প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১৭ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৩০শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

স্থানীয় সরকার নির্বাচন: দ্বিতীয় পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি

editor
প্রকাশিত মে ১৭, ২০২৬, ১১:১২ পূর্বাহ্ণ
স্থানীয় সরকার নির্বাচন: দ্বিতীয় পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি

Manual6 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দ্বিতীয় বড় পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দেশে ইতোমধ্যে প্রায় দেড় হাজার স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। তবে সময়সূচি নির্ধারণ এবং কোন স্তর থেকে ভোট আগে শুরু হবে—তা নিয়ে সরকার ও ইসির মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছে। সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে বছরের শেষভাগে নির্বাচন।

Manual7 Ad Code

ইসি বলছে, ওই সময়ে সারা দেশে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা থাকে, সমাজে এক ধরনের ব্যস্ততা থাকে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে প্রতিষ্ঠানগুলোর হালনাগাদ সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ করছে সংস্থাটি। দেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সরকারকে প্রান্তিক মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে এই ভোট শুরু করার পরামর্শ দিয়েছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা।

Manual1 Ad Code

 

প্রশাসকের কার্যকালের মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৮০ দিন আগে নির্বাচন করার আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে এই স্তরে নির্বাচন একটি চলমান প্রক্রিয়া। অন্য স্তরের মতো এখানে চেয়ারম্যানদের অপসারণ না হওয়ায় মেয়াদভিত্তিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ সহজতর। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভেঙে দেওয়া পরিষদগুলোয় ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় আইনি বাধ্যবাধকতা চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে।

ইসি সূত্র জানায়, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ মিলিয়ে মোট ১৫০০-এর বেশি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে নির্বাচনের জন্য উপযোগী। এগুলো হলো ১২টি সিটি করপোরেশন, ৫০০টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা, ৬০০-এর বেশি ইউনিয়ন পরিষদ এবং ৬১টি জেলা পরিষদ। এছাড়া আগামী জুলাইয়ের মধ্যে আরও ২,৮০০-এর বেশি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের আইনগত সীমায় প্রবেশ করবে। প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে এবারই প্রথম একসঙ্গে স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের চাপে পড়েছে নির্বাচন কমিশন।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেশের সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদ ভেঙে দেওয়া হয়। পরে ১ সেপ্টেম্বর এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। আইন অনুযায়ী, পরিষদ ভেঙে দেওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় তা আর সম্ভব হয়নি। সিটি করপোরেশন, জেলা ও উপজেলা পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই নির্ধারিত ওই সময় পার করেছে। এছাড়া প্রশাসক নিয়োগের পর নির্বাচন আয়োজনে সময়ের বাধ্যবাধকতা না মানা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও রয়েছে মতভেদ ও সমালোচনা। তাদের কেউ দ্রুত নির্বাচন চায়, আবার কেউ নির্বাচনের আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির কথা বলছে।

Manual2 Ad Code

প্রথম একসঙ্গে অনেক নির্বাচনের চাপ

দেশে ১২টি সিটি করপোরেশন এখন নির্বাচন উপযোগী। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির মেয়াদ ২০২৫ সালের জুনে শেষ হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৭ সালে। সিলেট, রাজশাহী, গাজীপুর, বরিশাল ও খুলনার ২০২৮ সালে এবং ময়মনসিংহের ২০২৯ সালে। এসব করপোরেশনের মেয়রের পদ ২০২৪ সালের আগস্টেই অপসারণের মাধ্যমে শূন্য হয়ে যায়। আইনে ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানা হয়নি, ফলে সময়সূচি এখন পুরোপুরি নতুন করে নির্ধারণের পর্যায়ে।

৬১টি জেলা পরিষদ এবং ৫০০টি উপজেলার অধিকাংশই এখন নির্বাচন উপযোগী। মূলত জনপ্রতিনিধি অপসারণের পর এগুলোতে নির্বাচন আয়োজনের আইনি কোনো বাধা নেই। তবে কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা রয়ে গেছে যেমন–নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়া এবং আদালতে মামলা চলমান থাকা। একইভাবে নতুন গঠিত মাদারীপুরের ডাসার উপজেলায় সীমানা ও ভোটার তালিকা তৈরির কাজ শেষ হয়নি। ফলে সব উপজেলায় একসঙ্গে ভোট আয়োজন সম্ভব নয়, ধাপে ধাপে আয়োজন করতে হবে।

৩৩০টি পৌরসভার মধ্যে অধিকাংশই নির্বাচন উপযোগী। তবে কয়েকটি পৌরসভায় সীমানা সংক্রান্ত মামলা থাকায় তাৎক্ষণিক ভোটে বাধা রয়েছে। এসব সীমিত জটিলতা ছাড়া পৌরসভা নির্বাচন তুলনামূলক দ্রুত আয়োজনযোগ্য স্তর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। দেশে সাড়ে ৪ হাজারের বেশি ইউনিয়নের মধ্যে ইতোমধ্যে প্রায় ৬০০টি নির্বাচন উপযোগী। তবে সময়ের সঙ্গে এই সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে—মে, জুন ও জুলাই মিলিয়ে আরও প্রায় ২,৮০০ ইউনিয়ন পরিষদ তফসিল ঘোষণার পর্যায়ে আসবে। বছরের বাকি সময়েও ধাপে ধাপে নির্বাচন উপযোগী আরও শত শত ইউনিয়নের সংখ্যা যুক্ত হবে।

 

প্রধান চ্যালেঞ্জ সমন্বয়

স্থানীয় সরকারের এই চার স্তরের নির্বাচনি সময়রেখা বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন কোনো একক ইভেন্ট নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। সিটি করপোরেশন ও জেলা-উপজেলা পরিষদে আইনি সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার চাপ, পৌরসভায় সীমিত জটিলতা এবং ইউনিয়নে ক্রমবর্ধমান নির্বাচনচক্র—সব মিলিয়ে ইসিকে একটি সমন্বিত, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।

ফলে নির্বাচন কখন শুরু হবে, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে— কোন স্তরের নির্বাচন দিয়ে শুরু করে কীভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি সময়মতো শেষ করা যাবে। বর্তমানে শুধু ইউনিয়ন পরিষদ বাদে স্থানীয় সরকারের এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চলছে প্রশাসকদের মাধ্যমে। তবে নির্বাচন না হওয়ায় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার গণতান্ত্রিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

ইসি সূত্রের তথ্য, ঈদুল আজহার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসার পরিকল্পনা রয়েছে। সেই বৈঠকেই সম্ভাব্য সময়সূচি ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ হতে পারে। দীর্ঘদিন পর এসব নির্বাচন পর্যায়ক্রমে আয়োজনের জন্য মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ইতোমধ্যে শেষ পর্যায়ে। কোথায় আইনগত বাধা আছে, কোথায় নেই— এসব বিশ্লেষণ করে তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। সরকার সবুজ সংকেত দিলেই তফসিল ঘোষণা করা সম্ভব।

অন্যদিকে সরকার বলছে, চলতি বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করতে চান। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, নির্বাচন শুরু হলে তা শেষ করতে ১০ মাস থেকে এক বছর সময় লাগতে পারে। এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি জানান, যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আয়োজন করা হবে। প্রশাসক নির্ভর ব্যবস্থা থেকে নির্বাচিত নেতৃত্বে ফেরাই সরকারের লক্ষ্য। ফলে আগামী এক বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এসব নির্বাচন সম্পন্ন করার ব্যাপারেও তিনি আশাবাদী।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন কোন স্তর দিয়ে শুরু হতে পারে এমন প্রশ্নে নির্বাচন বিশ্লেষক ড. আব্দুল আলীম বলেন, ‘সেটা রাজনৈতিক সমঝোতা ও সরকারের কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে। দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমি মনে করি ইউপি নির্বাচনের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া শুরু করা সরকারের জন্য তুলনামূলক সহজ ও কার্যকর হতে পারে। কারণ, ইউনিয়ন পরিষদই জনগণের সবচেয়ে কাছের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠী সরাসরি এখান থেকেই অধিকাংশ সেবা পেয়ে থাকে। ফলে ধাপে ধাপে ইউপি নির্বাচন করে ইসি মাঠপর্যায়ে নিজেদের সক্ষমতা যাচাইয়ের সুযোগ পাবে। এরপর পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য একটি বাস্তব অভিজ্ঞতাও তৈরি হবে।

এ বিষয়ে ইসির প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে বার্ষিক পরীক্ষাসহ বিভিন্ন পরীক্ষা এবং আবহাওয়ার বিষয় বিবেচনায় নির্বাচন আয়োজন বাস্তবসম্মত নয়। এছাড়া পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ১০ থেকে ১২ মাস সময় লাগবে এবং শুরু করার আগে অন্তত ৪৫ দিনের প্রস্তুতি দরকার। তিনি জানান, সব নির্বাচন একসঙ্গে আয়োজন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনসহ সব নির্বাচন ধাপে ধাপে করতে হবে। এছাড়া চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকার কোন স্তরের নির্বাচন আগে হবে—তা সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই নির্ধারণ করা হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এখন সময়, আইন ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের এক জটিল হিসাব-নিকাশে অবস্থান করছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর দ্বিতীয় বড় এই পরীক্ষায় বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশন কতটা সফলভাবে সমন্বয় করতে পারবে— তা সময়ই বলে দেবে।

Manual6 Ad Code

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০৩১

Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code