বিয়ানীবাজারের শিক্ষা ব্যবস্থা: তিনমাস গেছে ‘হেলায়-ফেলায়’, সামনেও ছুটির ফাঁদ
বিয়ানীবাজারের শিক্ষা ব্যবস্থা: তিনমাস গেছে ‘হেলায়-ফেলায়’, সামনেও ছুটির ফাঁদ
editor
প্রকাশিত মার্চ ২৬, ২০২৬, ০১:৩০ অপরাহ্ণ
Manual3 Ad Code
স্টাফ রিপোর্টার:
Manual2 Ad Code
শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই পৌঁছাতেই শেষ হয় বছরের প্রথম মাস জানুয়ারি। ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দুই সপ্তাহজুড়ে জাতীয় নির্বাচনের ডামাডোল। এরপর রোজা-ঈদের দীর্ঘ ছুটি, যা শেষ হবে ২৮ মার্চ। ফলে বছরের প্রথম তিনমাসে দেশের অন্যান্য এলাকার মত বিয়ানীবাজারের প্রাথমিক-মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস হয়েছে খুবই কম। পড়ে আছে সিলেবাসের দীর্ঘ পাঠ। সামনের দিনগুলোতেও রয়েছে লম্বা ছুটির ফাঁদ। এমন অবস্থায় বিয়ানীবাজারের সচেতন অবিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বিরাজ করছে।
উপজেলার দাসউরা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমান বলেন, ক্লাস কম হওয়ায় শিক্ষার্থীরা শিখছে কম। শিখন ঘাটতি নিয়েই উঠে যাচ্ছে পরবর্তী ক্লাসে। এমন ঘাটতি নিয়ে এসএসসি-এইচএসসির পর স্নাতকও শেষ করছেন শিক্ষার্থীরা।
জানা যায়, নির্বাচনের পর চারদিন স্কুল খোলা ছিল। এরপর আবার পবিত্র রমজানের ছুটি শুরু হয়। ফেব্রুয়ারিতে মাত্র পাঁচদিন ক্লাস হয়েছে। মার্চ মাস প্রায় পুরোটা ছুটি। এপ্রিলের ১ তারিখ থেকে পুরোদমে ক্লাস শুরুর আশা করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।
Manual4 Ad Code
বিয়ানীবাজার পৌরশহরের একটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সহকারি শিক্ষক বলেন, ‘বই পেতে দেরি হয়েছে। বিশেষ করে অষ্টম, নবমের বই দেরিতে এসেছে। ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ব্যস্ততা ছিল। কিছু ক্লাস হয়েছে। তবে নির্বাচন ও ছুটির কারণে সেভাবে ক্লাসে বসতে পারেনি শিক্ষার্থীরা। আবার এনসিটিবি সিলেবাস পাঠাতেও দেরি করে। সবমিলিয়ে ঘাটতি আছে।’
খলিল চৌধুরী আদর্শ বিদ্যা নিকেতনের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালিক বলেন, ‘আমরা ক্লাসে খুব বেশি পড়ানোর সুযোগ পাইনি। বাধ্য হয়ে সিলেবাসের নির্ধারিত পড়া হোমওয়ার্ক হিসেবে দিয়েছি। শিক্ষার্থীরা কতটুকু পড়বে ছুটিতে, তা নির্ভর করবে অভিভাবকদের সচেতনতার ওপর। তবে রোজা ও ঈদের ছুটিতে অনেকে গ্রামের বাড়ি যায়, আত্মীয়-স্বজনের বাসায় বেড়াতে যায়। এ কারণে সিলেবাসের পড়া দিয়ে দিলেও শিক্ষার্থীরা তেমন পড়তে পারে না। এ কারণে তিনমাস পার হলেও সিলেবাসের কিছুই শেষ হয়নি বলে ধরতে হবে।’
জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ—তিনমাস গেছে হেলায়-ফেলায়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সামনে এখন এপ্রিল ও মে—দুইমাস সময়। এরপরই অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা। সিলেবাস অনুযায়ী—পাঠ্যবইয়ের অর্ধেক অংশ এ দুই মাসেই শেষ করতে হবে। অথচ সেখানেও রয়েছে ছুটির ফাঁদ।
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছুটির তালিকা ও শিক্ষাপঞ্জি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২৮ জুন থেকে ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবমের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা শুরু হবে, যা চলবে ১৩ জুলাই পর্যন্ত। আর দশম শ্রেণিতে হবে প্রাক-নির্বাচনি পরীক্ষা। ছুটির তালিকা অনুযায়ী—২৯ মার্চ ঈদের ছুটি শেষে ক্লাস শুরু হবে। এরপর এপ্রিল ও মে মাসে চলবে পুরোদমে ক্লাস। এপ্রিলের ৩০ দিনের মধ্যে সাপ্তাহিক ছুটি আটদিন। আর বিভিন্ন দিবস; যেমন—ইস্টার সানডে, বৈসাবি উৎসব, চৈত্র সংক্রান্তি এবং পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে চার দিনের ছুটি। ফলে এপ্রিলে ক্লাস হবে ১৮ দিন। মে মাসের প্রথমদিনই মে দিবসের ছুটি। এরপর ২৪ মে শুরু হবে ঈদুল আজহা ও গ্রীষ্মকালীন অবকাশ। সেক্ষেত্রে ২১ মে পর্যন্ত ক্লাস চলবে। এর মধ্যেও থাকবে ছয়দিনের সাপ্তাহিক ছুটি। ফলে পুরো মে মাসে ক্লাস হবে মাত্র ১৪ দিন।
এপ্রিল-মে দুই মাস মিলিয়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস হবে মাত্র ৩২ দিন। এরপর ঈদুল আজহা ও গরমের ছুটি। ছুটি শেষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে জুনে। জুনেই হবে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা। অর্থাৎ পুরো পাঠ্যবইয়ের অর্ধেকটা শেষ করতে সর্বসাকুল্যে ৫০ দিনের ক্লাসও পাচ্ছে না মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম প্রান্তিক বা প্রথম সাময়িক পরীক্ষা আরও আগে। প্রাথমিকের ছুটির তালিকা ও শিক্ষাপঞ্জি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৫ মে থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম প্রান্তিক পরীক্ষা শুরু হবে, যা চলবে ১৫ মে পর্যন্ত।
Manual3 Ad Code
আর ঈদুল ফিতরের পর ২৯ মার্চ থেকে ক্লাস শুরু হবে। সেক্ষেত্রে মার্চের তিনদিন ও এপ্রিল মাসজুড়ে শুধুই পরীক্ষার আগে ক্লাস হবে। অর্থাৎ, মাত্র ১৮-১৯ দিনের ক্লাস পাবে শিক্ষার্থীরা। বাকি সময় যাবে ছুটির ফাঁদে।
এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্রে বন্ধ থাকবে ক্লাস!
ওপরের বর্ণনায় তো গেলো শুধুই শিক্ষাপঞ্জি ও ছুটির তালিকা অনুযায়ী হিসাব। এর বাইরেও রয়েছে নানান ফাঁদ। যেমন—ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে প্রাথমিকের পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেবে। পরীক্ষার আগে ও পরীক্ষার দিনগুলোতে তাদের ক্লাস হবে না।
এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হচ্ছে আগামী ২১ এপ্রিল। শিক্ষা বোর্ডগুলোর ঘোষণা অনুযায়ী—যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেন্দ্র থাকবে, সেখানে এসএসসি পরীক্ষার দিনগুলোতে অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কোনো ক্লাস নেওয়া যাবে না।
ফলে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২১ এপ্রিল থেকে মে মাসের পুরোটা সময় এসএসসি পরীক্ষার কারণে নিয়মিত ক্লাস হবে না। এতে শিক্ষাপঞ্জি ও ছুটির তালিকা মেনে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার আগে যে ৩২ দিনের ক্লাস হওয়ার কথা, সেটাও কমে ১৬-১৮ দিনে দাঁড়াবে। পাশাপাশি এপ্রিল-মে মাসে কালবৈশাখী ঝড়, বন্যা, তাপপ্রবাহসহ যেসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়, তাতেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়।
Manual6 Ad Code
উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা, ছুটি কমানোর দাবি
ছুটিসহ নানান কারণে বছরের অধিকাংশ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। এতে সন্তানের পড়ালেখা নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। সচেতন অনেক অভিভাবক শিক্ষাপঞ্জিতে পরিবর্তন ও ছুটির তালিকা থেকে ছুটি কমানো প্রয়োজন বলেও মতামত দিয়েছেন।
বিয়ানীবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অভিভাবক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘স্কুল সারা বছর ছুটি থাকে। ক্লাস হয় না, পড়াশোনা নেই। শুধু প্রাইভেট-টিউশনিতে যেটুকু শিখছে। স্কুলের ক্লাসে ওরা কিছুই শিখছে বলে মনে হয় না।’
ক্লাস-শিখন ঘাটতি রোধে করণীয়
শিক্ষার মান বাড়াতে ক্লাসে পাঠদানের বিকল্প নেই। অথচ এ পাঠদান ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে বলে মনে করেন বিয়ানীবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক জিয়া উদ্দিন আহম্মদ। তিনি বলেন, ‘দিন যতই গড়াচ্ছে ক্লাসে পাঠদানের মান কমছে, শিক্ষার্থীরাও কম শিখছে। পাঠ্যবই যাচ্ছে দেরিতে, শিক্ষক ক্লাসে আসছে না, একের পর এক ছুটি—এমন নানান সংকট।’
তিনি আরোও বলেন, ‘বছরের অন্তত ছয়টি মাস (১৬০-১৮০ দিন) পুরোদমে পাঠদান চলা উচিত। সেটা শুধু মুখস্থ করানো পাঠদান নয়। ফলপ্রসূ শিক্ষা দিতে হবে। ক্লাসে পাঠগুলো এমনভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে, যেন শিশুরা বাসায় গিয়ে তা নিজেই পড়তে পারে। এর বাইরে পাঠ্যবইগুলো বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষকদের ব্যাপক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।’