মায়ানমার সরকারের নির্যাতনে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখ রোহিঙ্গার জন্য জনপ্রতি মাসিক খাবারের বরাদ্দ সাড়ে ১২ ডলার থেকে কমিয়ে ৬ ডলারে নামিয়ে এনেছে জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। আগামী এপ্রিল মাস থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। এ ব্যাপারে গত বুধবার শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমানকে চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি। এই সিদ্ধান্তের কারণে খাবার জোগাড়কে কেন্দ্র করে অশান্ত হতে পারে রোহিঙ্গা শিবিরগুলো।
এ বিষয়ে ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, ‘আমরা স্বীকার করে নিচ্ছি যে খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থী পরিবারগুলো তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খাবে এবং ক্যাম্পগুলোতে অস্থিরতা বেড়ে যেতে পারে। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা মানবিক ত্রাণের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল।’
এদিকে ডব্লিউএফপির এমন সিদ্ধান্তে কক্সবাজার ও ভাসানচরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর তাৎক্ষণিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই বরাদ্দ বাড়তে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দ্রুত আন্তর্জাতিক মহলে চাপ প্রয়োগ করার তাগিদ দিয়েছেন তারা। এমন একটি সময়ে ডব্লিউএফপি এই সিদ্ধান্ত নিল, যখন ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে ইউএসএআইডির অর্থায়ন বাতিল করেছে।
বাংলাদেশ সরকারের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমানকে পাঠানো চিঠিতে ডব্লিউএফপি উল্লেখ করেছে, রোহিঙ্গা সহায়তার পরিমাণ সাড়ে ১২ ডলার অব্যাহত রাখার জন্য তহবিল জোগাড়ের চেষ্টা চলছে, কিন্তু প্রয়োজন অনুসারে দাতা খুঁজে পাওয়া যায়নি।
Manual2 Ad Code
এ বিষয়ে মিজানুর রহমান বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তের কারণে বরাদ্দ কমেছে কি না, সেটা ডব্লিউএফপি সুনির্দিষ্ট করে বাংলাদেশকে জানায়নি। রোহিঙ্গারা এখন যা খাদ্য সহায়তা পাচ্ছে, সেটা খুবই কম। খাবার-সংকটে পড়লে রোহিঙ্গারা বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। সেটা আগের তুলনায় কয়েক গুণ বাড়তে পারে।’
Manual7 Ad Code
তিনি জানান, খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণ হতে পারে শীর্ষ দাতা দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তন। রোহিঙ্গাদের জন্য বছরে পাওয়া মোট অনুদানের অর্ধেকের বেশি যুক্তরাষ্ট্র একাই দিয়ে থাকে। কিন্তু সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন ইউএসএআইডির অর্থায়ন বন্ধ করে দেওয়ায় পরিস্থিতি জটিল রূপ নিচ্ছে।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের জন্য সাহায্য অনন্তকাল ধরে চলবে না, এটা মনে রাখতে হবে। এ জন্য রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে উত্তম সমাধান। তবে রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ায় ক্যাম্পগুলোতে অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা থাকবে। এ ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় সরকারকে খাদ্য সহায়তার জন্য অন্য উৎস খুঁজে বের করতে হবে।’
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য খাদ্য সহায়তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাদের জন্য বরাদ্দ অন্য সুযোগ কমিয়ে খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করা যায় কি না, তা ভেবে দেখতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনই হচ্ছে এই সংকট সমাধানের একমাত্র পথ। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাচনি প্রচারেই আন্তর্জাতিক সহায়তা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ‘মাত্র ৬ ডলারে কীভাবে চলবে। সরকারের উচিত তাদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। না হয় তারা স্থানীয় শ্রমবাজার দখল করবে। একই সঙ্গে খাদ্যসংকটের কারণে তারা অপরাধমূলক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়বে। বুঝতে পারছি না, এটি কি আসলেই সংকট নাকি আন্তর্জাতিক রাজনীতির শিকার বাংলাদেশ। যেখানে ১২ ডলারে কিছুই হতো না, সেখানে ৬ ডলারের কথা বলা কতটা যৌক্তিক, তা ভেবে পাচ্ছি না। তাই দ্রুত আন্তর্জাতিক মহলে চাপ প্রয়োগ করা উচিত বাংলাদেশের।’
রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ের সংগঠন ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের’ চেয়ারম্যান মাস্টার মোহাম্মদ জুবাইয়ের খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতেই হয়তো এমন সিদ্ধান্ত। আমরা মনে করি, বাংলাদেশের সব জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে চাপ সৃষ্টি করা জরুরি। অন্যথায় রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসন করা হোক। যদি এসব না হয়, তাহলে এ সংকট বাড়তেই থাকবে।’
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালেও রোহিঙ্গাদের মাসিক খাদ্য সহায়তা ১২ ডলার থেকে কমিয়ে ৮ ডলার করা হয়েছিল। সে সময় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ক্ষুধা ও অপুষ্টির মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। কয়েক মাসের মধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসকারীরা সুষ্ঠুভাবে বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খান এবং ১৫ শতাংশেরও বেশি শিশু অপুষ্টিতে ভোগে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকারের হস্তক্ষেপে খাদ্য সহায়তার পরিমাণ আগের পর্যায়ে ফিরিয়ে নেয় সংস্থাটি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০২৩ সালে রোহিঙ্গাদের মাসিক খাদ্য সহায়তা কমিয়ে দেওয়ায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন মেরিটাইমবিষয়ক সচিব খুরশীদ আলম বাংলাদেশে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারকে ডেকে জানান, রোহিঙ্গাদের খাওয়াতে না পারলে তাদের মায়ানমারে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। না হলে বাংলাদেশ জোর করে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই চাপে সে সময় মাসিক খাদ্য সহায়তা ৮ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১২ ডলার করা হয়। সূত্র জানায়, ডব্লিউএফপির খাদ্য সহায়তায় রোহিঙ্গারা যেসব খাবার পেয়ে থাকে, তার মধ্যে আছে চাল, ডাল, পাঙাশ মাছ ও হাঁস-মুরগি। চাহিদার তুলনায় এর পরিমাণ একেবারে কম।
Manual5 Ad Code
২০১৭ সালে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও ভয়াবহ দমন-পীড়ন থেকে বাঁচতে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। তার আগে থেকেই এ দেশে অবস্থান করছিল কয়েক লাখ রোহিঙ্গা। বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী কক্সবাজার ও টেকনাফের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বসবাস করছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার জন্য মোট ৮৫২ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলারের চাহিদা নির্ধারণ করা হয়। সেখানে বিদেশি সহায়তা এসেছে ৫৪৮ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার। রোহিঙ্গাদের জন্য মোট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ বিদেশি সহায়তা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র একাই দিয়েছে ৩০১ মিলিয়ন ডলার, যা মোট বিদেশি সহায়তার ৫৫ শতাংশ। প্রায় ৫৫টি দেশ ও সংস্থা রোহিঙ্গার জন্য মানবিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।