কে এই কেপ ভার্দে, আর্জেন্টিনার নকআউটের প্রতিপক্ষকে কতটা চেনেন?
কে এই কেপ ভার্দে, আর্জেন্টিনার নকআউটের প্রতিপক্ষকে কতটা চেনেন?
editor
প্রকাশিত জুলাই ২, ২০২৬, ০৯:০৫ পূর্বাহ্ণ
Manual6 Ad Code
স্পোর্টস ডেস্ক:
দশকের পর দশক ধরে কেপ ভার্দে পরিচিত ছিল কেবল স্বচ্ছ নীল জলরাশি আর সাদা বালুকাময় সৈকতের জন্য। এবার তারা পরিচিতি পাচ্ছে ভিন্ন এক কারণে। ফুটবল দুনিয়ায় এরই মধ্যে হইচই ফেলে দিয়েছে প্রায় ৫ লাখ বাসিন্দা ও মাত্র ৪,০০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপরাষ্ট্রটি। বিশ্বকাপে নিজেদের অভিষেক আসরেই রূপকথার গল্প লিখছে তারা। বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে নকআউট পর্বে খেলার রেকর্ড গড়েছে কেপ ভার্দে (Cabo Verde football team)।
আগামী শনিবার রাউন্ড অব বত্রিশের লড়াইয়ে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ের এই দ্বীপরাষ্টট্রি মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার। ফুটবল দুনিয়া এই ম্যাচকে দেখছে ‘ডেভিড বনাম গোলিয়াথ’ এক মহালড়াই হিসেবে। বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের অতি সাম্প্রতিক সময়ের পারফরম্যান্সের চিত্রটা খুব একটা যে স্বস্তি দেবে না লিওনেল মেসিদের, এটা অনুমেয়। চলুন জেনে নেওয়া যাক কেপ ভার্দের বিস্তারিত।
প্রথমবার বিশ্বকাপ অভিযানে নেমেই দুই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন ও উরুগুয়ের মতো কঠিন প্রতিপক্ষকে গ্রুপপর্বে পেয়েছিল কেপ ভার্দে। এর মধ্যেও অপরাজিত থেকে দ্বিতীয় স্থানে শেষ করে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পা রেখেছে দেশটি, যা টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় চমক ভাবা হচ্ছে। গ্রুপ পর্বে তারা ৩ পয়েন্ট সংগ্রহ করেছে। শিরোপার অন্যতম দাবিদার স্পেন, সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে এবং সৌদি আরব-সবাইকে রুখে দিয়েছে তারা।
Manual5 Ad Code
কেপ ভার্দে ফুটবলের এই সাফল্য রাতারাতি আসেনি। এর পেছনে রয়েছে তাদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। বিশেষ করে দেশের বাইরে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী প্রতিভাবান ফুটবলারদের খুঁজে বের করার এক দারুণ কৌশল কাজে লাগিয়েছে তারা।
এক সময়ের ঔপনিবেশিক শক্তি পর্তুগালের সঙ্গে এর দৃঢ় যোগসূত্র রয়েছে। গত শতাব্দিতে লাগাতার ভয়াবহ খরার কারণে দ্বীপগুলো থেকে ব্যাপক অভিবাসন ঘটেছিল। অন্যদিকে সমুদ্রযাত্রার ঐতিহ্য ও সামুদ্রিক বাণিজ্যে জড়িত থাকার কারণে রটারডামে কেপ ভার্দের বংশোদ্ভূত একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে।
২৬ জনের বিশ্বকাপ স্কোয়াডের ১৪ জনই দেশের বাইরে জন্ম নেওয়া। তাদের মধ্যে ছয়জন ডাচ বন্দর শহরের বাসিন্দা। এর মধ্যে ফরোয়ার্ড ডাইল লিভ্রামেন্তো গত মৌসুমে পর্তুগালের প্রিমেইরা লিগের দল কাসা পিয়ার সঙ্গে খেলেছেন। গত বছর সেপ্টেম্বরে ক্যামেরুনের বিপক্ষে বাছাইপর্ব জয়ে একমাত্র গোল করেছিলেন।
কেপ ভার্দের এক সাংসদ জসিনা ফ্রেইতাস ফোর্তেস যেমনটা বলছেন, ‘উদ্যম, প্রতিশ্রুতি ও একটি সুস্পষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনার মাধ্যমে এফসিএফ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। আমরা যে ফলাফল দেখছি, তা মূলত বছরের পর বছর ধরে ধারাবাহিক পরিশ্রম, দৃঢ় বিশ্বাস ও এই প্রকল্পে মনপ্রাণ বিলিয়ে দেওয়া মানুষদের অবদানের ফল।’
Manual8 Ad Code
২০১৯ সালে ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কিং ওয়েবসাইড লিঙ্কডইন-এর মাধ্যমে ডাবলিনে জন্ম নেওয়া সেন্টার ব্যাক রবার্তো লোপেসকে দলে অন্তর্ভুক্তি বেশ চর্চিত গল্প। পর্তুগালের অনূর্ধ্ব-২১ দলে খেলার পর সাবেক ম্যানইউ উইঙ্গার বেবে তাদের ২০২৩ আফ্রিকা নেশনস কাপের অংশ ছিলেন।
লোপেস বলছেন, ‘এই দলের মধ্যে একটি অভ্যন্তরীণ আত্মবিশ্বাস আছে যে আমরা বিশ্বের সেরা দলগুলোর সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো যথেষ্ট ভালো। এটা এমন কিছু নয় যা শূন্য থেকে তৈরি হয়েছে। আমি যুক্ত হওয়ার পর থেকে এবং তার আগেও, কেপ ভার্দেকে বিশ্বের বড় ফুটবল দেশগুলোর কাতারে নিয়ে আসার একটি চলমান পরিকল্পনা ছিল।’
কেপ ভার্দের গোলরক্ষক কে এই ভোজিনহা?
কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা এই মুহূর্তে দলটির সবচেয়ে বড় নায়ক। গ্রুপ পর্বের ৩টি ম্যাচের দুটিতেই তিনি কোনো গোল হজম করেননি (ক্লিন শিট)। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের ম্যাচে লামিনে ইয়ামালদের একের পর এক আক্রমণ রুখে দিয়ে একাই ৭টি দুর্দান্ত সেভ করেন তিনি।
Manual2 Ad Code
এই অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের পর রাতারাতি সোশ্যাল মিডিয়ায় সেনসেশন বনে গেছেন ভোজিনহা। ইনস্টাগ্রামে তার ফলোয়ার সংখ্যা মাত্র ৫ লাখ থেকে লাফিয়ে ১৭.৪ মিলিয়নে (১ কোটি ৭৪ লাখ) দাঁড়িয়েছে! যা অনেক বিশ্বখ্যাত ক্রীড়াবিদদের চেয়েও বেশি।
Manual3 Ad Code
ফুটবলবিশ্ব তাকে ‘ভোজিনহা’ নামে চিনলেও তার আসল নাম জোসিমার জোসে এভোরা দিয়াস। পর্তুগিজ ভাষায় যার অর্থ ‘ছোট দাদি’। ছোটবেলায় বাবা ছিলেন সেনাবাহিনীতে, আর মা কাজে ব্যস্ত থাকতেন। তাই শৈশবের বেশিরভাগটাই কেটেছে দাদা-দাদির কাছে। সেখান থেকেই তার ডাকনাম হয়ে যায় ‘ভোজিনহা’, পর্তুগিজ ভাষায় যার অর্থ ‘ছোট দাদি’।
কেপ ভার্দের সাও ভিসেন্তে শহর থেকে শুরু হয়েছিল ভোজিনহার ফুটবলযাত্রা। এরপর আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে খেললেও তার জার্সিতে নাম হিসেবে ছিল একটাই—‘ভোজিনহা’।কেন এই নাম? এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে চলতি বছরের শুরুতে ফিফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “আমি যখন অ্যাঙ্গোলায় খেলতে যাই, সেখানে জোসিমার নামের আরেকজন গোলরক্ষক ছিল। তখন আমি বলেছিলাম, জার্সিতে ‘জোসিমার-২’ লিখব না। কেপ ভার্দেতে সবাই যেহেতু আমাকে ভোজিনহা নামেই চিনত, তাই সেই নামটাই রেখে দিয়েছি।”
বর্তমানে পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব শ্যাভেসের হয়ে খেলেন ভোজিনহা। তবে তার ফুটবল-জীবনের পথচলা ছিল দীর্ঘ ও বিচিত্র। কেপ ভার্দে, অ্যাঙ্গোলা, মলদোভা, সাইপ্রাস, স্লোভাকিয়া ও পর্তুগালের বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছেন তিনি।
ভোজিনহা ছাড়াও যারা আছেন….
গোলরক্ষক ভোজিনহা ছাড়াও সেন্ট্রাল ব্যাক ডিনি বোর্জেস এবং ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার কেভিন পিনা দলের এই সাফল্যে বড় অবদান রেখেছেন। এ ছাড়া কেভিন পিনা ও হেলিও ভ্যারেলা গ্রুপ পর্বে দলের হয়ে গোলও করেছেন।
কেপ ভার্দের ফুটবল ইতিহাস
১৯৭৫ সালে স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭৮ সাল থেকে কেপ ভার্দে জাতীয় দলের যাত্রা শুরু হয়। গত কয়েক দশকে খেলোয়াড় ও সংশ্লিষ্টদের অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাও বেড়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপই কেপ ভার্দের প্রথম বড় কোনো টুর্নামেন্ট নয়। এর আগে তারা আফ্রিকার সবচেয়ে বড় ফুটবল টুর্নামেন্ট ‘আফ্রিকা কাপ অব নেশনস’ (আফকন)-এ চারবার অংশ নিয়েছে।
২০১৩ সালে নিজেদের প্রথম আসরে এবং সর্বশেষ ২০২৩ সালের আসরে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠাই ছিল মহাদেশীয় টুর্নামেন্টে তাদের সেরা সাফল্য। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও তারা কোয়ালিফাই করার খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল, যদিও শেষ দিকে সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়।
কেপ ভার্দের কোচ: বুবিস্তা
পেড্রো লেইতাও ব্রিটো, যিনি ‘বুবিস্তা’ নামে বেশি পরিচিত। জাতীয় দলের সাবেক এই অধিনায়ক ও ডিফেন্ডার খেলোয়াড়ি জীবনে অ্যাঙ্গোলা, স্পেন ও পর্তুগালের বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছেন। ২০২০ সালে প্রধান কোচের দায়িত্ব নেওয়ার পর তার লক্ষ্য ছিল ‘ব্লু শার্কস’দের এমন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া, যা তিনি খেলোয়াড় হিসেবে কেবল স্বপ্নই দেখতেন।
বুবিস্তার অধীনে দলটি একটি নির্দিষ্ট পরিচয় পেয়েছে—তাদের হারানো খুব কঠিন। বিশ্বকাপজুড়েই তার দল সুশৃঙ্খল রক্ষণভাগ, কৌশলগত বহুমুখিতা এবং পাল্টা আক্রমণে দুর্দান্ত দক্ষতা দেখিয়েছে।
বাছাইপর্বের পারফরম্যান্স কেমন ছিল?
৫ ম্যাচে ৫ জয় এবং একটি গোলও হজম না করা, নিজেদের মাঠে দুর্দান্ত ফর্ম কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। প্রাইয়া-তে অনুষ্ঠিত শেষ ম্যাচে এসওয়াতিনিকে ৩-০ গোলে হারিয়ে তারা মূল আসরের টিকিট নিশ্চিত করে। ক্যামেরুন ও অ্যাঙ্গোলার মতো শক্তিশালী দল থাকা সত্ত্বেও তারা গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই কোয়ালিফাই করে।
কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ ইতিহাস
কনফেডারেশন: সিএএফ
প্রথম বিশ্বকাপ: ২০২৬
অংশগ্রহণ: ১ বার (২০২৬)
ফিফা র্যাঙ্কিং: ৬৪তম।