প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৬ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১০ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

বিয়ানীবাজারে মাদরাসার আবাসিক খাবার: ৫ হাজার শিক্ষার্থীর পুষ্টির তীব্র ঘাটতি

editor
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ১০:১৭ পূর্বাহ্ণ
বিয়ানীবাজারে মাদরাসার আবাসিক খাবার: ৫ হাজার শিক্ষার্থীর পুষ্টির তীব্র ঘাটতি

Manual4 Ad Code

 

স্টাফ রিপোর্টার:

বিয়ানীবাজারের আবাসিক মাদরাসাগুলোতে শিক্ষার্থীদের সরবরাহ করা প্রতিদিনের খাবারে পুষ্টির ভয়াবহ ঘাটতি থাকছে। একঘেঁয়ে খাদ্যতালিকায় মূল স্থান দখল করে আছে ভাত, ডাল, আলু ভর্তা, ভাজি ও সবজি। সপ্তাহে মাত্র এক বা দুই দিন পাঙাশ, তেলাপিয়া বা চাষের মাছ এবং ব্রয়লার মুরগির মাংস পরিবেশন করা হয়। দিনের পর দিন পুষ্টিহীন খাবার গ্রহণের ফলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক বিকাশ ও পড়াশোনায় চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

 

পুষ্টিহীনতার এই চিত্র স্বীকার করে খোদ মাদরাসা শিক্ষকরা জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতার কারণেই মূলত শিক্ষার্থীরা সুষম খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

Manual1 Ad Code

গবেষক ও পুষ্টিবিদদের মতে, শিক্ষার্থীদের খাবারে ক্যালরি বা কার্বোহাইড্রেটের (শর্করা) কোনো ঘাটতি সাধারণত হয় না। তিন বেলাই পর্যাপ্ত পরিমাণে ভাত, রুটি কিংবা খিচুড়ি খাওয়ানো হয়। এর ফলে পেট ভরা এবং শরীর তাৎক্ষণিক শক্তি পেলেও এটি সুষম খাবার বা ব্যালেন্সড ডায়েট নয়। বাড়ন্ত বয়সের একটি শিশুর জন্য প্রতিদিন যে পরিমাণ প্রথম শ্রেণির প্রোটিন অর্থাৎ ডিম, দুধ, মাছ বা মাংস প্রয়োজন, তা তারা পায় না। ডাল থেকে কিছু উদ্ভিজ্জ প্রোটিন এলেও তা শরীরের জন্য পর্যাপ্ত নয়।

Manual2 Ad Code

ভিটামিন ও মিনারেলের চাহিদা পূরণের অবস্থা হলোÑখাবারের মেনুতে শাকসবজি ও ফলমূলের উপস্থিতি থাকে একেবারেই নগণ্য। মাঝে মধ্যে পেঁপে, মিষ্টি কুমড়া বা আলু ছাড়া রঙিন ও পুষ্টিকর শাকসবজি খুব একটা রান্না করা হয় না। এছাড়া খাবারে ভিটামিন এ, সি এবং ক্যালসিয়াম ও আয়রনের মতো প্রয়োজনীয় উপাদানের ব্যাপক ঘাটতি থাকে। এ অবস্থা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ এবং পড়াশোনার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে।

বিয়ানীবাজার উপজেলার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সুপারভাইজার আব্দুর রহমান জানান, উপজেলায় কওমী ও হাফিজিয়া মিলিয়ে ৯২টি মাদরাসা রয়েছে। কবে কতটিতে আবাসিক ব্যবস্থা আছে, তা জানা নেই। আবার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মৌলুদুর রহমান বলেন, তাদের দপ্তরে এমপিওভূক্ত ১৫টি মাদরাসার তথ্য আছে। যদিও কতটি আবাসিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়, তার তথ্য নেই বলে জানান তিনি।

সবমিলিয়ে উপজেলায় কমপক্ষে ১০০টি মাদরাসা আছে বলে বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এরমধ্যে অন্তত: ৮০টি মাদরাসায় আবাসিক ব্যবস্থাপনা রয়েছে। এতে প্রায় ৫ হাজার ছাত্র বসবাস করে।

 

বিয়ানীবাজার পৌরশহরের একটি মাদরাসার আবাসিকের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, তাদের মাদরাসায় প্রতিদিন সকালে ভাত, আলু ভর্তা, ডাল; দুপুরে ভাত, ব্রয়লার মুরগি অথবা পাঙাশ মাছ, ডাল; রাতে যেকোনো সবজির ভাজি আর ডালের ব্যবস্থা থাকে। সপ্তাহের প্রতিদিন একই মেন্যু। একই ধরনের খাবার প্রতিদিন খেতে ভালো লাগে না বলেও আলাপচারিতায় শিশু্টি জানায়।

সে জানায়, বিকাল বা সন্ধ্যায় কোনো নাস্তার ব্যবস্থা নেই। তাই একই খাবার ভালো না লাগলেও ক্ষুধার তাড়নায় খেয়ে নেয় তারা। তবে মাঝে মধ্যে বিভিন্ন জায়গা থেকে বড় মাছ, গরু বা খাসির মাংস, বিরিয়ানি আসে। ভালো খাবার যখন পাও কেমন লাগেÑজানতে চাইলে শিশুটির ভাষ্য, ‘খুব আনন্দ লাগে, সেদিন আমরা সহপাঠীরা সবাই মিলে পেট ভরে মজা করে খাই।’

মাদরাসা শিক্ষক মাওলানা আবু সাঈদ জানান, মানুষের দেওয়া দান-অনুদানে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের খাওয়া ও পড়াশোনা এবং শিক্ষকদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য কার্যক্রম চলছে। তিনি আরো জানান, প্রতিদিন ছাত্রদের তিনবেলা খাবারের পেছনে বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ হয়।

তিনি বলেন, আর্থিক সংকটে ছাত্রদের পুষ্টিকর দামি খাবার দেওয়া সম্ভব হয় না। অল্প পুষ্টির খাবার খেয়ে কষ্ট করে আল্লাহর কোরআন শিখতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এই সংকট উত্তরণে রাষ্ট্রীয়ভাবে মাদরাসা শিক্ষাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া দরকার বলে মনে করেন তিনি।

অপর আরেকটি মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা মুফতি সুলেমান আহমদ বলেন, দীনি ইলম শিক্ষা করতে হলে কিছুটা কষ্ট করতে হবে-এটাই স্বাভাবিক। মাদরাসাগুলো সামান্য টাকার বিনিময়ে হাজার হাজার ছাত্রের খাবার জোগান দিয়ে থাকে। এতে খাবারের মান না থাকাটা স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে বেশিরভাগ মাদরাসার বদনামও রয়েছে। তবে আমি মনে করি এগুলো কর্তৃপক্ষের অপারগতা। এর সমালোচনা না করাই ভালো। তিনি বলেন, সচ্ছল লোকেরা যদি ঠিকমতো জাকাত দিত তাহলে মাদরাসার এতিম শিক্ষার্থীদের খাবার, পোশাক পরিচ্ছদ ও শিক্ষায় কোনো ঘাটতি তৈরি হতো না।

জানা যায়, কওমি মাদরাসার আবাসিক শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থী আন্ডারওয়েট বা স্বাভাবিকের চেয়ে কম ওজনের। তারা প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তারা নিয়মিত ফলমূল পায় না এবং পর্যাপ্ত প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার থেকে বঞ্চিত হয়। কওমি ও আবাসিক মাদরাসাগুলোর একটি বড় অংশে শিক্ষার্থীদের জন্য খেলার মাঠ বা শারীরিক কসরতের ব্যবস্থা থাকে না। জানা গেছে, ৯৫.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী কোনো ধরনের নিয়মিত ব্যায়াম বা খেলাধুলায় অংশ নেয় না। এটি তাদের সঠিক শারীরিক গঠনে বাধা সৃষ্টি করে।

বিভিন্ন মাদরাসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক মাদরাসায় এতিম, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সন্তানরা পড়াশোনা করে। মাদরাসার সীমিত বাজেট এবং দাতব্য অনুদানের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে শিক্ষার্থীদের জন্য পুষ্টিকর ও সুষম খাবারের ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে পড়ে। মাদরাসা কর্তৃপক্ষের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনধারা সম্পর্কে সঠিক নির্দেশনার ঘাটতি থাকে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদরাসা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে এবং অপুষ্টি দূর করতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে মাদরাসাগুলোয় পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা ‘হেলথ স্ক্রিনিং’ চালু করা এবং বাধ্যতামূলক শারীরিক খেলাধুলার ব্যবস্থা করা। তবে ব্যতিক্রম চিত্রও রয়েছে। কোনো কোনো আবাসিক মাদরাসার খাবারের মান মোটামুটি ভালো দেখা গেছে।

Manual1 Ad Code

বিয়ানীবাজার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মৌলুদুর রহমান জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এসইডিপি (সেকেন্ডারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম) কর্মসূচির আওতায় ‘মাদরাসা শিক্ষা উৎকর্ষ সহায়তা কর্মসূচি’ (এমইইএসপি) প্রণয়ন করা হয়েছে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে ২০২৬-৩১ অর্থবছরের মধ্যে দেশের সব মাদরাসায় মিড ডে মিল চালু করা হবে। এর আওতায় ইবতেদায়ি মাদরাসাগুলোও থাকবে।

Manual3 Ad Code

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code