অপরাধ দমন, পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত এবং অভিযান ও ঘটনাস্থলের ভিডিও প্রমাণ সংরক্ষণের লক্ষ্যে কেনা বডি-ওর্ন ক্যামেরার (বডিক্যাম) কাঙ্ক্ষিত ব্যবহার হচ্ছে না। মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন ইউনিটে পর্যাপ্ত ক্যামেরা ও প্রশিক্ষণ থাকলেও অপারেশনাল কাজে এর ব্যবহার সীমিত। এমন পরিস্থিতিতে ক্যামেরাগুলো সচল রাখা ও ব্যবহার সংক্রান্ত দক্ষতা বজায় রাখতে পিটি-প্যারেডে বডিক্যাম ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। মাঠপর্যায়ে বডিক্যামের ব্যবহার না হওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ নিয়ে আলোচনা রয়েছে। এর মধ্যে পুলিশের বাড়তি আয়ের পথ বন্ধ হওয়ার বিষয়টিও মাঠপর্যায় থেকে পুলিশ সদর দপ্তর পর্যন্ত আলোচনায় এসেছে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অপরাধ দমন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং পুলিশের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই বিভিন্ন ইউনিটে বডি-ওর্ন ক্যামেরা যুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু অপরাধ দমন কার্যক্রমে প্রযুক্তিটির প্রত্যাশিত ভূমিকা এখনও দৃশ্যমান নয়। কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহার হলেও তা সংখ্যায় হাতেগোনা।
পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, বডি-ওর্ন ক্যামেরা কেনা হয়েছিল মূলত অপরাধ দমন কার্যক্রমে মাঠপর্যায়ে পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, অভিযান ও ঘটনাস্থলের ভিডিও প্রমাণ সংরক্ষণ এবং দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধের উদ্দেশ্যে। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবহার না থাকায় মূল লক্ষ্য ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি বলেন, মাঠপর্যায় থেকে পুলিশের সঙ্গে বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণির মানুষের নানা ধরনের ঘটনার খবর পুলিশ সদর দপ্তরে আসে। এসব ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে দেখা গেছে, ঘটনার সময় কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যের কাছে বডি-ওর্ন ক্যামেরা ছিল না। ফলে ঘটনাস্থলের ভিডিও প্রমাণ সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। একই কারণে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের সত্যতাও যাচাই করা কঠিন হচ্ছে। ক্যামেরা ব্যবহারের জন্য দফায় দফায় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
Manual2 Ad Code
২৫ হাজার ৭০০ বডিক্যাম
Manual6 Ad Code
গত বছরের ১১ আগস্ট তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী পুলিশ সদস্যদের ব্যবহারের জন্য প্রায় ৪০ হাজার বডি-ওর্ন ক্যামেরা সংগ্রহের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, পুলিশের কাছে ১০ হাজার বডি-ওর্ন ক্যামেরা আছে। নির্বাচন সামনে রেখে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তার জন্য আরও ৪০ হাজার বডি-ওর্ন ক্যামেরা কেনা হবে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, নির্বাচনের আগে ১৫ হাজার অনলাইন বডি-ওর্ন ক্যামেরা কেনা হয়েছিল। এসব ক্যামেরা এখন অপরাধ দমন ও অপারেশনাল কার্যক্রমে ব্যবহার করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে পুলিশের হাতে ২৫ হাজার ৭০০ বডি-ওর্ন ক্যামেরা রয়েছে।
জানা গেছে, ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে বডিক্যামের ব্যবহার শুরু করে। পরে চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী ও বরিশাল মহানগর এবং মৌলভীবাজার জেলা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগকেও বডিক্যাম দেওয়া হয়। বগুড়া ও কক্সবাজারের ট্রাফিক পুলিশেও পরীক্ষামূলকভাবে এ ক্যামেরার ব্যবহার চালু রয়েছে। এ ছাড়া কারারক্ষী ও বিজিবির (বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড) কাছেও এ ক্যামেরা আছে। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা বডিক্যামে ধারণ করে ট্রাফিক পুলিশ বিভিন্ন যানবাহন ও চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। আইন লঙ্ঘনের সময়কার ভিডিও থাকায় অভিযোগ অস্বীকার করা কঠিন হয়। আবার আইন লঙ্ঘনের পর অনেকেই পুলিশের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন। বডিক্যামের ব্যবহার থাকলে এ ধরনের আচরণও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বডিক্যামের ব্যবহার বাস্তবে তেমন একটা নেই। সীমিত পরিসরে এর ব্যবহার চালু থাকলেও সার্বিকভাবে এটি কাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলতে পারেনি।
এখন পিটি-প্যারেডে বডিক্যাম
৩ জুন পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়, পুলিশ সদস্যদের শারীরিক সক্ষমতা, শৃঙ্খলা ও অপারেশনাল দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পিটি-প্যারেড চলাকালে অনলাইন বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করে কার্যক্রম নজরদারি করা হবে। এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পিটি-প্যারেড সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন এবং প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক নির্দেশনাও দিতে পারবেন। জেলা ও মহানগর ইউনিটগুলোকে বিদ্যমান ক্যামেরা থেকে অন্তত একটি করে ক্যামেরা পিটি-প্যারেডে ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ক্যামেরার নিরাপত্তা ও ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বনের কথা উল্লেখ করে নির্দেশনায় বলা হয়, অবহেলায় কোনো ক্যামেরা হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারীকে দায়ী করা হবে। ৭ জুনের মধ্যে ক্যামেরার আইডি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার তথ্য পাঠাতে বলা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র সহকারী মহাপরিদর্শক এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, পুলিশের কাছে এখন পর্যাপ্ত বডি-ওর্ন ক্যামেরা আছে। এগুলো বিভিন্ন অপারেশনাল কার্যক্রমে ব্যবহার করা হচ্ছে। এখন এসব ক্যামেরা পিটি-প্যারেড নজরদারির কাজে ব্যবহার করা হবে। এর মাধ্যমে দুটি কাজ হবে—পিটি-প্যারেড নজরদারি এবং ক্যামেরার ব্যবহার শেখানো। পুলিশের কাছে পর্যাপ্ত বডি-ওর্ন ক্যামেরা থাকায় অপারেশনাল কার্যক্রমে ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কোনো ঘাটতি হবে না।
বডি-ওর্ন ক্যামেরা কী
Manual2 Ad Code
বডি-ওর্ন ক্যামেরাকে ‘বডিক্যাম’ বা ‘বডি ক্যামেরা’ বলা হয়। অন্যান্য ক্যামেরার মতো এতে লেন্স, স্টোরেজ (ইন্টারনাল মেমোরি বা মাইক্রোএসডি), ব্যাটারি ও রেকর্ডিং কন্ট্রোল থাকে। তবে এর বিশেষত্ব হলো, এটি মানুষের শরীরে সংযুক্ত থাকে এবং আকারে ছোট। ক্যামেরাটি ব্যবহারের উদ্দেশ্য হলো সামনে থাকা দৃশ্যের ভিডিও ধারণ করা। সচল থাকলে লেন্সের আওতায় আসা দৃশ্য ভিডিও করে রাখে। ব্যবহারকারীর গতিবিধির সঙ্গে ক্যামেরার গতিবিধিও পরিবর্তিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে বডিক্যাম অডিওও রেকর্ড করে।
Manual6 Ad Code
পুলিশ সদর দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সারা দেশের সব থানায় ৫০টির অধিক ক্যামেরা দেওয়া হয়েছে, যা ইতোমধ্যে অপারেশনে ব্যবহৃত হচ্ছে। ক্যামেরার ব্যাটারি ছয় ঘণ্টা সাপোর্ট দেবে। এজন্য প্রতি সদস্যের কাছে একাধিক ব্যাকআপ ব্যাটারি দেওয়া হয়েছে। একটি ক্যামেরা ২৪-৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইভে রেখে দেখা হয়েছে। ছোটখাটো যেসব সমস্যা ধরা পড়েছে, সেগুলো সমাধান করা হচ্ছে।
দেশে দেশে ব্যবহার
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণে বডিক্যাম ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাজ্যের পুলিশ দীর্ঘদিন ধরে এ ক্যামেরা ব্যবহার করছে। যুক্তরাজ্য মেট্রোপলিটন পুলিশের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, উচ্চগতির যানবাহন থামানো ও তল্লাশি, কোনো সম্পত্তি কিংবা ব্যক্তিকে তল্লাশি ও গ্রেপ্তার এবং তদন্তসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের সময় এ ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়। ইউরোপ, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা বডিক্যাম ব্যবহার করেন। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার পুলিশও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ভারতের দিল্লি পুলিশও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বডিক্যাম ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছে। দিল্লিতে এর আগে ২০১৬, ২০১৯ ও ২০২২ সালে বডিক্যাম ব্যবহারের পাইলট প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। তবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে সেগুলো সফল হয়নি।