বিয়ানীবাজার থেকে হারিয়ে যাচ্ছে আবহমান বাংলার টংগি ঘর
বিয়ানীবাজার থেকে হারিয়ে যাচ্ছে আবহমান বাংলার টংগি ঘর
editor
প্রকাশিত এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ০৯:১২ পূর্বাহ্ণ
Manual1 Ad Code
ছবি: বিয়ানীবাজার পৌরসভার কসবা বড়বাড়িতে আসাম প্যাটার্নে নির্মিত একটি টংগি ঘর/
Manual7 Ad Code
Manual1 Ad Code
মিলাদ জয়নুল:
টংগি ঘর (বৈঠকখানা বা বাংলা ঘর নামেও পরিচিত) গ্রাম বাংলার এক সময়ের আবহমান ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি মূলত মূল বসতভিটা থেকে একটু দূরে, খোলামেলা জায়গায় অবস্থিত একটি আলাদা ঘর, যা গ্রামীণ সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করত। বিয়ানীবাজার উপজেলার প্রায় অর্ধশত টংগি ঘর এখন জীর্ণ-অকেজো।
স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, আগেকার সময়ে বিয়ানীবাজারের গ্রামীণ অবস্থা সম্পন্ন ও মধ্যবিত্ত গৃহস্থরা তাদের আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে এই ঘর তৈরি করেন। দিনের বেলা এই টংগি ঘরে গৃহস্থের আড্ডা, শালিস-বৈঠক, এবং জরুরি পারিবারিক আলাপ-আলোচনা হতো। এটি মূলত পুরুষ অতিথিদের জন্য তৈরি করা হতো। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পথচারী বা মেহমানদের এক-দুই দিন রাত যাপনের ব্যবস্থা ছিল এসব ঘরে। কানাডা প্রবাসী প্রবীণ ব্যক্তি হাজী আসাদ উদ্দিন জানান, টংগি ঘর সাধারণত চারিদিকে ঢেউ টিনের বেড়া এবং ওপরে টিন বা ছনের ছাউনি দিয়ে তৈরি হতো। ঘরগুলো অত্যন্ত খোলামেলা হতো, যার ফলে তীব্র গরমেও শীতল পরিবেশ বজায় থাকতো। আগের দিনে গ্রামের উৎসব, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং শালিস-বিচার এই ঘরের খোলা জায়গায় বা বারান্দায় অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু ড্রয়িং রুম কালচার বা আধুনিক নগরায়ণের ফলে কালের বিবর্তনে এই ঐতিহ্যের টংগি ঘরগুলো এখন হারিয়ে যেতে বসেছে।
বিয়ানীবাজার পৌরসভার কসবা বড়বাড়িতে আসাম প্যাটার্নে নির্মিত একটি টংগি ঘর সরজমিন দেখতে গেলে কথা হয় বাড়ির বাসিন্দা শিক্ষাবিদ আলী আহমদের সাথে। তিনি জানান, আগেকার দিনে নিজেদের পারিবারিক অনুষ্ঠানে পুরুষ অতিথিগণ এসব বাইরের ঘরে থাকতেন আর মেয়েরা থাকতেন ভিতর বাড়িতে। ভাটি অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে গ্রামের লোকজনদের উপস্থিতিতে এসব ঘরে বসতো পুঁথি পাঠ ও জারি গান। পথচারীরা এসব টংগি ঘরে ক্ষণিকের জন্য বিশ্রাম নিতেন। প্রয়োজন রাত যাপনের ব্যবস্থা থাকতো এসব ঘরে। অনেকটা মুসাফিরখানা হিসাবে ব্যবহৃত হত এসব ঘর।
Manual3 Ad Code
বিয়ানীবাজার সদর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মাসুক আহমদ বলেন, তখনকার যুগে বৈদ্যুতিক পাখা না থাকলেও টংগি ঘরে ছিল আরামদায়ক শীতল পরিবেশ। তীব্র গরমেও এসব ঘরের খোলা জানালা দিয়ে হিমেল বাতাস বইতো। পারিবারিক উৎসব, আয়োজন, শালিস বৈঠক, গল্প – আড্ডার আসর বসতো এসব ঘরে। গৃহস্থের বাড়ির ভিতর থেকে খাবার পাঠানো হতো টংগি ঘরের অতিথিদের জন্য। গৃহ শিক্ষকদের জন্য এসব ঘরে থাকার ব্যবস্থা করা হত। কোন কোন বাড়ির বাংলা ঘর সকাল বেলা মক্তব হিসেবেও ব্যবহৃত হত। প্রায় সকল বাড়ির এসব ঘরে জায়গীরে থাকা ছাত্র বা গৃহ শ্রমিকদের জন্য থাকতো নির্ধারিত কক্ষ।
Manual1 Ad Code
টংগি ঘর ছিল বাংলার অবস্থাসম্পন্ন ও মধ্যবিত্ত গৃহস্থের আভিজাত্যের প্রতীক। চারিদিকে ঢেউ টিনের বেড়া সঙ্গে কাঠের কারুকাজ করে উপরে টিন অথবা ছনের ছাউনি থাকতো এসব ঘরে। টংগি ঘর ঘিরে বিয়ানীবাজারের প্রবীণ মানুষদের কত স্মৃতি। কত উৎসব আয়োজনের স্বাক্ষী এই টংগি ঘর। যা আজ অবহেলা আর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিপন্ন। এভাবেই হারিয়ে যায় ইতিহাস। হারিয়ে যায় ঐতিহ্যের স্মারকগুলো।