয়।

 

মাদকাসক্তরা উপার্জনের জন্য ছিনতাই ছাড়ে না

পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ছিনতাইকারী চক্রের অধিকাংশ সদস্যই মাদকাসক্ত। তারা সহজে টাকা উপার্জনের জন্য ছিনতাই ছাড়ে না। তারা বের হয়ে আবার একই অপরাধে জড়ায়। ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যদের নির্ধারিত আইনজীবী রয়েছে। জামিনে বের হয়ে আইনজীবীর টাকা পরিশোধ করে তারা। এছাড়া আদালতও কিশোর অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে জামিন দিয়ে দেন।

জেল থেকে জামিনে বেরিয়ে ফের ছিনতাই, হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ছিনতাই প্রতিরোধ টাস্কফোর্সের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৯ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এক বছরে ছিনতাইয়ের সময় হাতেনাতে গ্রেফতার হয়েছে ১ হাজার ৮৪১ জন। জামিন পেয়েছে ১ হাজার ৭৮৬ জন। এ সময় ২৭৭টি ছিনতাই মামলা করা হয়েছে। গ্রেফতার ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে ১১২টি মামলা হয়েছে। এসব ছিনতাইকারীর মধ্যে বেশিরভাগই জামিনে বেরিয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়েছে। এমনকি জামিনের তিনদিন পরই ছিনতাই করতে গিয়ে গ্রেফতারের নজিরও রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আদালত অপরাধের মাত্রা বা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে যে কাউকে জামিন দিতে পারেন। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মামলার তদারকিতে উদাসীনতা প্রকৃত অপরাধীর জামিন পাওয়ার পথ তৈরি করে। পেশাদার অপরাধীরা জামিনে বেরিয়ে গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

 

জামিন পেয়ে ফের ছিনতাই

এর আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তৎকালীন র‌্যাব মহাপরিচালক (ডিজি) এ কে এম শহিদুর রহমান জানান, তারা কয়েক মাসে কয়েকশ ছিনতাইকারী গ্রেফতার করেছে। কিন্তু তারা আবার আদালত থেকে জামিন নিয়ে ছিনতাই কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ছেন।

Manual4 Ad Code

সরকারপক্ষের আইনজীবীদের দৃষ্টি আকর্ষণ ও অনুরোধ জানিয়ে র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, আদালতে ছিনতাইকারীদের কার্যকলাপ ও এর ভয়াবহতা, জনজীবনে কী পরিমাণ অশান্তি তৈরি করছে তা তুলে ধরেন, যাতে আদালত জামিন দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

Manual8 Ad Code

 

জামিন পেয়ে ফের অপরাধে জড়ানোর সংখ্যা বেশি মোহাম্মদপুরে

১৯ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদপুর থানার বছিলা সিটি ডেভেলপার্স এলাকায় এক গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবসায়ীর কাছে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন মো. ফারুক ও তার সহযোগীরা। চাঁদা না দিলে গুলি করার হুমকি দেন। একপর্যায়ে দোকানের কর্মচারীকে ইলেকট্রিক শক দিয়ে চলে যান তারা। একই দিন বছিলার ৪০ ফিট রোডে এ কে পিচ টাওয়ারের সব দোকান বন্ধ রাখারও নির্দেশ দেয় তারা। দোকানের সিসি ক্যামেরায় এ দৃশ্য ধরা পড়ে।

Manual6 Ad Code

পরে এ ঘটনায় জড়িত ফারুককে (৫০) গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর ফারুককে নিয়ে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে মাইকিংও করেছিল পুলিশ। ঘটনাটি সে সময় বেশ আলোচনা তৈরি করেছিল।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চাঁদাবাজির ঘটনায় তিনবার সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন ফারুক। জামিনে বের হয়ে আবার একই অপরাধে অপরাধে জড়ান। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।

 

এছাড়া আদাবরের আবির এমব্রয়ডরি কারখানায় হামলার ঘটনায় গ্রেফতার রোহান খান রাসেলের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় গ্রেফতারও হন তিনি। এমন ঘটনা মোহাম্মদপুরেই বেশি।

মোহাম্মদপুরে আসামি জামিন এবং ফের একই কর্মকাণ্ডে জড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা বলেন, ‘জেল থেকে বের হওয়ার পরপরই আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমরা লক্ষ্য করছি, কিছু অপরাধী সকালে জামিনে বের হয়ে বিকেলেই আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়, সমাজের জন্যও বড় হুমকি।’

তিনি বলেন, ‘অপরাধীর পরিবারের সদস্যরা যদি বারবার জামিন করিয়ে এনে তাদের অপরাধের সুযোগ করে দেন, তাহলে অপরাধ প্রবণতা কমানো কঠিন হয়ে পড়ে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, অপরাধ থেকে উপার্জিত অর্থ পরিবারের সদস্যরাও ভোগ করছেন। এতে তারা পরোক্ষভাবে অপরাধকে উৎসাহিত করছেন কি না সেটিও বিবেচনার বিষয়।’

এডিসি জুয়েল রানা আরও বলেন, ‘একজন অপরাধীকে শুধু গ্রেফতার করাই সমাধান নয়, তাকে সমাজে ফিরিয়ে আনতে পরিবার ও সামাজিকভাবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা জরুরি।’

 

জামিনের পর প্রতি সপ্তাহে ওসির কাছে হাজিরা

কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবারিরা গ্রেফতার হয়ে কিছুদিন পর জামিনে এসে আবার একই অপরাধ করে। এক্ষেত্রে আপনাদের পদক্ষেপ কি থাকবে- এ বিষয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘এলাকাভিত্তিক তালিকা থাকবে। জামিনে আসার পর প্রতি সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট থানার ওসির কাছে হাজিরা দেবে। এই প্রক্রিয়া শিগগির শুরু করতে চাই।’

 

আইনে দুর্বল ধারা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল ধারায় মামলা সাজানো বা অপরাধের বিবরণকে হালকা করে দেখিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের ফাঁক গলে বের করে আনা হয়। বিষয়টি শুধু বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশাকেও আঘাত করে।’

তিনি বলেন, ‘যদি সত্যিই এমন অনিয়ম ঘটে, তবে সেটি খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি। কারণ বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে জামিন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা দরকার।’

 

পুলিশের দেওয়া আইনি ধারা ও প্রমাণের অভাব

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘অপরাধীদের জামিন পাওয়া অনেকাংশেই নির্ভর করে পুলিশের দেওয়া ফরওয়ার্ডিং রিপোর্টের গুণগত মানের ওপর। যদি প্রতিবেদনে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকে বা এমন কোনো সন্দেহ তৈরি হয় যে ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে অপরাধী কি না, তবে আদালত জামিন দেওয়ার বিধান অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়। এছাড়া পুলিশ কাকে গ্রেফতার করছে, প্রকৃত অপরাধীকে নাকি অন্য কাউকে, তার ওপরও মামলার গতিপ্রকৃতি নির্ভর করে।’

তিনি বলেন, ‘কোনো অপরাধী যদি বারবার একই অপরাধ করে এবং প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হয়, তবে আদালত সাধারণত তাদের জামিন দেন না। তবে পুলিশের প্রতিবেদনে যদি জেনুইন (প্রকৃত) অপরাধীকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা না হয়, তবে বিচার প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়।’

অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘আইন অনুযায়ী গুরুতর অপরাধীদের সাধারণত জামিন দেওয়া হয় না। অপরাধীদের দ্রুত জামিন পাওয়ার পেছনে পুলিশের দেওয়া আইনি ধারার প্রয়োগ ও প্রমাণের অভাব একটি বড় কারণ। তদন্ত প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা ও আদালতের ওপর রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে অপরাধীদের বারবার ছাড়া পাওয়ার এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code