প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আমন্ত্রণে তিন দিনের সফরে বৃহস্পতিবার (১৩ মার্চ) বিকেলে ঢাকায় আসছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। এই সফরে সব ধরনের নিরাপত্তা ও আতিথেয়তায় ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিবকে ভিভিআইপি মর্যাদা দেওয়া হবে। মহাসচিবের এই সফরের মাধ্যমে ঝিমিয়ে পড়া রোহিঙ্গা ইস্যুটি ফের আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, যা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে একটি বড় উদ্যোগ বলে মনে করছে কূটনৈতিক মহল।
সফরকালে জাতিসংঘ মহাসচিব শুক্রবার (১৪ মার্চ) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়া শরণার্থী শিবিরে পৌঁছাবেন। সেখানে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর), খাদ্য সংস্থা (ডব্লিউএফপি), আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এবং অন্যান্য মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিরা তাকে শিবিরের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করবেন। এ সময় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও মহাসচিবের সঙ্গে থাকবেন। এরপর গুতেরেস রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের নেতা, যুব প্রতিনিধি ও নারীদের সঙ্গে তিনটি পৃথক বৈঠকে অংশ নেবেন। এ সময় তাদের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় করবেন। বিকেলে তিনি কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সফরের শেষ পর্বে প্রায় এক লাখের বেশি রোহিঙ্গার সঙ্গে বসে গণ-ইফতার অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন জাতিসংঘ মহাসচিব ও প্রধান উপদেষ্টা, যা প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের উদারতার স্বীকৃতি।
জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এক বার্তায় বলেন, ‘প্রতি রমজানে আমি বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংহতি সফর করি এবং রোজা রাখি। এই মিশন বিশ্বকে ইসলামের আসল চেহারা মনে করিয়ে দেয়।’
তিনি বলেন, ‘রমজান করুণা, সহানুভূতি এবং উদারতার মূল্যবোধকে তুলে ধরে। এটি পরিবার এবং সম্প্রদায়ের সঙ্গে পুনর্মিলনের একটি সুযোগ। আমি সব সময় এই মৌসুমে অসাধারণ শান্তির অনুভূতিতে আরও অনুপ্রাণিত হই।’
Manual4 Ad Code
জাতিসংঘ মহাসচিবের বাংলাদেশ সফরকে ইতিবাচক উল্লেখ করে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, ‘তার এই সফর তিনটি দিক থেকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত; অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার ও নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে একটি ধারণা পাবেন মহাসচিব। চাইলে সরকারের এই উদ্যোগে সমর্থন ও কারিগরি সহায়তা দিতে পারে জাতিসংঘ। দ্বিতীয়ত; যুক্তরাষ্ট্র সরকার রোহিঙ্গাদের যে মানবিক সহায়তা কমিয়ে দিয়েছে, সেই ঘাটতি পূরণে মহাসচিবের সহযোগিতা চাইতে পারে বাংলাদেশ। কেননা একমাত্র তিনিই পারেন এই ঘাটতি মেটাতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করতে। তৃতীয়ত; রাখাইনে এখন দুর্ভিক্ষ চলছে। সেখান থেকে এখনো রোহিঙ্গা আসছে। তাই রাখাইনে জাতিসংঘ মানবিক সহায়তা দিতে পারে কি না, যাতে রোহিঙ্গারা আর না আসে। এ বিষয়ে জাতিসংঘের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে বাংলাদেশ সরকার।’
জাতিসংঘ মহাসচিবের সফরের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গুতেরেসের ঢাকা সফর এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন এই সংকট নিরসনে বড় ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে এ বছর জাতিসংঘের উদ্যোগে যে আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তাতে এই সফরটি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা মহাসচিবের এই সফরটি এমনিতেই বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষিত হবে, তা আসন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনকে ফলপ্রসূ করতে ভূমিকা রাখবে। সূত্র আরও জানায়, ২০১৭ সালে মায়ানমার সরকারের নির্যাতন ও অত্যাচারে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় রোহিঙ্গারা। ওই সময় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীতে যে মানবিক বিপর্যয় নেমে আসে তা আন্তর্জাতিক মহলকে ব্যাপক নাড়া দেয়। কিন্তু চীনের মধ্যস্থতায় এসব রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মায়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করে বাংলাদেশ। এরপর রোহিঙ্গা সংকটের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি ক্রমেই কমতে থাকে। এতে আন্তর্জাতিক চাপ কমে যাওয়ায় এবং চীনের মধ্যস্থতা কার্যকর না হওয়ায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আর সম্ভব হয়নি।
Manual8 Ad Code
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, জাতিসংঘ মহাসচিবের এই সফরের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব আছে। তার এই সফরে রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন বাজেট ঘাটতি কীভাবে পূরণ হবে, তা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ থাকবে। তবে সবচেয়ে বড় একটি বিষয় নিয়ে কেউ আলোচনা করছেন না, সেটি হলো রোহিঙ্গারা রাখাইনে ফিরে গিয়ে কী করবে? এ জন্য রাখাইনে কৃষি, ওষুধ, বিভিন্ন কলকারখানা প্রতিষ্ঠায় বিনিয়োগ করতে হবে। সেখানে বর্তমানে দখলে নেওয়া আরাকান আর্মির দিকটাও বোঝাতে হবে। না হলে প্রত্যাবাসনে কেউ রাজি হবে না, আরাকান আর্মিও প্রত্যাবাসন হতে দেবে না।
এদিকে জাতিসংঘ মহাসচিবের আগমন উপলক্ষে ব্যাপক প্রস্তুতির পাশাপাশি বিভিন্ন দাবি তুলে ধরবে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়। কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জসিম উদ্দিন চৌধুরী জানিয়েছেন, স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) জাতিসংঘ মহাসচিবের পুরো নিরাপত্তাব্যবস্থা সমন্বয় করবে এবং সফরকে ঘিরে বহুস্তরীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সফরকালে ক্যাম্পের নিরাপত্তাব্যবস্থা সেনাবাহিনী তদারকি করছে। কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে শরণার্থী শিবির পর্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।
Manual3 Ad Code
রোহিঙ্গা নেতা ও আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, “জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেস ও বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিস্থিতি দেখতে আসবেন। আমরা খুশি হয়েছি। আমাদের কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন নেই। আমরা আরাকানে ফিরতে চাই। আরাকানে ‘সেফ জোন’ সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের পৌঁছে দিলে কোনো ধরনের সহায়তা দরকার হবে না।” এ ক্ষেত্রে অপরাধপ্রবণতাও কমে আসবে বলে জানান এ রোহিঙ্গা নেতা।