প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২৫শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৯ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৪ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

অস্ত্রোপচার বন্ধ ৮০% উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে

editor
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬, ০৯:০২ পূর্বাহ্ণ
অস্ত্রোপচার বন্ধ ৮০% উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে

Manual1 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

Manual7 Ad Code

অপারেশন থিয়েটার, আধুনিক যন্ত্রপাতি সবই আছে, কোথাও কোথাও প্রশিক্ষিত চিকিৎসকও আছেন; কিন্তু নেই অস্ত্রোপচার চালানোর মতো সমন্বিত জনবল ও ব্যবস্থাপনা। ফলে দেশের উপজেলা পর্যায়ের সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় অস্ত্রোপচার কার্যক্রম প্রায় বন্ধ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ৪৩৩টি উপজেলার ৩৪৪টি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে। শতাংশের হিসাবে যা প্রায় ৭৯.৪৪। এসব অপারেশন থিয়েটারে কোথাও কয়েক মাস, কোথাও বা কয়েক বছর ধরে তালা ঝুলছে।

অস্ত্রোপচার বন্ধে সবচেয়ে বড় সংকট—অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞের।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সার্জন ও গাইনি বিশেষজ্ঞের ঘাটতি, ওটি সহকারী ও কারিগরি জনবলের সংকট এবং প্রয়োজনীয় ওষুধসামগ্রীর অভাব। আবার কোথাও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়িত থাকলেও সংযুক্তিতে অন্য হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে আরো জানা গেছে, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় জনবলের ৬৯ হাজার ১১৭টি পদের মধ্যে ২৫ হাজার ৮৬টি পদ শূন্য। ৪৩৩ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে ১০১টিতে হয় না এক্স-রে, যা মোট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ২৩. ৩২ শতাংশ।
আলট্রাসনোগ্রাম হয় না ১৯৬ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, যা মোট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪২.২৬ শতাংশ। ইসিজি হয় না ৭০ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।

এতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও অপারেশন থিয়েটার এবং কোটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রপাতি পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। আর এসব স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কম খরচে অস্ত্রোপচারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে রোগীদের ছুটতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিকে। এতে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়, ভোগান্তি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি।

জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবা না পেয়ে রোগীরা বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় ও কষ্ট বাড়ছে। ভঙ্গুর এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণে সরকারি চিকিৎসার ওপর থেকে মানুষের আস্থা হারিয়ে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অস্ত্রোপচারসেবা বন্ধের অর্থ শুধু একটি সরকারি সেবা বন্ধ থাকা নয়, এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রোগীর আর্থিক সংগতি ও জীবনধারার ওপর। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কম খরচে সিজারিয়ান, অ্যাপেনডিক্স, হার্নিয়াসহ ছোট ও মাঝারি অস্ত্রোপচারের সুযোগ না থাকায় রোগীদের যেতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিকে।’

 

৪৩৩ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট আছেন মাত্র ১৪২ জন

উপজেলা পর্যায়ে অস্ত্রোপচারসেবার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অ্যানেস্থেসিয়া ব্যবস্থায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। এর মধ্যে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যুক্ত রয়েছেন প্রায় এক হাজার। ৪৩৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট রয়েছেন মাত্র ১৪২ জন। অর্থাৎ অনুমোদিত পদের প্রায় ৭০ শতাংশ খালি।

Manual5 Ad Code

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে এ সংকট আরো নাজুক। একজন সার্জনের বিপরীতে অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট আছেন মাত্র ০.৩৭ জন। আর প্রতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিপরীতে অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট মাত্র ০.৪৫ জন। প্রতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিপরীতে সার্জন রয়েছেন ১.২২ জন, আর ল্যাব টেকনিশিয়ান মাত্র ০.১৭ জন। অর্থাৎ গড়ে ছয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য ল্যাব টেকনিশিয়ান একজন।

ফলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকলেও অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট না থাকলে অধিকাংশ অস্ত্রোপচার নিরাপদভাবে করা সম্ভব নয়। এতে শুধু একটি পদ খালি থাকার কারণেও পুরো ওটি অচল থাকছে।

 

মাঠ পর্যায়ের চিত্রও একই

Manual3 Ad Code

তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় কোথাও অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ আছে তো কোথাও সার্জন ও গাইনি চিকিৎসক নেই, আবার কোথাও পদায়িত চিকিৎসক সংযুক্তিতে অন্য হাসপাতালে কর্মরত।

শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ২২টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১১ জন। নেই সার্জারি, গাইনি ও অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ। ৩১ শয্যার হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও অস্ত্রোপচারসেবা চালু হয়নি। সরকারি হাসপাতালে সেবা না পেয়ে রোগীদের যেতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিকে।

দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রায় তিন বছর ধরে সিজারিয়ানসহ সব ধরনের অস্ত্রোপচার বন্ধ। অ্যানেস্থেসিয়া, গাইনি ও সার্জারি কনসালট্যান্ট না থাকায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে ১৮ জন মেডিক্যাল অফিসারের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৯ জন। ১১টি কনসালট্যান্ট পদের বিপরীতে শিশু ও অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ পদায়িত থাকলেও তাঁরা সংযুক্তিতে দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন।

হাসপাতালটির আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা ডা. শাহরিয়ার পারভেজ বলেন, ‘আগে এই হাসপাতালে সিজারিয়ানসহ বিভিন্ন অস্ত্রোপচার হতো। কিন্তু অ্যানেস্থেসিয়া, গাইনি ও সার্জারি কনসালট্যান্ট না থাকায় তিন বছর ধরে সব ধরনের অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে।’

ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রায় সাত-আট মাস ধরে অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে। আর ৪১টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৫ জন। নেই অ্যানেস্থেসিয়া, চক্ষু ও নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ। হাসপাতালে গাইনি বিশেষজ্ঞ ও সার্জন থাকলেও অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ না থাকায় সিজারিয়ান, অ্যাপেনডিক্স, হার্নিয়া ইত্যাদির অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির অপারেশন থিয়েটারের বাইরে তালা ঝুলতে দেখা গেছে। ভেতরে পড়ে আছে মূল্যবান যন্ত্রপাতি। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় সেগুলো নষ্ট হচ্ছে। অথচ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ রোগী এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসে। তাদের মধ্যে প্রায় ৭০ জন নারী গাইনিসংক্রান্ত সমস্যায় চিকিৎসা নেয়।

মেহেরপুরের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিত্র আরো ভয়াবহ। ২৫০ শয্যার মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতাল এবং ৫০ শয্যার মুজিবনগর ও গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেড় মাসের বেশি সময় ধরে অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে। এগুলোর অস্ত্রোপচারের দায়িত্ব ছিল মাত্র একজন অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের ওপর।

Manual1 Ad Code

গত ১৯ জুন অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট মেহেদি হাসানকে চুয়াডাঙ্গা জেনারেল হাসপাতালে বদলি করা হলে ওই এক হাসপাতাল ও দুই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্ত্রোপচার সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। একই দিন মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে এ এম রকিবুর রহমানকে পদায়ন করা হলেও তিনি যোগ দেননি। ফলে জনবল ব্যবস্থাপনার একটি ভুল সিদ্ধান্তে জেলার একটি সরকারি হাসপাতাল ও দুটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্ত্রোপচারসেবা অচল হয়ে পড়ে।

 

বিশেষজ্ঞদের তিন দফা পদক্ষেপের প্রস্তাব

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, ‘সংকট সমাধানে প্রথমে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। বর্তমানে শল্যচিকিৎসা বন্ধের প্রতিবন্ধকতা কী, তা দ্রুত চিহ্নিত করে সরকারের কাছে উপস্থাপন করতে হবে।’

দ্বিতীয়ত, ‘সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে প্রতিটি জেলায় শক্তিশালী কমিটি গঠন করা দরকার। সংশ্লিষ্ট উপজেলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসে দ্রুত সমস্যা সমাধান ও সুপারিশ প্রণয়ন করতে হবে।’

তৃতীয়ত, ‘যেসব অস্ত্রোপচার উপজেলা পর্যায়ে নিরাপদে করা সম্ভব, সেগুলো দ্রুত চালু করতে হবে। এর মধ্যে ছোট ও মাঝারি অস্ত্রোপচার, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সিজারিয়ান এবং চোখ ও নাক-কান-গলার সাধারণ অস্ত্রোপচার রয়েছে।’

ডা. মোজাহেরুল হক আরো বলেন, ‘খণ্ডিত উদ্যোগে কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। একজন অ্যানেস্থেটিস্ট নিয়োগ দেওয়া হলো, অথচ যন্ত্রপাতি বিকল পড়ে রইল—এভাবে তো ওটি চালু করা সম্ভব নয়। চিকিৎসক, যন্ত্রপাতি, ওষুধ ও সহায়ক জনবল—সব কিছুর সমন্বিত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।’

জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘লোকবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিশ্চিত না করে হাসপাতালগুলোকে শুধু ৩০ থেকে ৫০ বা ১০০ শয্যায় উন্নীত করার লোক দেখানো প্রতিযোগিতা চলছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ হলো বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন। প্রথমে পুরো ব্যবস্থার একটি সঠিক ও কার্যকর স্বাস্থ্যবিষয়ক অ্যাসেসমেন্ট (মূল্যায়ন) করা প্রয়োজন। বছরের পর বছর ধরে খালি পড়ে থাকা চিকিৎসকদের শূন্য পদগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এ অবস্থায় নতুন ভবন নির্মাণ কিংবা আরো যন্ত্রপাতি কেনার আগে বিদ্যমান ওটি চালু করাই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কত দিন ধরে ওটি বন্ধ, কী কারণে বন্ধ, কতজন চিকিৎসক ও সহায়ক জনবল প্রয়োজন এবং কবে নাগাদ সেবা চালু হবে—তার প্রকাশ্য তালিকা তৈরি করতে হবে। নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ অপারেশন থিয়েটারে ঝোলানো তালা শুধু একটি কক্ষ বন্ধ থাকা নয়, এটি দরিদ্র রোগীদের জন্য কম খরচে চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজাও বন্ধ করে দেয়।’

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৭৮৯১০১১
১১৩৪১৫১৬১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৯৩০৩১  

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code