২০২৪ সালের জুলাইয়ের শুরুতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনের শুরু করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। প্রথমে তাদের দাবি মেনে না নেওয়ায় আন্দোলনের তীব্রতা বাড়তে থেকে। তৎকালীন সরকার বিষয়টি আদালতের ওপর ছেড়ে দেয়। এরই মধ্যে কিছু হতাহতের ঘটনা ঘটে।
পরবর্তীকালে এর সঙ্গে যুক্ত হন বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা। প্রথমে অরাজনৈতিক আন্দোলন হলেও ধীরে ধীরে এটি রাজনৈতিক রূপ পেতে থাকে। যদিও এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা সামনে আসেননি। বরং বিএনপি ও জামায়াতসহ দলগুলোর শীর্ষ নেতারা গণমাধ্যমে বলতে থাকেন— এই আন্দোলনের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা নেই, তবে সমর্থন আছে। একদিকে সরকারের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক নেতাদের দোষারোপ করা, আর অন্যদিকে বিরোধী দলের সম্পৃক্ততা অস্বীকারের মধ্যেও আন্দোলন অব্যাহত থাকে। তবে সে সময় কিছু তরুণ-তরুণী আন্দোলনের নেতৃত্ব পর্যায়ে ভূমিকা রাখেন। তাদের কেউ কেউ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। আবার অনেকে অনলাইন অ্যাক্টিভিটিস হিসেবে ভূমিকা রাখেন। নাহিদ, সারজিস, মাহফুজ, আসিফ মাহমুদ, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আখতার, তাসনূভা, সাদিক কায়েম, উমামা ফাতেমা আবিদ, মেঘমল্লার বসু, আবু বাকের মজুমদার ও আবদুল কাদেরসহ বেশ কিছু মুখ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে বেশ পরিচিত হয়ে ওঠেন। মিছিলসহ যেকোনও কর্মসূচিতে তারা ছিলেন সামনের সারিতে। যদিও তখন তাদের রাজনৈতিক পরিচিতি ও আদর্শ মুখ্য ছিল না। সবারই অভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল সরকারের পতন। সেক্ষেত্রে তারা সফলও হয়েছেন। এক পর্যায়ে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয় আওয়ামী লীগ সরকার।
তবে জুলাই পরবর্তীকালে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। সে সময়ের পরিচিত মুখগুলো আলাদা প্ল্যাটফর্মে চলে গেছেন। কেউ কেউ নিজের রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনে ফিরেছেন। আবার কেউ বা জুলাইকেন্দ্রিক কিছু সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। জুলাইকে ভিত্তি করে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) সম্পৃক্ত হয়েছেন বেশিরভাগ পরিচিত মুখ। যদিও সেখান থেকেও বের হয়ে বেশ কয়েকজন আলাদা বলয়ে থিতু হয়েছেন। আর একেবারেই কোনও মঞ্চে না থেকে সম্পূর্ণ একক পথে হাঁটছেন কয়েকজন আলোচিত মুখ। আদর্শিক ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব থেকে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। তবে যেকোনও ইস্যুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় রয়েছেন এসব আন্দোলনকারী। তারা প্রায় সময় জুলাইয়ের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিচ্ছেন।
Manual6 Ad Code
পরিচিতদের বড় অংশ এনসিপিতে
জুলাইয়ের আদর্শ সংরক্ষণ ও আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আন্দোলনের সব পক্ষের সমন্বয়ে প্রথমে গঠন করা হয় জাতীয় নাগরিক কমিটি। এতে আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও সদস্য সচিব করা হয় আখতার হোসেনকে। শুরুতে এ সংগঠনের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ নানা কর্মসূচি পালন করা হতো।
তবে পরবর্তী বছর ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করা হয়। এতে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব করা হয় আখতার হোসেনকে। অবশ্য এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পদ থেকে ইস্তফা দেন নাহিদ ইসলাম। এ সময় নাগরিক কমিটি থেকে ছাত্রদল, ইসলামী ছাত্রশিবির ও বাম সংগঠনের কর্মীরা যে যার সংগঠনে ফিরে যান। জুলাইয়ে অরাজনৈতিক ভূমিকায় দেখা গেলেও তখন অনেকের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ হয়। জুলাইয়ের নেতৃত্ব দেওয়া নেতা নাহিদ ইসলাম বর্তমানে এনসিপির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন আখতার হোসেন। দুই জনই বিগত নির্বাচনে যথাক্রমে ঢাকা-১১ ও রংপুর-৪ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন।
Manual4 Ad Code
এই দলেরই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন যথাক্রমে মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি বিগত দিনে ঢাকা-৮ আসন থেকে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আলোচনায় আসেন। আর, যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ ও দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহও প্রথমবারের মতো নির্বাচন করে এমপি নির্বাচিত হন।
তারাসহ এই দল থেকে মোট ৬ জন এমপি নির্বাচিত হন। আর সংরক্ষিত দুই জন মিলে দলটির মোট সংসদ সদস্য ৮ জন। আর নির্বাচনের আগে ড. ইউনূসের উপদেষ্টা পদ ছেড়ে দলটির মুখপাত্র হয়েছেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। সম্প্রতি তাকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি। এছাড়া রয়েছেন আরিফুল ইসলাম আদীব, তারিকুল ইসলাম ও আকরাম হুসাইন। তারা সবাই জুলাইয়ের পরিচিত মুখ। দলটিতে নারী নেত্রী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন সামান্থা শারমিন, মনিরা শারমিন, নুসরাত তাবাসসুম ও ডা. মাহমুদা মিতু। অবশ্য জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি জোটের কারণে দলটি থেকে বের হয়ে গেছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতা।
ছাত্রদলে ফিরেছেন যারা
জুলাইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সামনের সারিতে ছিলেন আবিদুল ইসলাম, শেখ তানভীর বারী হামীম, তানভীর আল হাদী মায়েদ ও মানসুরা আলমসহ ছাত্রদলের বেশ কিছু নেতাকর্মী। তখন সংগঠনটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল সবাই রাজপথ সক্রিয় ছিলেন বলে জানা গেছে। তবে তরুণদের মধ্যে আবিদুল ইসলাম, হামীম ও মায়েদ ডাকসু নির্বাচনে যথাক্রমে ভিপি, জিএস ও এজিএস পদে নির্বাচন করে পরাজিত হন। আর মানসুরা আলম বিএনপি থেকে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হয়েছেন। তারা এখন পুরোপুরি নিজ দল ও সংগঠনকে সময় দিচ্ছেন। এদের মধ্যে আবিদ ও হামিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে লেখালেখিতে সক্রিয় রয়েছেন।
জুলাইয়ের শিবির নেতারা কে কী করছেন?
Manual3 Ad Code
জুলাই আন্দোলনে নিজেদের পরিচয় গোপন করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্দোলন করছেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের বেশকিছু নেতা। পরবর্তীকালে তাদের নিজেদের জনশক্তি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন সংগঠনটির নেতারা। এর মধ্যে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী সংসদের (ডাকসু) বর্তমান ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদ ও মহিউদ্দিন খান। আরও ছিলেন সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি আলী আহসান জুনায়েদ ও রাফে সালমান রিফাত।এর মধ্যে সাদিক কায়েম ও এস এম ফরহাদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়।যদিও তারা তা অভিযোগ অস্বীকার করেন।
ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম সম্প্রতি শিবির থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। যোগ দিয়েছেন জামায়াতে। সম্প্রতি দলটির ঢাকা দক্ষিণ সিটি কপোরেশনের মেয়র প্রার্থী হিসেবে তার নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
আর অপর ২ নেতা রাফে সালমান রিফাত ও আলী আহসান জুনায়েদ প্রথমে আপ বাংলাদেশ নামের নতুন প্ল্যাটফর্ম গঠন করেন। পরবর্তীকালে গত ১৯ এপ্রিল ৪৭ নেতাকর্মী নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টিতে যোগ দেন। তাদেরকে যুগ্ম আহ্বায়ক ও যুগ্ম সদস্য সচিব পদ দেয় দলটি।
‘অল্টারনেটিভস’ নিয়ে কী করছেন মাহফুজ-তাজনূভা?
জুলাইয়ের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন মাহফুজ আলম। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। এমপি পদে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে নির্বাচনের কয়েকদিন আগে পদত্যাগ করেন। যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি আর নির্বাচন করেননি।
গত ৬ মার্চ ন্যাশনাল অর্গানাইজিং কমিটি (‘অল্টারনেটিভস’) নামে ১৭ সদস্যের নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠন করেন। সেখানে আরও রয়েছেন ডা. তাজনূভা জাবীনসহ এনসিপির তিন সাবেক নেতা। যদিও মাহফুজ আলম সরাসরি রাজনীতিতে তেমন সক্রিয় নন। তবে মাঝে-মধ্যে অনলাইনে সমসাময়িক বিষয়ে লেখোলেখি করছেন।
এ বিষয়ে সংগঠনটির শীর্ষ নেত্রী তাজনূভা জাবীন বলেন, তাদের সংগঠনের কাজ স্বাভাবিকভাবেই চলছে। এ পর্যন্ত ২২টি সাংগঠনিক জেলা কমিটি গঠন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সারা দেশে কমটি সম্পন্ন করা হবে বলে তিনি জানান।
রাজনীতির বাইরেও সক্রিয় যারা
জুলাই পরবর্তীকালে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে থাকলেও বর্তমানে বেশকিছু নেতাকর্মী সম্পূর্ণ নিজস্ব অবস্থান থেকে সক্রিয় রয়েছেন। যদিও আগের মতো রাজপথে সক্রিয় নন তারা। তবে নিজেদের ফেসবুক আইডি থেকে সমসাময়িক বিষয়ে লেখালেখি করছেন। এর মধ্যে অন্যতম উমামা ফাতেমা। এক সময় ছাত্র ফেডারেশন সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে এই মুহূর্তে কোনও সংগঠনের সঙ্গে নেই। বিগত ডাকসু নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্যানেল থেকে ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে পরবর্তীকালে তেমন আলোচনায় নেই।
জুলাইয়ের আরেক সমন্বয়ক আব্দুল কাদের ডাকসু নির্বাচনে এনসিপির তৎকালীন ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ থেকে ভিপি নির্বাচন করেন। যদিও তিনি জিততে পারেননি। বর্তমান জুলাই কেন্দ্রিক বিভিন্ন লেখালেখি করে আলোচনায় আছেন।
আরেক নেতা মেঘমল্লার বসু ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে বাম সংগঠনগুলো থেকে ডাকসুতে জি এস পদে নির্বাচন করে হেরে যান। তবে সমসাময়িক ইস্যুতে সব সময়ই মাঠে নামেন তিনি। সম্প্রতি ছাত্র ইউনিয়ন থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। পরবর্তী গন্তব্য কোথায়, সে বিষয় বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি।
প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে মূল্যায়ন
জুলাইয়ের নিজেরা সামনের সারিতে ভূমিকা পালন করেছেন, এমন কয়েকজন নিজেদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। তাদের মতে, যে প্রত্যাশা নিয়ে তারা জীবনবাজি রেখে রাজপথে ছিলেন, তার তেমন প্রতিফলন হয়নি। আবার কেউ কেউ মনে করেন, কিছু ক্ষেত্রে নতুনত্ব দেখা যাচ্ছে। আগের মতো ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা নেই।
Manual2 Ad Code
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডাকসু নির্বাচনে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন থেকে পরাজিত ভিপি প্রার্থী মেঘমল্লার বসু বলেন, ‘‘জুলাইয়ে ছাত্র-জনতা এক ধরনের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রাজপথে নেমে আসে। কিন্তু মানুষ কিছুটা আশাহত। কারণ এরই মধ্যে অনেক বিভাজন তৈরি হয়েছে। সবকিছুই যেন আগের মতো চলছে। সরকার ও বিরোধী দলের রাজনীতির ধরন বোঝা যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে সমঝোতা দেখা যাচ্ছে। মৌলবাদের উত্থান হয়েছে। মব ভায়োলেন্স বেড়েছে। অথচ আমরা এমন চিত্র দেখতে চাইনি।’’
জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিন বলেন, ‘‘জুলাইয়ে আমাদের ব্যক্তিগত কোনও প্রত্যাশা ছিল না। আমরা একটি বৈষম্যমূক্ত বাংলাদেশ চেয়েছিলাম। তাছাড়া সন্ত্রাস, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ বিনির্মাণসহ সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্যই মানুষ জীবন দিয়েছে। অথচ ফ্যাসীবাদী কাঠামো এখনও বিদ্যমান। তাই অনেক সময় কিছুটা হতাশা কাজ করে।’’ তবে আবারও যদি কোনও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশ তৈরি হয়, তখন তরুণ প্রজন্ম বসে থাকবে না বলে তিনি মনে করেন।