প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১৩ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

ভ্যাটের আওতায় আসছে গ্রাম পর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

editor
প্রকাশিত মে ১৩, ২০২৬, ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ
ভ্যাটের আওতায় আসছে গ্রাম পর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

Manual4 Ad Code

 

Manual5 Ad Code

প্রজন্ম ডেস্ক:

দেশের অর্থনীতিতে গ্রামীণ অঞ্চলের অবদান ক্রমাগত বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়ছে না রাজস্ব আহরণ। এই বিশাল অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে করের কাঠামোর মধ্যে আনতে এবার বড় ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

সংস্থাটি এখন জেলা ও উপজেলা ছাড়িয়ে ইউনিয়ন বা গ্রাম পর্যায়ের ছোট ব্যবসায়ীদেরও মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটের আওতায় আনার উদ্যোগ নিচ্ছে। মূলত দেশের নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এই কৌশল হাতে নেওয়া হয়েছে।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, এই পরিকল্পনার আওতায় গ্রামীণ ও মফস্বল শহরের ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য মাসিক ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকার একটি স্থায়ী ‘টোকেন’ ভ্যাট পদ্ধতি চালু হতে পারে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এখন থেকে যেকোনো ধরনের ব্যবসায়িক ব্যাংক হিসাব পরিচালনা এবং ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তি বা নবায়নের ক্ষেত্রে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন সাপেক্ষে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনগুলো অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

Manual7 Ad Code

 

বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। আইএমএফ-এর ঋণের শর্ত অনুযায়ী রাজস্ব আদায় বাড়াতে হলে কর অব্যাহতি কমানোর পাশাপাশি করের পরিধি বাড়ানো ছাড়া গত্যন্তর নেই। এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মনে করছেন, গ্রামীণ অর্থনীতি এখন যথেষ্ট শক্তিশালী, কিন্তু এই খাতের বড় একটি অংশ এখনও আনুষ্ঠানিক কর ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা জানান, শুরুতে ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি না করে তাদের ভ্যাট প্রদানে অভ্যস্ত করতে নামমাত্র টোকেন ভ্যাট চালুর চিন্তা করা হচ্ছে। এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানও সম্প্রতি প্রাক-বাজেট আলোচনায় নির্দিষ্ট কিছু খাতে পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রক্রিয়া শুরু করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’-এর প্রাথমিক তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ১ কোটি ১৭ লাখে দাঁড়িয়েছে, যার প্রায় ৭৪ শতাংশই গ্রামীণ এলাকায় অবস্থিত। অথচ এনবিআরের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে মাত্র ৮ লাখ প্রতিষ্ঠানের বিআইএন রয়েছে, যার মধ্যে নিয়মিত রিটার্ন জমা দেয় মাত্র ৫ লাখের কিছু বেশি প্রতিষ্ঠান। এই বিশাল ব্যবধান দূর করতে অন্তত ১ কোটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করছে রাজস্ব প্রশাসন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকেই মোট রাজস্বের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে, যদিও দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অর্ধেকের বেশি ঢাকার বাইরে সংগঠিত হয়। আঞ্চলিক এই বৈষম্য দূর করতে তৃণমূলের রাজস্ব সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

 

তবে এনবিআরের এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহলে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এই উদ্যোগকে ইতিবাচক মনে করলেও মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ যাতে সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয় এবং এর আড়ালে যেন ব্যবসায়ীদের কোনো ধরনের হয়রানি বা ঘুষের শিকার হতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

 

সাবেক রাজস্ব কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই ‘টোকেন ভ্যাট’ ব্যবস্থা অনেকটা অতীতে বাতিল হওয়া ‘প্যাকেজ ভ্যাটের’ মতো। এনবিআরের সাবেক সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিন সতর্ক করে বলেন, অতীতে এই ব্যবস্থায় মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের যোগসাজশের কারণে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছিল। পর্যাপ্ত সুরক্ষা ও ডিজিটাল তদারকি ছাড়া পুনরায় একই পদ্ধতি চালু করলে পুরনো সমস্যাগুলো আবারও মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে।

Manual3 Ad Code

 

ব্যবসায়ী নেতারাও ভ্যাটের পরিধি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করছেন, তবে পদ্ধতিটি ধাপে ধাপে প্রয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) মতে, চার থেকে পাঁচ বছরের একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে গ্রামীণ ব্যবসায়ীদের ভ্যাটের আওতায় আনা উচিত। এফবিসিসিআই-এর সাবেক নেতাদের আশঙ্কা, হুট করে সব ক্ষেত্রে বিআইএন বাধ্যতামূলক করলে ছোট ব্যবসায়ীরা ট্রেড লাইসেন্স নিতে বা নবায়ন করতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

Manual6 Ad Code

 

আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং আমদানি শুল্ক কমে যাওয়ার ফলে চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে আছে। যদিও ভ্যাট ও আয়কর আদায়ে কিছুটা প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, তবুও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে এনবিআরকে নতুন নতুন করের উৎস খুঁজে বের করতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় গ্রামীণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভ্যাটের জালে আনাই এখন সংস্থাটির প্রধান কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র ভ্যাট আরোপ করলেই হবে না, বরং মাঠ পর্যায়ে কর কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও সততা নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে আয়কর আদায়ের দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। গ্রামীণ অর্থনীতিকে কর ব্যবস্থার অধীনে আনার এই প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছ এবং ব্যবসাবান্ধব হয়, তবেই দেশের কর-জিডিপি অনুপাতে বড় পরিবর্তন আসা সম্ভব। অন্যথায় এটি কেবল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বাড়তি বোঝা এবং দুর্নীতির নতুন দ্বার হিসেবে পরিগণিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০৩১

Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code