প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৮শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১লা রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

বিয়ানীবাজারে নৌকা বাইচের সেকাল-একাল ও বাইচালদের গল্প

editor
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬, ০৯:২৯ পূর্বাহ্ণ
বিয়ানীবাজারে নৌকা বাইচের সেকাল-একাল ও বাইচালদের গল্প

Manual7 Ad Code

 

Manual7 Ad Code

মিলাদ জয়নুল:

Manual6 Ad Code

বাংলার লোকসংস্কৃতি ও প্রাচীন ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান ধারক নৌকা বাইচ। মুসলিম নবাব-বাদশাদের আমল থেকে পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া এই লোকজ খেলাটি কালের বিবর্তনে আগের চেয়ে কমে গেলেও, আজও কিছু উৎসাহী মানুষের হাত ধরে টিকে আছে। সম্প্রতি বিয়ানীবাজার উপজেলার বারইগ্রাম এলাকায় নৌকা বাইচ আয়োজন নিয়ে বেশ উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নৌকা বাইচ নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ দুই গ্রæপ তৈরী হয়। যদিও সকল অচলায়তন দূর করে আগামীকাল ১৩ সেপ্টেম্বর সুনাই নদীতে নৌকা বাইচের ফইনাল অনুষ্ঠিত হবে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়াও সম্প্িরত উপজেলার চারখাই ও মুড়িয়ার ভাটাউছি এলাকায় নৌকা বাইচের আয়োজন করা হয়েছে। নৌকা বাইচ নিয়ে সর্বত্র এমন আলোচনার মধ্যে বাইচের সেকাল-একাল ও বাইচালদের গল্পও ঘুরছে মানুষের মুখে মুখে।

Manual4 Ad Code

নদীমাতৃক বাংলাদেশে বর্ষাকাল এলেই নদী-নালা, খাল-বিল যখন পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে, তখনই বেজে ওঠে নৌকা বাইচের দামামা। হাজারো দর্শকের উল্লাস আর উৎসবমুখর পরিবেশে আজও যখন পানসি নৌকাগুলো জলে ভাসে, তখন যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে বাংলার চিরায়ত রূপ।

কিছুদিন আগে বিয়ানীবাজারের চারখাইয়ে সুরমা নদীতে অনুষ্ঠিত নৌকা বাইচে ৭টি সুসজ্জিত পানসি নৌকা এই বাইচে অংশ নেয়। নবীন-প্রবীণ বাইচাল, আয়োজক আর বাদ্যযন্ত্রীদের শ্রম ও মেধায় আয়োজিত এই বাইচ যেন প্রাচীন এই লোকজ সংস্কৃতিকেই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। এই বাইচ ঘিরেই উঠে এসেছে বাইচালদের অভিজ্ঞতা, আনন্দ, অর্জন ও ব্যর্থতার নানা অ¤ø­মধুর গল্প।

নৌকা বাইচ শুধুই একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি অনেকের কাছে নেশা ও শখের বিষয়। লাউতার জলঢুপ দক্ষিণ পাড়িয়াবহর গ্রামের ৪৫ বছর ধরে বৈঠা টানা প্রবীণ বাইচাল আবুল কালামের গল্পটি তেমনই। এই বাইচালের বাবা জসির উদ্দিনও ছিলেন নামকরা বাইচাল। বিনোদন আর শখের বশেই তিনি আজও বৈঠা টানেন। নদীর দুই পাড়ে হাজারো মানুষের উল্লাস তার নৌকার গতি ও শক্তি যেন দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। চারখাই শিকারপুর গ্রামের প্রাচীন বাইচাল মোতালেব হোসেন খানের স্মৃতিতে লুকিয়ে আছে বাইচের সোনালি অতীত। সত্তরের দশকে তিনি বাবার হাত ধরে নৌকায় উঠতেন। সে যুগে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা চাঁদা তুলেই একটি পানসি তৈরি করা যেত, যা বর্তমানে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে। মোতালেব হোসেনের স্মৃতির পাতায় সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে কুশিয়ারা নদীর ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ নৌযাত্রার কথা। ৫০ জন বাইচাল নিয়ে ৬০ ফুট দীর্ঘ পানসিতে দীর্ঘ সময় বৈঠা টেনেছিলেন তারা। ক্লান্তি দূর করতে গাওয়া হতো সারিগান ‘আজ আমার বন্ধু নাই ঘরে- উজান বাতাসে শাড়ি ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে…’ কিংবা ‘হাত ছাইড়া দেও সোনার দেওয়ারে…’। চিঁড়া, গুড় আর মুড়ি খেয়ে পথ পাড়ি দিয়ে সেবার তৃতীয় হয়ে একটি রেডিও জিতেছিলেন তারা। সেই অর্জনের আনন্দ আজও তাকে আলোড়িত করে।

বাইচে যেমন আছে বাঁধভাঙা উল্লাস, তেমনি আছে হৃদয়ভাঙা কষ্ট। বাইচের এই ঐতিহ্য যাতে হারিয়ে না যায়, সে জন্য হাল ধরছেন নবীনরাও। কালিজুরী গ্রামের যুবক আব্দুল আলীম গত ৫ বছর ধরে পানসির বাইচাল। তার কাছে এটি কোনো বাণিজ্যিক বিষয় নয়, বরং বাংলার সংস্কৃতিকে সমুন্নত রাখার এক ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। আলীমের মতো হিরা, জহির, আব্দুল করিম, নান্নু মিয়া, শাহাদত হোসেনের মতো তরুণরা বিশ্বাস করেন, বর্তমান প্রজন্ম হিসেবে এই ঐতিহ্যকে লালন করা তাদের দায়িত্ব। শিশুবেলায় দাদা-নানার কাছে শোনা বাইচের গল্প যখন বাস্তবে ধরা দেয়, তখন দর্শকদের মুগ্ধতা যেন সীমা ছাড়িয়ে যায়। সাকিব হোসেন, মামুন রেজা ও সুমন আহমেদের মতো কলেজপড়ুয়া দর্শকরা জানান, পড়ন্ত বিকেলে নদীর রূপালি জলরাশিতে পানসিগুলোর সারিগান আর বাদ্যের তালে তালে ছুটে চলা এক অভাবনীয় দৃশ্যের জন্ম দেয়।

 

নদীর দুই পাড়ে হাজারো মানুষের হইহুল্লোড় আর উল্লাসের এই প্রাণবন্ত রূপ একমাত্র নৌকা বাইচেই দেখা সম্ভব, যা বাংলার লোকসংস্কৃতির এক অনন্য রতœ।

Manual2 Ad Code

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code