আইন অনুযায়ী বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আহমেদের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৮ সালের এপ্রিলে। এরই মধ্যে তাকে নিয়ে বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে নানা সমালোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ায় তাকে ‘ফ্যাসিস্টদের দোসর’ আখ্যা দিচ্ছে সরকারবিরোধীরা। তারা তাঁকে অপসারণেরও দাবি জানিয়ে আসছে। প্রশ্ন উঠেছে, তিনি কি পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারবেন?
গত ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়াকে কেন্দ্র করে এনসিপি ও জামায়াতসহ বিরোধী দলের তীব্র বাধার মুখে পড়েন তিনি। তবে বিরোধী পক্ষের নানা বিরোধিতার পরও তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন দল তার ব্যাপারে নেতিবাচক কোনও মন্তব্য করেনি। বরং অনেকটাই তার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে রাষ্ট্রপতিকে যথাযথ প্রটোকল দেওয়া হচ্ছে। তিনিও বিএনপির পক্ষে, আর আওয়ামী লীগের বিপক্ষে প্রকাশ্যে মন্তব্য করছেন। তাই তাকে সরিয়ে দেওয়ার গুঞ্জন থাকলেও অনেকে বলছেন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার স্বার্থেই সরকার তাকে সরাবে না। এত কিছুর পরও বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই।
জানতে চাইলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘‘রাষ্ট্রপতি একটি সাংবিধানিক পদ। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর একটি সাংবিধানিক শূন্যতার কারণে তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল বিএনপি। এখন সে পর্ব শেষ। বিএনপি হাইকমান্ডের আচরণে বোঝা যাচ্ছে, তারা তাকে এই মুহূর্তে সরাতে চাচ্ছে না। আবার রাষ্ট্রপতিও এক বক্তব্যে বলেছেন, সরকার চাইলে তিনি থাকতে চান। আমি মনে করি, এখন তার থাকা না থাকা সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। সরকার হয়তো নিজেদের সুবিধা মতো সময় পর্যন্ত রাখতে চাইবে।’’
Manual1 Ad Code
বিরোধী দলের আপত্তি, সরকারি দলের আনুকূল্য
Manual2 Ad Code
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য একাধিক রাজনৈতিক দল ও বৈষম্যবিরোধীদের পক্ষ থেকে দাবি ওঠে। যদিও আলোচনা আছে যে বড় দল হিসেবে বিএনপি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কথা বিবেচনায় তখন এ বিষয়ে রাজি হয়নি।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্রীয় সব কাজে অপাংক্তেয় ছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। প্রধান উপদেষ্টা সব অনুষ্ঠানে থাকলেও রাষ্ট্রপতিকে রাখা হয়নি।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর মন্ত্রিসভার শপথ থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে সরকারের আনুকূল্য পাচ্ছেন তিনি। গত ১২ মার্চ বিরোধী দলের তীব্র আপত্তির মুখেও তাকে সংসদে উদ্বোধনী ভাষণের সুযোগ দেয় সরকারি দল। ধীরে ধীরে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস, ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানা দিবস, ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ও মে দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রাষ্ট্রপতিও প্রটোকল অনুযায়ী আমন্ত্রণ পান। এছাড়া গত ঈদুল ফিতরেও জাতীয় ঈদগাহে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একসঙ্গে নামাজ আদায় করেন রাষ্ট্রপতি। এদিন বঙ্গভবনেও বিশিষ্টজনদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করে বিএনপির এক শীর্ষ নেতা জানান, সরকার এ মুহূর্তে সংবিধানের বাইরে যেতে চায় না। তাই রাষ্ট্রপতিকে সরানোর কোনও পরিকল্পনা নেই।
কী বলেছিলেন সরকার ও বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা?
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান লিখেছেন, ‘‘৫ অগাস্ট ২০২৪ বিষয়ে রাষ্ট্রপতি অনেক কিছুই চেপে গিয়েছেন। পতিত পলাতক প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়ে উনি উপস্থিত নেতৃবৃন্দকে যা বলেছিলেন এবং পরবর্তীকালে জাতিকে যা জানিয়েছিলেন, তার বর্তমান বক্তব্যে তিনি তা স্বীকার করেননি। আর এখন যা বলছেন, সেদিন তার কিছুই তিনি বলেননি। তাই নৈতিক দিক থেকে তার দায়িত্বে থাকার সুযোগ নেই।’’
গত ৩০ এপ্রিল সংসদে রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘‘রাষ্ট্রপতির বক্তব্য আমি শুনিও নাই, পড়িও নাই। তিনি গণহত্যার পৃষ্ঠপোষক। আমি তাকে গ্রেফতারের দাবি জানাই।’’
সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ জানান, রাষ্ট্রপতির বিষয়ে এখনও কোনও আলোচনা হয়নি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি
৯০ দশকের আগে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান ছিল সরাসরি ভোটে। ১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা চালুর পর সেই পদ্ধতি বাতিল হয়ে যায়। তখন থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হচ্ছেন এমপিদের পরোক্ষ ভোটে। তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত হয়ে পড়ে প্রধানমন্ত্রীর ওপর। সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। এ ক্ষেত্রে কেউ দুইবারের বেশি এ পদে থাকতে পারবেন না।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে তফসিল ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশন। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘‘রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ অবসানের কারণে পদ শূন্য হলে মেয়াদ-সমাপ্তির তারিখের পূর্ববর্তী ৯০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। আর বিপক্ষে প্রার্থী না থাকলে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন।’’
আসলে কতদিন থাকবেন মো. সাহাবুদ্দিন?
Manual1 Ad Code
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৩ সালের এপ্রিলে দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন মো. সাহাবুদ্দিন। তার স্বাভাবিক মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে। যদিও পূর্ণ মেয়াদ শেষ করার বিষয়টি সরকারের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে বলে মনে করেন রাজনীতিবিদরা।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, ‘‘সরকারের উচিত এই রাষ্ট্রপতিকে দ্রুত সরিয়ে দেওয়া। কারণ তিনি সরাসরি ফ্যাসিবাদের দোসর। তাই তার আর একদিনও ক্ষমতায় থাকার সুযোগ নেই।’’
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান শুক্রবার (৮ মে) রাতে বলেন, ‘‘রাষ্ট্রপতি একটি সাংবিধানিক পদ। তাই এ বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে অবশ্যই আলোচনা হবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়।’’