হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে প্রবেশ ও বোর্ডিং গেটে ম্যানুয়ালি বা হাত দিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করে নিরাপত্তা তল্লাশির অভিযোগ উঠেছে। প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনার যুগে দেশের প্রধান বিমানবন্দরে প্যান্টের বেল্ট, ঘড়ি, জুতা খোলার পর নিরাপত্তার নামে যাত্রীদের পুরো শরীর খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তল্লাশি করাকে ‘দৃষ্টিকটু’, ‘জঘন্য’ ও ‘বিব্রতকর’ বলে আখ্যা দিয়েছেন দেশি-বিদেশি যাত্রী, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিমান চালনা বিশেষজ্ঞরা।
Manual7 Ad Code
সরেজমিনে মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিকালে বিমানবন্দরে গিয়ে দেখা যায় যাত্রীদের এসব অভিযোগের সত্যতা। অনুসন্ধানে জানা যায়, একজন যাত্রী অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে টিকিট দেখিয়ে ভেতরে প্রবেশের সময় প্রথম দফায় তার লাগেজ স্ক্যানিংয়ে দিতে হয়। এরপর আর্চওয়ে গেট পেরোলে আনসার সদস্য লাগেজ স্ক্যাটার কিংবা সরাসরি হাত দিয়ে তার শরীর তল্লাশি করেন। পরবর্তীতে এয়ারলাইন্স থেকে বোর্ডিং পাস নিয়ে বোর্ডিং গেটে যাওয়ার সময় আবারও একই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটে।
দ্বিতীয় দফায় যাত্রীকে প্যান্টের বেল্ট, হাতঘড়ি, মোবাইল ও জুতা খুলে ট্রের ভেতরে দিয়ে স্ক্যানারে পাঠাতে হয়। বেল্ট ছাড়া প্যান্ট ও খালি পায়ে পুনরায় আর্চওয়ে গেট পার হলে দায়িত্বরত আনসার সদস্য একইভাবে দ্বিতীয়বার পুরো শরীর স্পর্শ করে তল্লাশি চালান। নারী যাত্রীদের জন্য পর্দা ঘেরা আলাদা স্থান থাকলেও সেখানেও হাত দিয়ে তল্লাশির একই নিয়ম প্রচলিত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ ও যাত্রীদের তীব্র ক্ষোভ
Manual5 Ad Code
স্ক্যানারে লাগেজ চেক করার পর স্বয়ংক্রিয় ‘হিউম্যান বডি স্ক্যানার’ ব্যবহার না করে দুইবার করে ম্যানুয়ালি পুরো শরীর স্পর্শ করে তল্লাশি করায় দেশি-বিদেশি যাত্রীদের মধ্যে চরম বিরক্তি ও বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে।
যাত্রী আরিফ কবির ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এভাবে গায়ে হাত দিয়ে তল্লাশি করা একেবারেই জঘন্য। রাস্তায় অপরাধীদের যেভাবে তল্লাশি করা হয়, দেশের প্রধান বিমানবন্দরে যাত্রীদের সাথে তেমন আচরণ করা খুবই কষ্টদায়ক। এতে একজন যাত্রীর পেছনে দুই মিনিটেরও বেশি সময় নষ্ট হওয়ায় দীর্ঘ লাইন ও চরম দুর্ভোগের সৃষ্টি হচ্ছে।”
নাজিম আহমেদ নামের আরেক যাত্রী বলেন, “প্যান্টের বেল্ট, জুতা ও ঘড়ি খুলে ট্রেতে দেওয়ার পর আবার গায়ে হাত দিয়ে চেক করাটা কী ধরণের আধুনিকতা? পৃথিবীর কোনও দেশে এই ধরণের প্রাচীন পদ্ধতি নেই। বাধ্য হয়েই আমরা এই ভোগান্তি সহ্য করছি।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “বেল্ট-জুতা খোলার পর একজন এসে আপনার পুরো শরীর স্পর্শ করে দেখবে— এটি অত্যন্ত বিব্রতকর ঘটনা। বেবিচকের দ্রুত বিষয়টি আমলে নেওয়া উচিত।”
বিমানবন্দরে কর্মরত একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা জানান, ঘটনাটি বাস্তবেও দেখতে খারাপ দেখায়। তারা মৌখিকভাবে বেবিচকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি একাধিকবার জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞের মতে দ্রুত বডি স্ক্যানার বসানো জরুরি
Manual5 Ad Code
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহেদুল আলম এই ঘটনাকে অত্যন্ত নিন্দনীয় উল্লেখ করে বলেন, “এই প্রযুক্তির যুগে হাত দিয়ে এভাবে নিরাপত্তা তল্লাশি কোনও দেশের বিমানবন্দরে নেই। এই ধরনের চালচিত্রে বিদেশিদের কাছে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়। বেবিচক কর্মকর্তাদের প্রতিনিয়ত বিদেশ সফরের অভিজ্ঞতা থাকলেও কেন তারা এটি আধুনিক করছেন না, তা বোধগম্য নয়।”
বিমানবন্দরে ব্যবসায়িক কাজে যুক্ত খায়রুল আলম ভূঁইয়া জানান, একটি স্বয়ংক্রিয় ‘হিউম্যান বডি স্ক্যানার’ বসানো হলে স্পর্শ ছাড়াই শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। এতে যাত্রীর শরীরে হাত দেওয়ারও কোনও প্রয়োজন পড়ে না।
বেবিচকের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদস্য (নিরাপত্তা) আসিফ ইকবাল জানান, বর্তমানে আন্তর্জাতিক সংস্থার নিয়ম মেনেই তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তবে যাত্রী দুর্ভোগ ও আধুনিকায়নের বিষয়ে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, “শাহজালাল বিমানবন্দরের নবনির্মিত থার্ড টার্মিনালে ২০টি আধুনিক ‘হিউম্যান বডি স্ক্যানার’ বসানো হয়েছে। থার্ড টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু হলে যাত্রীদের আর এই ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে না।”