প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৯ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৩ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

আ.লীগের ঝটিকা মিছিল : গোয়েন্দা ব্যর্থতা নাকি পুলিশের অক্ষমতা?

editor
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৫, ১১:৪৬ পূর্বাহ্ণ
আ.লীগের ঝটিকা মিছিল : গোয়েন্দা ব্যর্থতা নাকি পুলিশের অক্ষমতা?

Manual3 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই রাজনৈতিক দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও তার ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো দৃশ্যমান কার্যক্রম থেকে প্রায় উধাও হয়ে যায়। দলের অধিকাংশ শীর্ষ নেতা আত্মগোপনে বা দেশের বাইরে চলে যান, অনেকেই গ্রেপ্তার হন। কার্যত গত বছরের শেষ পর্যন্ত তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল স্থবির। তবে, চলতি বছরের শুরু থেকে এক নতুন কৌশলের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। হঠাৎ করে ছোট ছোট মিছিল নিয়ে মাঠে নামা এবং দ্রুত নিরাপদ স্থানে ফিরে যাওয়ার এই কৌশল এখন ‘ঝটিকা মিছিল’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে।

Manual3 Ad Code

 

এই কৌশল একদিকে যেমন রাজনৈতিক মহলে গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাধারণ মানুষের মনেও নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, এই ঝটিকা মিছিলগুলো কি নিছক একটি রাজনৈতিক কৌশলের প্রতিফলন, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনো রহস্য?

Manual5 Ad Code

 

রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন

 

গত বছরের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রিসভার প্রায় সব সদস্য দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তখন রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল, আওয়ামী লীগ অন্তত ১০–১৫ বছর রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকবে না। আদালতের রায়ে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় এই ধারণা আরও দৃঢ় হয়। তবে, অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পার না হতেই আস্তে আস্তে মাঠে শক্তি প্রদর্শন শুরু করে দলটি। প্রাথমিকভাবে কয়েকজনের ঝটিকা মিছিল হলেও এখন তা শতশত নেতাকর্মীর সমাবেশে রূপ নিচ্ছে। দিনের আলোতেই প্রকাশ্যে এসব কর্মসূচি চলছে। যা নিয়ে জনমনে ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।

এসব ঝটিকা মিছিল রাজধানীতে ব্যাপকতা পাওয়ার পর জনমানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহলে পর্যন্ত আলোচনা হচ্ছে। তারা বলছেন, সরকার পতনের পর এত দ্রুত সময়ের মধ্যে অর্থাৎ এক বছরের কম সময়ে আওয়ামী লীগ কীভাবে রাজধানীতে মিছিল করতে পারছে? প্রশ্ন উঠছে আদালত যেহেতু দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে, তাহলে রাজধানীতে দিনের আলোতে কীভাবে কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে তারা? বর্তমানে এমন কোনো বাহিনী সরকারের হাতে নেই যাদের রাজপথে মোতায়েন করা হয়নি। বাংলাদেশের সব বাহিনী রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে মোতায়েন রয়েছে। তারপরও গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি দল ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর কীভাবে তাদের কার্যক্রম রাজধানীর মতো জায়গায় প্রদর্শন করছে? এখানে পুলিশসহ নিরাপত্তায় নিয়োজিত যতগুলো বাহিনী মোতায়েন রয়েছে, তাদের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

Manual3 Ad Code

 

দলীয় সূত্রে যা জানা গেছে

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতা দেশে ও দেশের বাইরে আত্মগোপনে চলে যান। আবার কেউ কেউ জনতার রোষের ভয়ে দেশের বাইরে পালিয়ে যান। অনেকেই আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। ৫ আগস্টের পর গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকাশ্যে সেভাবে কার্যক্রম চালাতে দেখা যায়নি দলটির নেতাকর্মীদের। কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েও তা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে আওয়ামী লীগ। তবে, চলতি বছরের শুরু থেকে ধীরে ধীরে মিছিল শুরু করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। হঠাৎ করেই মিছিল করে আবার নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নিচ্ছে তারা। সম্প্রতি বেড়েছে আওয়ামী লীগের ‘ঝটিকা মিছিল’।

জানা গেছে, গ্রেপ্তার ও জনতার রোষের ভয়ে দলটির নেতাদের মাঠে তেমনটা দেখা না গেলেও ফেসবুকে সক্রিয় রয়েছেন তারা। তবে, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও মূল দলের নেতাকর্মীরা ঢাকাসহ সারাদেশে ছোট ছোট বিক্ষোভ মিছিল করছেন। ২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে আওয়ামী লীগের পক্ষে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ১৫-২০ জন নেতাকর্মী একটি মিছিল করেন। একই বছরের ১২ নভেম্বর মানিক মিয়া এভিনিউতে মিছিল করেন নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যরা।

 

কিছু উল্লেখযোগ্য ঝটিকা মিছিল

৬ এপ্রিল গুলিস্তান এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল বের করেন। ওই মিছিল থেকে একজনকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়া ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদকে পরে গ্রেপ্তার করে ডিবি। ১৮ এপ্রিল উত্তরায় একটি ঝটিকা মিছিল বের করা হয়। ওই মিছিলের ব্যানারে লেখা ছিল, ‘ঢাকা-১৮ সংসদীয় এলাকা’। মিছিল থেকে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের পদত্যাগ দাবি করা হয়। এছাড়া, ২৪ আগস্ট গুলিস্তান পার্টি অফিসের সামনে বিক্ষোভ মিছিল, ৩১ আগস্ট ধানমন্ডি ২৭-এ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বিক্ষোভ মিছিল, ২ সেপ্টেম্বর ঢাকা উত্তর ছাত্রলীগের বিক্ষোভ মিছিল, ৬ সেপ্টেম্বর তেজগাঁও এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল এবং ৭ সেপ্টেম্বর বিজয় সরণিতে বিক্ষোভ মিছিল করে আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, ডেমরা ও কদমতলী থানা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনও বিক্ষোভ মিছিল বের করে।

 

আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া ভিডিওগুলো দেখে বোঝা যায়, আগের তুলনায় আওয়ামী লীগের মিছিলে নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণও বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যানার নিয়ে, এমনকি মোটরসাইকেল নিয়েও বিক্ষোভ মিছিল করছেন তারা। শুরুর দিকে ভোর রাতে কয়েকজন নেতাকর্মী মিছিল করলেও বর্তমানে হাজারের অধিক নেতাকর্মীকে দিনের আলোতে প্রকাশ্যে বিক্ষোভ মিছিল ও ঝটিকা মিছিল করতে দেখা যাচ্ছে।

যে কৌশল গ্রহণ করেছে আওয়ামী লীগ

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন কৌশলে এবং অর্থের বিনিময়ে মাঠের শক্তি দেখানোর জন্য আওয়ামী লীগ এই ঝটিকা মিছিলগুলোর আয়োজন করছে। মিছিলগুলো ঢাকাতে হলেও এতে অংশ নেওয়া অধিকাংশ নেতাকর্মী ঢাকার বাইরের। স্থানীয় লোকজন যাতে তাদেরকে না চিনতে পারেন এবং সহজে মিছিল করে চলে যেতে পারেন, সেজন্য ঢাকার বাইরের নেতাকর্মীদের ঢাকায় আনা হচ্ছে। আর মিছিলের অর্থ ও নির্দেশ বিদেশে পলায়নরত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা হোয়াটসঅ্যাপে দিচ্ছেন।

 

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিদেশে থাকা আওয়ামী লীগের নেতারা হোয়াটসঅ্যাপে ৮–১০টি গ্রুপ খুলেছেন। এসব গ্রুপের মাধ্যমে দেশে থাকা নেতারা বিদেশে পলাতক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। বিদেশ থেকে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা এবং অর্থ সহায়তা পাঠানো হচ্ছে মাঠ পর্যায়ে শক্তি প্রদর্শনের জন্য।’

ডিবিপ্রধান বলেন, ‘এসব বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত আছে। বেশি নড়াচড়া করলে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, সামনের দিনগুলোতে আওয়ামী লীগ শুধু ঝটিকা মিছিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; তারা নাশকতা ও বড় জমায়েতও করতে পারে রাজধানীতে। ডিবিপ্রধান আরও জানান, সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি মিছিলে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে, যা ভালো লক্ষণ নয়। রাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

ঝটিকা মিছিলের কৌশল নিয়ে তিনি বলেন, ‘এসব মিছিলে ঢাকার স্থানীয় নেতাকর্মীদের কম ব্যবহার করা হচ্ছে। ঢাকার কয়েকজন নেতৃত্ব দিলেও অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী ঢাকার বাইরে থেকে আসছেন, যাতে তাদের সহজে শনাক্ত করা না যায়। যেমন- ধানমন্ডির মিছিলটি করেছেন চট্টগ্রামের নেতাকর্মীরা, আর তেজগাঁওয়ের মিছিল করেছেন বাগেরহাট ও খুলনার একটি গ্রুপ। এখন পর্যন্ত যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই ঢাকার বাইরের। তবে, মিছিলগুলো অর্গানাইজ করছেন ঢাকার মহানগরের নেতারাই।’

 

ফোর্স স্বল্পতার কথা বলছে ডিএমপি

ঝটিকা মিছিল আটকাতে না পারার কারণ হিসবে ডিএমপি বলছে ফোর্স স্বল্পতা। প্রশ্ন উঠছে, কেন রাজধানীতে ঝটিকা মিছিল সম্পর্কে গোয়েন্দারা আগে থেকে তথ্য পাচ্ছেন না এবং কেন নিষিদ্ধ দলটি এত সহজে দিনের আলোয় কর্মসূচি পালন করছে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানায়, তাদের ফোর্স সীমিত। বিশাল ঢাকার প্রতিটি জায়গায় মিছিল আটকানো সম্ভব নয়। তবে, নিয়মিত গ্রেপ্তার অভিযান চলছে। ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, ‘ঢাকা শহর এত বড় জায়গা, অথচ এখানে আমাদের কতজন পুলিশ সদস্য আছেন? তারপরও প্রতিনিয়ত গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। আমাদের টহল কার্যক্রম ও গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত আছে। যারা মিছিলে করে জনমনে আতঙ্ক ও নাশকতা সৃষ্টি করবে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

 

এদিকে, গত সোমবার (৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ঢাকা সেনানিবাসের অফিসার্স মেস ‘এ’-তে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মিলিটারি অপারেশনস ডিরেক্টরেটের কর্নেল স্টাফ কর্নেল মো. শফিকুল ইসলাম আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল প্রসঙ্গে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি দেখবে এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

Manual3 Ad Code

তবে এ বিষয়ে অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল একটি রাজনৈতিক বিষয়। একে শক্তি দিয়ে দমন করা সম্ভব নয় বরং রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে। এ বিষয়ে নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘রাজনৈতিক ডামাডোলের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ বেশকিছু সুযোগ পাচ্ছে। এই সুযোগগুলো তারা বিভিন্নভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং শেখ হাসিনার বিচারও হচ্ছে, সব ঠিক আছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের অসংখ্য ভোটার ও সমর্থক দেশে অবস্থান করছেন। ফলে তাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে, এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। তারা সময় ও সুযোগ বুঝে তাদের কাজ করবে, এটাই স্বাভাবিক। যত দিন যাবে তারা নিজেদের ততই সংগঠিত করবে। এটা আসলে রাজনৈতিক সমস্যা, রাজনৈতিকভাবেই এর সমাধান করতে হবে।’

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code